একুশের মিছিল

আনোয়ারুল ইসলাম »

ভোরটা ছিল খুবই শান্ত। ঢাকা শহরের আকাশে তখনো রোদের আলো পুরোপুরি ছড়ায়নি। কিন্তু রাজপথের বাতাসে একটা অদৃশ্য উত্তেজনা— ভাষা যেন নিজেই কথা বলতে চাইছে।
সালাম আজ খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছে। মসজিদে ফজরের নামাজ পড়ে বাড়িতে এল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুই বলল না। শুধু ব্যাগে একটা কাগজ ভাঁজ করে রাখল। আর ভাঁজ করা কাগজে লেখা- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’
মা জানতেন, আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। ছেলেকে আটকানোর শক্তি ও সাহস তার নেই। শুধু বললেন, ‘বাবা, সাবধানে যেও।’
সালাম মাথা নেড়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে জড়ো হচ্ছে ছাত্ররা। কারো হাতে প্লেকার্ড, কারো চোখে ভয়ের আগুন, কারো বুকের ভেতর চাপা ভয়। তারা সবাই একসাথে অবস্থান করছে। কারণ, ভাষা একা থাকে না ভাষা মানুষকে এক করে।
মিছিল শুরু হলো।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। মরতে জানি, ভয় নাই।
স্লোগানে কেঁপে উঠল রাস্তা, গাছপালা ও আকাশ বাতাস।
হঠাৎ সামনে পুলিশের ব্যারিকেড। থামার নির্দেশ। কিন্তু কে শোনে কার কথা। বাংলার দামাল ছেলেরা এগিয়ে গেল। ভাষার আন্দোলন কি থেমে থাকে?
একটা গুলির শব্দ। তারপর আরেকটা। এভাবে চলতে থাকে পরপর। সালাম গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বরকত, রফিক, জব্বার ও শফিকের বুকে গুলি লাগল। চারপাশে চিৎকার, দৌড় আর রক্ত স্রোত বইছে। সালাম আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবল, ‘মা আমি বাংলায়ই শেষ কথা ভাবছিলাম।’
পরদিন একটু দেরিতে সূর্য উঠল। শহীদ মিনারের সামনে সাজানো ফুল। লাল রঙের ফুল, সাদা পাপড়ি মাঝখানে — রক্ত আর স্বপ্ন একসাথে। সালাম, বরকত, রফিক, জবাব ও শফিক নেই, কিন্তু তাদের মুখের ভাষা আছে। তাদের কণ্ঠস্বর আছে বিশ্বের প্রতিটি দেশের বাংলা ভাষাভাষীর মুখে।
আজও যখন কেউ কিছু বলে, বাংলা আমার মাতৃভাষা, তখন একুশের সেই মিছিল আবার হাঁটে — নীরবে, গর্বে, রক্তের স্মৃতিতে। আর সেই মিছিলে স্মৃতিময় গীত হয়ে ওঠে এই গানটি — আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো, একুশে ফেব্রুয়ারি-
আমি কি ভুলিতে পারি।