নাসির উদ্দিন হায়দার »
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথাটা স্মরণীয়, ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে পূর্ণ মানবত্বের বিকাশ ঘটানো।’ (সূত্র প্রবন্থ শিক্ষা (গ্রন্থ শিক্ষা)।
শিক্ষা বিষয়ে ‘জ্যোতির্ময় পুরুষ’ সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের বক্তব্য অমূল্য, ‘শিক্ষার সাথে দীক্ষা, বিদ্যার সাথে বিনয়, কর্মের সাথে নিষ্ঠা, জীবনের সাথে মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেমের সংমিশ্রণ ঘটাতে না পারলে প্রকৃতপক্ষে সে শিক্ষা আসল শিক্ষা নয়।’
কবি আর সুফীরা দিব্যজ্ঞানী হয়, তাই কি রবিকবি ও সুফী মিজানের বাণীতে এই প্রেমময় যোগসূত্র!
আজ বলব এমন একজন মানুষের কথাুযার জীবন সংগ্রামে গড়া, আধ্যাত্মিকতায় মোড়া। তিনি জ্ঞানী, তিনি ধ্যানী। তিনি ধার্মিক, তিনি মানবপ্রেমিক। তিনি বাণিজ্যের লক্ষ্মী, তিনি দেশ গড়ার অগ্রনায়ক। কর্মে, জ্ঞানেুগুণে দেশজোড়া তার খ্যাতি। কবি আল মাহমুদের কবিতার চরণ ধার করে বলতে হয়, তিনি ভালোবাসা ছাড়া আর কোন ব্যবসা শেখেননি। সেই অতুলনীয় মানবের নাম সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, পিএইচপি ফ্যামিলির চেয়ারম্যান।
আজ সুফী মিজানের ৮৪তম খোশরোজ শরীফ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্যের ইতিহাসে শূন্য থেকে শীর্ষে উঠা এই মানুষটির মূল শক্তি হলো তার নৈতিক শিক্ষা। তার কাছে এই শিক্ষা আসে ঐশীপ্রেমের স্মারক হয়ে। কবিয়াল রমেশ শীলের গানের ভাষায় তিনি ‘সিনায় সিনায়’ শিক্ষা নেন, শিক্ষা দেন।
সুফী মিজান ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার চরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলহাজ মোহাম্মদ দায়েম উদ্দিন প্রধান, মা রাহাতুন নেছা দেওয়ান। সুফি মিজান বলেন, ‘বাবাই হলেন আমার জীবনের মহানায়ক, তিনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন। মানুষের হক, দেশের হক, প্রতিষ্ঠানের হক সব আমি বিবেচনার সঙ্গে নিই, যা আমি আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি।’ (সূত্র : সেবায় এ দেহ লীন, সুফি মিজানুর রহমান : ৭৫ বর্ষপূতি প্রামাণ্যগ্রন্থ)
সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমানের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার গ্রামের পাঠশালায়, পাশাপাশি মক্তবে আরবি শিক্ষা লাভ করেন। ভারতচন্দ্র স্কুল থেকে ১৯৬১ সালে ম্যাট্রিক, ৬৩ সালে নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে আইকম ও ৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একই কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। সেবছর বিকমে মাত্র ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল, সুফী মিজান ছিলেন তাদেরই একজন।
৬৩ সালে কলেজে পড়াকালীন নারায়ণগঞ্জের দিগবাবু বাজারের ‘জালাল জুট বেইলিং করপোরেশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ১০০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন সুফী মিজান। ৬৫ সালের ১৯ মার্চ বিকম পড়াকালীন ১৬৭ টাকা বেতনে তিনি তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের (বর্তমানে সোনালী ব্যাংক) চট্টগ্রাম লালদীঘি শাখায় জুনিয়র ক্লার্কের সরকারি চাকরি নেন। দুই বছর পর ৬৭ সালে চার ধাপ এগিয়ে তৎকালীন ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) খাতুনগঞ্জ শাখায় বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগে ব্যবস্থাপক হিসাবে যোগ দেন।
স্বাধীনতার পর ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে ট্রেডিং ব্যবসায় নামেন সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। বড় ছেলে মহসিনের জন্ম উপলক্ষে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পাওয়া উপহারের ১৪৮৩ টাকা ছিল ব্যবসার প্রথম পূঁজি। ব্যাংকের চাকরি করায় বাজার সম্পর্কে ভাল ধারণা ছিল, আমদানিুরপ্তানি ব্যবসার খুঁটিনাটি ঠোঁটস্থ ছিল। কোন দেশে কোন জিনিস তৈরি হয়, কোন দেশের ভাল জিনিস কম দামে পাওয়া যায়, নিজের দেশে কোন সিজনে কোন জিনিসটা ভাল দামে বিক্রি হয়ুএসব জানা ছিল তার। ফলে ব্যবসায় শুরু থেকেই অভাবনীয় উন্নতি করতে থাকেন সুফী মিজান।
জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য সুফী মিজানুর রহমানকে কতটা সংগ্রাম করতে হয়েছে, তা নিচের ঘটনা সাক্ষ্য দেয়। শুরু দিকে সুফী মিজান খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ ব্রাদার্স, জাকারিয়া ব্রাদার্স, মেসার্স ইমাম শরীফ ও ডায়মন্ড করপোরেশন থেকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, গম এমনকি লেবু পর্যন্ত কিনে ট্রাকে করে তা পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে নিয়ে বিক্রি করেছেন। লাভ নিজের হাতে রেখে পণ্যের দাম শোধ করে দিয়েছেন। শবে বরাতের সময় মোমবাতি বেশি চলত বলে তিনি মোমবাতির ব্যবসাও করেছেন।
১৯৮২ সালে যখন তার কাছে ২০ কোটি টাকার মতো পূঁজি হয়, তখন তিনি ব্যবসায়ী থেকে উদ্যোক্তা হিসাবে যাত্রা শুরু করেন। প্রথমে শিপ ব্রেকিং, এরপর রি রোলিং। ৮৪ সালে মংলা ইঞ্জিনয়ার্স ওয়ার্ক নামে দেশের প্রথম বিলেট কারখানা দেন সুফী মিজান। ৮৬ সালে করলেন ঢেউটিন কারখানা। ৯৭ সালে সীতাকুণ্ডের কুমিরায় দিলেন সিআর (কোল্ড রোল) কয়েল কারখানা। এরই ধারবাহিকতায় ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন পিএইচপি গ্রুপ। (পিএইচপি অর্থ পিস, হ্যাপিনেস, প্রসপারেটি শান্তি, সুখ, সমৃদ্ধি)। বর্তমানে পিএইচপি ফ্যামিলি ইস্পাত, ফ্লোট গ্লাস, অ্যালুমোনিয়াম, টেক্সটাইল, পাওয়ার, পেট্রো রিফাইনারি, ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস, এগ্রো ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে ৩০টির বেশি শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। ইউআইটিএস বিশ্ববিদ্যালয় দেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
১৯৬৭ সালের ৪ জুলাই বাল্যবন্ধু রোকন উদ্দিন মোল্লার ছোট বোন তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। এই দম্পতির সাত ছেলে ও এক মেয়ে। সুফী মিজান বলেন, ‘সাত ভাই চম্পা’। বড় ছেলে মোহাম্মদ মহসিন পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান। মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন, মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, মোহাম্মদ আলী হোসেন, মোহাম্মদ আমির সোহেল, মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও আকতার পারভেজ গ্রুপের পরিচালক। সুফী মিজানের ছেলেরা সবাই আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার নামজাদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রিধারী। তৃতীয় প্রজন্মের ভিক্টর মহসিন ও নোবেল মিজান উচ্চশিক্ষা শেষে পরিচালক হিসাবে যোগ দিয়েছেন পিএইচপি ফ্যামিলিতে।
ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন কথা প্রসঙ্গে একবার বলেছিলেন, তিনি ও তার ভাইয়েরা যখন ছোটবেলায় বাবার অফিসে যেতেন তখন বাবা তাদের একটা কাজ দিতেন, আরে সেটা হলোুঅফিসে আসা দর্শনার্থীদের জুতোুজোড়া পরিস্কার করে রেকে গুছিয়ে রাখা। সুফী মিজান এভাবে খুব ছোটবেলাতেই সন্তানদের মন থেকে অংকার দূর করে দিয়েছেন। তাই তো সুফী মিজানের প্রতিটি সন্তান বাবার আদর্শে আদর্শিক।
সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান একই সঙ্গে সুফী ও ব্যবসায়ী। ২০০০ সালে আল্লামা রুমী সোসাইটির কর্ণধার অলিয়ে কামেল সৈয়দ আহমদুল হক (১৯১৮-২০১১) তাকে সুফী উপাধি দেন। অবশ্য আরও ৬০ বছর আগে থেকেই সুফী মিজান সুফীবাদুপ্রেমবাদের দিশারী।
মাইজভাণ্ডার দরবারের মহান আউলিয়া সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী ও সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারীর বেলায়তের উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন হযরত সৈয়দ আবদুচ্ছালাম ঈছাপুরি। মওলানা ঈছাপুরির ঐশীপ্রেমের পবিত্র নিশান হলেন সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ১৯৬৩ সালে প্রথম স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি মওলানা ঈছাপুরির পাক কদমে হাজিরা দেন। প্রথম দর্শনে হুজুর কেবলা সুফী মিজানকে নিয়ে তিনটি কালাম করেন। ১. বাবা আপনি আমার দরবারে আসবেন তা আমি মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ থেকে বেশারত পেয়েছি। ২. কেউ কখনো আপনার ঈমান নষ্ট করতে পারবে না। ৩. আপনার দ্বারা আমার দরবারের অনেক খেদমত হবে।
কে না জানে, মাইজভাণ্ডার ও আস্তানাুএ ঈছাপুরি তো বটেই, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অসংখ্য দরবারের খেদমত করে যাচ্ছেন সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। পাশাপাশি সুফী সংগীত ও চাটগাঁইয়া গানেরও বড় পৃষ্ঠপোষক তিনি। পিএইচপি হাউজ দেশবিদেশের গুণী ও সুফী শিল্পীদের ভাবকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মরমী, মাইজভাণ্ডারী ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পীদের প্রতি তার ভালোবাসা অনবদ্য। পিএইচপি হাউজে নিয়মিত ছেমা মাহফিলে সাধনসংগীতের ভাবরসে প্রমত্ত হন আশেকরা।
সুফী মিজান ফাউন্ডেশন চাটগাঁইয়া গানের ইতিহাসে একটি অবস্মরণীয় কাজ করেছে। ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ও পিএইচপি ফ্যামিলির পরিচালক আনোয়ারুল হকের পৃষ্ঠোপোষকতায় কিংবদন্তী সংগীতজ্ঞ আবদুল গফুর হালীর ৩০০ গানের স্বরলিপিসহ তিনটি গীতিকাব্য (সুরের বন্ধন, শিকড় ও দিওয়ানে মাইজভাণ্ডারী) প্রকাশিত হয়েছে। ফাউন্ডেশন গফুর হালীর ৬টি আঞ্চলিক নাটক নিয়ে প্রকাশ করেছে ‘চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র’। এসব বই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘আইকনিক গ্রন্থ’ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বখ্যাত গবেষক হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. হান্স হার্দার এসব গ্রন্থের উচ্চ প্রশংসা করেছেন।
মানবদরদী, সমাজদরদী ও সুরপ্রেমী সুফী মোহাম্মদ মিজানুর রহমান সমাজসেবায় একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। মাহাথির মোহাম্মদের মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব সুফী মিজানের গুণে মুগ্ধুএটা অসামান্য এক ব্যাপার। তাইতো আবদুল গফুর হালী লেখেন…
আমি একজন শিল্পপতিকে চিনি
যিনি শুধু নিজের কথা ভাবেন না
সব মানুষের কথা ভাবেন
গরিব দুঃখীদের অকাতরে করেন দান
আমার সেই প্রিয় মানুষটির নাম
আলহাজ শাহ সুফী মিজানুর রহমান।
লেখক : সাংবাদিক ও লোকসংগীত গবেষক


















































