সেই মুহূর্তে

জোবায়ের রাজু »

আসাদ বিয়ে করেছে ছয় মাস আগে। সোমার যদিও আগে একটা বিয়ে হয়েছে। মোটা অংকের টাকা নিয়ে ডিভোর্সি সোমাকে বিয়ে করতে কোনো আপত্তি ছিল না আসাদের। বিয়ের পর আসাদ টের পেতে থাকে মেয়ে হিসেবে সোমা অসাধারণ। দাউদ নামের সেই ছেলেটা কেন যে সোমাকে নিয়ে সংসার করতে পারল না। বিয়ের এই ছয় মাসে দাউদের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করেনি সে সোমাকে। শুধু খবর নিয়ে জেনেছে দাউদ ছেলেটা অসৎ চরিত্রের ছিল। মদ্যপ হয়ে প্রায়ই রাতে ঘরে এসে বেদম পেটাতো সোমাকে। এমন অমানুষের সঙ্গে ডিভোর্স হওয়ার পর সোমার একদিনও খারাপ লাগেনি।
আসাদের মধ্যে অনেক সরলতা আছে। সেসব ভালো লাগতে শুরু করে সোমার। দাম্পত্য জীবনের এই ছয় মাসে একদিনও আসাদের সাথে বাকবিতণ্ডা হয়নি। আসাদ যে পেশায় একজন সামান্য চটপটিওয়ালা, এ ব্যাপারে কোনো অভিযোগ নেই তার। বিয়ের আগে সোমা জেনেছে আসাদ একজন ব্যবসায়ী। কিন্তু সেই ব্যবসা যে সামান্য চটপটির হবে, এই ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল না সোমাদের। দিন দিন আসাদের নম্রতা ভদ্রতার মোহে ডুবে যায় সোমা। ফলে আসাদের চটপটিওয়ালা পরিচয় একেবারেই গৌণ হয়ে যায় সবার কাছে।
এবার শীতের কমতি নেই। সোমা আসাদের কাছে একটা লোশনের আবদার করেছে। শীতে যে তার হাত-পা ফেটে বিবর্ণ রূপ ধারণ করছে। কিন্তু লোশনের যা দাম, এত টাকায় লোশন কিনতে আসাদের সাহস দিচ্ছে না। তাই সোমার জন্য লোশন কিনবে কি কিনবে না, এ ব্যাপারে কোনো কথা দিতে পারছে না আপাতত।
২.
রাতে আসাদের আনা লোশনের ডিব্বাটি পেয়ে সোমার মনে খুশির অন্ত রইল না। এত বড় লোশনের ডিব্বা। নিশ্চয়ই ম্যালা দাম নিয়েছে। কত দাম নিয়েছে, সে ব্যাপারে আসাদকে কোনো প্রশ্ন না করে সোমা বরং লোশনের বড় ডিব্বাটি তার ট্রাংকে ভরে রাখে।
পরের দিন বাজারের চটপটি বেচায় মনোযোগী আসাদ। এমন সময় সে সোমার উপস্থিত টের পেল। না বলে কয়ে হঠাৎ এভাবে বাজারে আসার কারণ জানতে চাইলে সোমা তার ব্যাগ থেকে গতকালের লোশনের ডিব্বাটি বের করে আসাদকে দেখিয়ে বলে, ‘কোন দোকানদারের কাছ থেকে এটা কিনেছো? আমাকে সেখানে নিয়ে চলো।’
আসাদ জানতে চায়, ‘কেন, সমস্যা কী?
সোমা জানায়, ‘তুমি সরল মনের মানুষ। তাই বলে দোকানি তোমাকে নষ্ট লোশন দেবে? এই লোশনের মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছর আগে।’
আসাদ হা করে লোশনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর সোমার হাত থেকে লোশনের ডিব্বাটি নিয়ে বলল, ‘তুমি বাড়ি চলে যাও। আমি এখন ব্যস্ত। সময় করে ওই দোকানে যাব। তারপর বকা দিয়ে বলবো কেন এই মেয়াদ উত্তীর্ণ জিনিস আমার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে!’
সোমা বাড়ি চলে গেল। কাস্টমারের কমতি দেখে আসাদ সোমার রেখে যাওয়া লোশনটি বের করে সোজা চলে এল কালী মন্দিরের পেছনের ঝোপের পাশে। তারপর এদিক সেদিক তাকিয়ে লোশনের ডিব্বাটি ছুঁড়ে ফেলে দিল ঝোপের গহীনে। চুপিচুপি সেখান থেকে চলে এল।
এই লোশনটি কিনেনি আসাদ। সোমার আবদার রাখতে যে লোশন কিনতে সে গতকাল কসমেটিক দোকানে ঢুকে লোশনের দাম জানতে চাওয়ার পর দোকানি যা দাম শোনাল, সে টাকা আসাদের ছিল না বলে দোকান থেকে বের হয়ে আসার সময় খেয়াল করল দোকানের গেটের ধারে ময়লার ব্যাগের পাশে বড় একটি লোশনের ডিব্বা পড়ে আছে। নিশ্চয়ই ওদের বেখেয়ালে লোশনটি এখানে পড়েছিল। দোকানি তখন ফেসবুকে মগ্ন থাকার কারণে আসাদ কৌশল করে লোশনের ডিব্বাটি চুরি করে বেরিয়ে আসে। সোমার জন্য একটা লোশনের ব্যবস্থা হয়েছে জেনে খুশিও হয়। কিন্তু তখনও সে জানতো না লোশনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার কারণে কর্তৃপক্ষ এটি পরিত্যক্ত পণ্য হিসেবে ময়লার ব্যাগের কাছে অবহেলায় রেখে ফেলেছে।
রাতে মন খারাপ করে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় আসাদ। সোমা হয়তো এই শীতের রাতে তার শখের লোশনের জন্য অপেক্ষায় বসে আছে। কিন্তু আসাদ সে লোশন কিনতে পারেনি। অনেক দাম লোশনের। সোমাকে কী জবাব দেবে বুঝতে পারছে না। যারা গরীব হয়ে জন্মায়, তারা তাদের জীবনের অনেক কিছু বুঝতে পারে না।