অনিরাপদ সমুদ্রপথ : বাংলাদেশের ক্ষতি বাড়াবে

মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতির ধমনী হিসেবে পরিচিত সমুদ্রপথকে টালমাটাল করে তুলেছে। সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি কন্টেইনার পরিবহনে নতুন করে যে বিপুল পরিমাণ ‘ইমার্জেন্সি কনফ্লিক্ট সারচার্জ’ আরোপ করেছে, তা বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর ও রপ্তানিমুখী দেশের জন্য এক অশনিসংকেত। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ টনের একটি সাধারণ কন্টেইনারে ৮০০ থেকে ২ হাজার ডলার এবং হিমায়িত পণ্যের ক্ষেত্রে তা ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের দামামায় পণ্য পরিবহনের এই অতিরিক্ত ব্যয়ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাঁধেই এসে পড়বে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-তৃতীয়াংশ পরিবহনের পথ। সেখানে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় শিপিং লাইনগুলো হয় তাদের সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখছে, নয়তো অত্যন্ত চড়া মূল্যে ঝুঁকি গ্রহণ করছে। ডেনমার্কের মার্চ লাইন, সুইজারল্যান্ডের এমএসসি কিংবা ফ্রান্সের সিএমএ সিজিএম-এর মতো বিশ্বখ্যাত শিপিং জায়ান্টদের এই সারচার্জ আরোপের সিদ্ধান্ত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকেই তুলে ধরে। যখন একটি কন্টেইনারের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তখন কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক রপ্তানি—সবকিছুর উৎপাদন খরচ বেড়ে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের একটি বড় অংশ সমুদ্রপথে আসে। সারচার্জের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়লে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম আরও চড়বে, যা বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প এরই মধ্যে বৈশ্বিক নানাবিধ সংকটের মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যগামী চালানে অতিরিক্ত ভাড়া আমাদের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে হিমায়িত পণ্য বা রেফ্রিজারেটেড কন্টেনারে ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত সারচার্জ আরোপ মৎস্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এই পরিস্থিতিতে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। প্রথমত, সরকারকে আন্তর্জাতিক মহলে এই সংকট উত্তরণে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে যাতে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। দ্বিতীয়ত, দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা এনে জাহাজের গড় অবস্থানকাল কমিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে, যাতে কিছুটা হলেও খরচ সাশ্রয় হয়। শিপিং কোম্পানিগুলোর সাথে দেশীয় স্টেকহোল্ডারদের আলোচনার মাধ্যমে সারচার্জের যৌক্তিকতা ও সহনীয় মাত্রা বজায় রাখার বিষয়ে দরকষাকষি জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে না থাকলেও, এর অভিঘাত মোকাবিলায় আমাদের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের এই অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বিকল্প বাজার খোঁজা এবং লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার মাশুল দিতে হবে পুরো জাতিকে, তাই সময় থাকতেই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে।