স্বাগতম, হে মাহে রমাদ্বান

0
107

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান »

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সমস্ত প্রশংসা, স্তুতি, হাম্দ ও সানা-র প্রকৃত হকদার, সর্বময় মালিক। তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করি, যিনি পবিত্রতা, গুণগাণের অসংখ্য ফেরেশতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর খেলাফত যমীনে প্রতিষ্ঠার জন্য ইনসান সৃষ্টি করেছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা, যিনি আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস রমযান মুবারক দান করেছেন।
আল্লাহ্ এক, তিনি ওয়াহ্দাহু, লা-শরীক। আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই। হায়াত-মাওত, রিয্ক-দওলত-সবকিছুর ¯্রষ্টা, মালিক, পালনকর্তা তিনিই। তিনি শ্রেষ্ঠত্ব, প্রভুত্বের একক মালিক। সমগ্র সৃষ্ট জগৎ তাঁরই মুখাপেক্ষি, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। আমাদের রাহ্বর, শাফিয়ে মাহশর, সাকীয়ে কাওসর, সায়্যিদুনা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহ্র বান্দা ও তাঁর রাসূল। আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমেই আমাদেরকে হেদায়ত দিয়েছেন।
মাহে রমযানুল মুবারক আমাদের দ্বারপ্রান্তে হাজির। যে মাসটি জীবনে একবার কাজে লাগাতে পারলে জীবন স্বার্থক, আল্লাহ্ আমাদের জীবনে আবারো আনছেন সৌভাগ্যের সুবর্ণ সুযোগ, তবে এ সুযোগকে হাতছাড়া করা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যের। আল্লাহ্র রহমত আমাদেরকে বারে বারে হাতছানি দেয়, আর আমরা থাকি নফসের উন্মাদনায় জাগতিক মোহের আচ্ছন্নতায় নিমজ্জিত। বিধাতা নিজ করুণার পসরা আমাদের কাছে বারংবার যাচেন, আমরাই উদাসীন। তাঁর অযাচিত দয়া আহত হয়ে শুধুই ফিরে যায়। ইকবালের পংক্তিতে শুনি তার অনুরণন, ‘হাম তো মাসেল বকরম, হ্যায় কোয়ী সা-ইল হী নেহী/রাহ্ দিখলায়ে ক্যসে রাহ্রোভে মনযিল হী নেহী’। বস্তুত আমরা সাময়িক সুখভোগের নেশায় ভুলে থাকি স্থায়ী সুখের সত্যতা। সেই ঘোর কাটাতে হবে, ফিরতে হবে নিরেট সত্যের আহ্বানে। সৌভাগ্যের হাতছানি নিয়ে আবারো উদিত হতে যাচ্ছে মাহে রমযানের নতুন চাঁদ। কৃষ্ণপক্ষের ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ ক্ষয়ে যেতে যেতে ফুরিয়ে যায়। কিন্তু, তা আবারো জেগে ওঠে নতুন হাসির চিকন রেখায়। শুক্লপক্ষের উদ্ভাস নিয়ে সে আবারো অবগাহন করে পূর্ণিমার জোয়ারে। কবি বলেন, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে, হারা শশীর হারা হাসি অন্ধকারেই ফিরে আসে’।
করোনার মড়ক আবার যেন মরিয়া হয়েই মরণ কামড় বসাতে তেড়ে আসলো। ভয়কে জয় করে বাঁচার চেষ্টায় সতর্ক হতে হবে। জীবনের ভালবাসায় যে আমাদের যা আছে তা নিয়ে বাঁচতে হয়। উপকূলবাসী জোয়ার-বন্যার ধ্বংসের ধাক্কায়ও আবার বাঁচতে নয়ন মেলে, ছুটে যায় জেগে ওঠা নতুন চরে। ধ্বংসযজ্ঞের ফাঁক ফোকরে যারা বেঁচে যায়, তারা আবার মেরুদ- সোজা করে দাঁড়ায় জীবনের নব প্রেরণায়। সেই প্রেরণায় অভিনন্দন সূচক মৃদু হাসির আবাহনে জাগে নতুন চাঁদ। ¯্রষ্টার করুণার আলিঙ্গনে, নানা- প্রেরণার বারতা নিয়ে যে কয়টি চাঁদ ফুটে ওঠে আকাশের কোণে, তার মাঝে উজ্জ্বলতম হলো মাহে রমযান। হাজারো পাপের কালিমা নিমেষে উবে যায়, যখন উপচে পড়ে বিধাতার করুণা। অনন্ত করুণার আধার বিধাতার সর্বপ্লাবী করুণাময় নাম ‘রাহমান’। সেই নামের অনুছন্দের সমবর্ণায়নে আগত মাসটিরও নাম ‘রামাদ্বান’ শব্দে যোজিত ‘শাহরু রামাদ্বান’। তাই, যে কয়টি চাঁদের উদয় দর্শনে প্রতীক্ষায় রাখতে হয় দু’নয়ন, যা ওয়াজিবে কেফায়া, ওগুলোর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হল মাহে রমযান। এ মাসের চাঁদ দেখা পুণ্যকাজ। রোযার অপেক্ষায় থাকা বান্দাগণ এ পুণ্যে আগ্রহী।
হেদায়তের পরম দিশারী আল্লাহ্র রাসূল চাঁদ দেখতেই শুধু বলেন নি; বরং নতুন চাঁদ দেখে পড়ার জন্য দুআও শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদীসে পাকে দুআটি এরূপ, ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু বিল আম্নি ওয়াল আমান, ওয়াস-সালা-মাতি ওয়ালা ইসলাম, ওয়াল আ-ফিয়া তিল মুজাল্লালাতি ওয়া দাফ্ইল আসকাম’। দুআটি পড়া সুন্নাত। এতে সুন্নাত পালনের পুণ্য হয়। এতে যে ফরিয়াদ রয়েছে, তাও আমাদের অতি প্রয়োজনীয়। এখানে আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়, নিরাপত্তা, ঈমান, নির্ভাবনা, শান্তি। সর্বোপরি সুস্বাস্থ্য ও রোগমুক্তি। যে কামনা কায়মনোবাক্যে উম্মত এখন প্রাণান্ত হয়ে করে চলেছে, মহানবী দেড় সহ¯্র বছর আগেই নিজে প্রতিটি চাঁদ উদয়ের মুহূর্তে নিয়মিত পালন পূর্বক উম্মতের জন্য শিক্ষা দিয়েছেন।
মাসটির মূল নাম আরবীতে। এর প্রতি বর্ণনায়নে রমজান, রমযান বিভিন্ন বানান বৈচিত্র্য আমাদের বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে। হুবহু আরবী উচ্চারণ ভিন্ন ভাষার বর্ণযোগে বানান করে দেখানো প্রায় অসম্ভব। তবে আমরা গবেষকদের বানানে, প্রতি বর্ণায়নে নির্দেশিকা-প্রদত্ত প্রক্রিয়ায় যদ্দূর কাছাকাছি আনতে পারি, তার চেষ্টা করে চলি। তবুও যথার্থই পারঙ্গম হয়েছি, একথা বলা যায় না। প্রচলনরীতিতে যা-ই থাকুক, মূল শব্দের উচ্চারণকে লক্ষ্য করে আমরা সবাই একযোগে চেষ্টা করতে উদ্যোগী নই বলে এ বিভিন্নতা আরো বিভিন্ন হয়। আরবীতে ‘রা’ বর্ণটি পোর বৈশিষ্ট্যের। অর্থাৎ এটি গোল ও পুরু ধাঁচে উচ্চারিত হয়। তবে তার নিচে ‘যের’ (ই-কার) হলে নয়। যবর ও পেশ থাকলেই পোর হবে। পাঁচ বর্ণের আরবী বানান হলো ‘রা’র ওপর যবর, ‘মীম’র ওপর যবর, এরপর ‘দ্বোয়াদ’ বর্ণে যবর+আলিফ সাকিন এবং ‘নূন’ বর্ণের ওপর পেশ বা যবর। এগুলোকে গভীর সতর্কতায় সাজিয়ে উচ্চারণ করলে শব্দটির রূপ হবে রমাদ্বান বা রমাদ্বোয়ান। দ্বোয়াদ’র সিফাত লক্ষ্য করে নীচের যুক্ত। সবশেষে বলতেই হবে, নদীর প্রবাহধারার মতোই ভাষা গতিময়, সে চড়াইÑউৎরাই, আঁকÑবাঁক ডিঙিয়ে চলার গতি অব্যাহত রাখে। তাই, সঙ্গত কারণে পরিবর্তন, বিবর্তন এখানে অনস্বীকার্য। ‘দ্বোয়াদ’র পোর বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য রেখে নি¤েœ ‘র’ যুক্ত করণের পর এর সাথে ও (‘Ñো’) কার বাহুল্য বিবেচনায় এনে আপাতত ‘রমাদ্বান’ লেখাকে কাছাকাছি বিবেচনায় ব্যবহারে চেষ্টা করব।
হযরত মুজাহিদ (রা.)’র বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ শুধু ‘রমাদ্বান’ শব্দে মাসটির উল্লেখ করতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এটাও আল্লাহ্র এক নাম। শাহরু রমাদ্বান অর্থ আল্লাহ্র মাস। পবিত্র কুরআনে মাসের সংখ্যা বারোটি বলে উল্লেখ আছে। কিন্তু কুরআন মাজীদে শুধুমাত্র ‘রমাদ্বান’ ছাড়া আর দ্বিতীয় কোন মাসের নাম উল্লেখ হয়নি। পবিত্র কুরআন মাজীদ নাযিল হওয়ার মাস মাহে রমাদ্বান। এ প্রসঙ্গক্রমে মাসটির নাম কুরআন মাজীদে উক্ত হয়। মাহে রমাদ্বান’র বর্ণাঢ্য উৎসবমুখর পরিবেশ আমাদের এ মাসটির ব্যাপক গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়। অনুরূপ মাসটির আগমনে ব্যাপক ধুম পড়ে যায় আসমানী জগতে। সহীহ্ হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, মাহে রমাদ্বান বরকতময় এক মাস। যাতে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। আর জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর মাসটিতে শয়তানদের শেকল পরানো হয়। মাসটির প্রতিটি রাতে একজন আহ্বানকারী এভাবে আহ্বান করে থাকে যে, ‘হে কল্যাণ প্রত্যাশী, অগ্রসর হও। হে অকল্যাণ তালাশকারী, গুটিয়ে যাও’। এ আহ্বান আসমানী ফেরেশতার, যিনি বিশেষভাবে মাহে রমাদ্বানের সম্মানার্থে নিয়োজিত হন। এই মাসের সময়গুলোতে নেক কাজে সম্পৃক্ত থাকতে আহ্বান করে থাকেন। আবেদ বান্দাগণকে উৎসাহিত করেন এবং পাপীদের সতর্ক করেন। এ মাসে বেহেশত’র দরজা উন্মুক্ত রাখা হয় এবং দোযখের দরজা বন্ধ রাখা হয়, যাতে পৃথিবীতে জান্নাতী আবহ্ বিরাজ করে এবং অপরাধ প্রবণতা হ্রাস পায়। এতকিছুর পরেও যারা অপরাধ বৃত্তি আদৌ ত্যাগ করে না, তারা যদি মুসলিম পরিচয় বহন করে, তবে বলতে হবে নেহায়েত বদ নসীব, শয়তানী তাদের মজ্জাগত হয়ে তারা শয়তানচিত্ত হয়ে গেছে, আল্লাহর রহমত থেকে এরা যোজন দূরে। শয়তান দু’ রকমের। জ্বিন শয়তান ও মানব শয়তান। আমরা প্রত্যেকেই যেন এ কথাটি মনে রাখি। আল্ আয়ামু বিল্লাহ॥
নিজের চাহিদা ও প্রবৃত্তিকে সংযত রাখার অনুশীলন প্রচেষ্টাই সিয়াম। আত্মজয় ও পরহিত ব্রতে এ সাধনা। মানব চিত্তের প্রলোভন এতই চাহিদা প্রবণ যে, যদি তাকে একটি পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ বা একটি স্বর্ণের পাহাড়ও দেয়া হয়, সে বলবে, ‘আহা, যদি এমন আর একটি পেতাম’। নফস’র এ প্রবণতা হ্রাস করতে মোক্ষম সাধনা হল সিয়াম। আমাদের ওপর সিয়াম বা রোযা ফরয করার উদ্দেশ্য হল আমরা যাতে মুত্তাকী হতে পারি। সর্বাবস্থায় খোদাভীতি অন্তরে জাগ্রত রেখে যাবতীয় প্রলোভন ও পাপের প্রবণতা হতে যেন নিজকে বাঁচাতে পারি। পবিত্র কুরআন এ মাসেই অবতীর্ণ হয়। ইহকালে ও পরকালে আমরা যেন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি ধন্য হয়ে উঠতে পারি-এ লক্ষ্যে অবতীর্ণ হয় কুরআনুল কারীম। তারই শোকরানায় মাসব্যাপী বিধাতার বিধান মেনে চলার জন্য এখনই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হই। মুবারক হো মাহে ‘রমাদ্বান’।
লেখক : আরবী প্রভাষক, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা।
খতিব : হযরত খাজা গরীব উল্লাহ শাহ (র.) মাজার জামে মসজিদ।