এম আব্দুল হালীম বাচ্চু »
মার্চ এলেই আকাশের রং যেন একটু বদলে যায়। বাতাসে ভেসে আসে এক অদৃশ্য ডাক- স্বাধীনতার ডাক। জয়গোবিন্দপুর গ্রামের স্কুলপড়ুয়া খোকন এই ডাকটা খুব স্পষ্ট শুনতে পায়। কারণ তার দাদু ছিলেন ১৯৭১ সালের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
স্কুলে মার্চ মাস শুরু হতেই একদিন ক্লাসে শিক্ষক বললেন, “এই মাস আমাদের গর্বের মাস। ৭ই মার্চের ভাষণ আর ২৬শে মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা, এই সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আত্মমর্যাদা।” খোকনের বুকটা কেঁপে উঠল। বাড়ি ফিরে সে তার দাদু বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের পাশে গিয়ে বসল। বয়স যতই হোক, দাদুর কণ্ঠে এখনও বেশ জোর আছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলা শুরু করলেন,— “৭ই মার্চে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিলেন, সেদিন মনে হয়েছিল পুরো জাতি জেগে উঠেছে।” সেদিনের রেসকোর্স ময়দান— আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিল লাখো মানুষের ঢল। দাদু আরও বললেন, “শেখ সাহেব শেষে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই কথা আমাদের রক্তে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল।”
খোকন চোখ বড়ো বড়ো করে শুনছিল। দাদু থামলেন, তারপর ধীরে ধীরে বললেন,— “২৫শে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনি যখন নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, তখন পুরো দেশ অন্ধকারে ডুবে গেল! কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করেই ২৬শে মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা এলো। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ।” গ্রামের পথঘাট, খাল-বিল, মাঠ সব জায়গায় তখন লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছিল। দাদু বললেন, “আমরা ভয় পাইনি। কারণ আমাদের সামনে ছিল একটাই স্বপ্ন, আমরা পাব একটা স্বাধীন দেশ, যেখানে আমরা নিজের ভাষায় কথা বলব, নিজেদের পতাকা উড়াব।”
খোকন জানালার বাইরে তাকাল এবং মাঠের ওপারে সে দেখল লাল সূর্যের মতো লাল সবুজের পতাকাটা উড়ছে সারা বাংলাদেশে। সে ভাবল, এই পতাকার জন্য কত ত্যাগ! কত অশ্রু! কত রক্ত! কত কান্না!
পরদিন ২৬শে মার্চ। স্কুলে স্বাধীনতা দিবস অনুষ্ঠান । খোকন সেই অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিলো। সে বলল, “মার্চ মানে শুধু একটি মাস নয়। মার্চ মানে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ আর প্রতিজ্ঞা। মার্চ মানে মাথা নত না করা।” তার কণ্ঠে ছিল আবেগের কম্পন। সহপাঠীরা চুপচাপ শুনছিল।
স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে খোকন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, সে দেশকে ভালোবাসবে, সততার সঙ্গে বড়ো হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াবে। কারণ স্বাধীনতা শুধু ইতিহাসের গল্প নয়; এটি দায়িত্বও।
সন্ধ্যায় দাদু তাকে বুকে টেনে বললেন, “স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে দেশকে ভালোবাসতে হবে।” খোকন বুঝল, মার্চের শিক্ষা এখানেই, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা আরও কঠিন কাজ।
রাতের আকাশে সেদিন তারা জ্বলছিল। খোকন মনে মনে কল্পনা করল, প্রতিটি তারা যেন একেকজন শহিদের আত্মা, যাঁরা আকাশ থেকে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। তাঁরা যেন বলছে,— “আমাদের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখো।”
মার্চ তাই খোকনের কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়। এটি সাহসের প্রতীক, আত্মমর্যাদার মাস। মার্চ মানেই স্বাধীনতার মাস— যে মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আমরা একটি রক্তস্নাত ইতিহাসের সন্তান, আর সেই ইতিহাসকে সম্মান জানানোই আমাদের সবচেয়ে বড়ো দায়িত্ব।





















































