সাংবাদিক নেতা শহীদ উল আলমসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

0
201

প্লট জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক :
সদস্য না হওয়া সত্বেও তিনজনকে চট্টগ্রাম সাংবাদিক কো অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির প্লট দেয়া হয়েছে। নিয়ম ভেঙে করা হয়েছে নকশা বর্হিভূত কাজ। সোসাইটির তিন সদস্যের স্ত্রীদের নামে প্লট বরাদ্দ দিতে এমন জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটি’র সাবেক চার নেতা। শুধু তাই নয়, হাউজিংয়ের শর্ত অনুযায়ী প্লট হস্তান্তর করার সময় সরকারি কোষাগারে ২৫ শতাংশ অর্থ জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে আত্মসাৎ করেছেন নিজেরাই। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এমন অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠে এসেছে। দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, নিজেরা লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যেই এমন কাজ করেছেন তারা।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও জাল জালিয়াতির মাধ্যমে মসজিদ ও কবরস্থানসহ সরকারি জায়গা দখল নিয়ে বরাদ্দ দেয়ার ঘটনায় সাংবাদিক হাউজিং সোসাইটির সাবেক চার নেতা ও তাদের স্ত্রীসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশন সমন্বিত জেলা কার্যালয়-চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক মো. আবু সাঈদ বাদি হয়ে গত ২৫ নভেম্বর এ মামলা (নং- ১৪) করেন।
আসামিরা হলেন : সাংবাদিক কো অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি’র সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুব উল আলম, সাবেক সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, সাবেক কোষাধ্যক্ষ শহীদ উল আলম, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নির্মল চন্দ্র দাশ, তার স্ত্রী তাপতী দাশ, শহীদুল আলমের স্ত্রী তসলিমা খানম, নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী হোসনে আরা, মো. সেলিম ও মোসাম্মৎ হুমায়েরা ওয়াদুদ।
মামলার এজহারে বলা হয়, চট্টগ্রাম শহরে বসবাসরত সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা নিরসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৯৮২ সালে তৎকালীন পাঁচলাইশ থানাধীন বর্তমানে বায়েজিদ থানার ষোলশহর মৌজায় ১৬ একর সরকারি জমি লিজ দেয়া হয়। শর্ত ছিল, লিজ প্রাপ্ত সম্পত্তি বা তার কোন অংশ কোনভাবে হস্তান্তর করতে হলে লিজদাতা তথা জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিতে হবে এবং উক্ত সম্পত্তির বাজার মূল্যের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে পরিশোধ করতে হবে। ১৯৯২ সালে ওই জমিতে ১০৯টি প্লট চিহ্নিত করে নকশা অনুমোদন দেয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃক্ষ (সিডিএ)। যাতে রাস্তা, মসজিদ, কবরস্থানসহ আবাসনের অপরিহার্য স্থানও চিহ্নিত করা হয়। অনুমোদিত নকশা তৎকালীন সমিতির সম্পাদক নিজাম উদ্দিন আহমদকে হস্তান্তর করেন কর্তৃপক্ষ। যদিও পরবর্তীতে সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তে অনুমোদিত ১০৯টি প্লটের মধ্যে ১০৮টি প্লট সমিতির সদস্যদের ইজারা দেয়া হয়। বাকি একটি প্লট বিদ্যুৎ-গ্যাস ও পানির কার্যক্রম তদারকি স্থানের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়।
এরমধ্যে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত নির্বাচনে জয়ী হয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব নেন মাহবুব উল আলম, নিজাম উদ্দিন আহমেদ, শহীদ উল আলম ও নির্মল চন্দ্র দাশ। তাদের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে সিডিএ’র অনুমোদিত নকশার মসজিদ ও কবরস্থানের জন্য সংরক্ষিত জমিসহ পাশর্^বর্তী সরকারি জায়গার উপর অভিযুক্তদের লোলুপ দৃষ্টি পড়ে বলে উল্লেখ করা হয় এজহারে।
যেভাবে দেয়া হয় প্লট বরাদ্দ : এজাহারে উল্লেখ করে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে জাল- জালিয়াতির মাধ্যমে সাংবাদিক হাউজিংয়ের অনুমোদিত নকশার মসজিদ ও কবরস্থানসহ পাশর্^স্থ সরকারি জমি দখল দেখিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে চারটি প্লট যুক্ত করে ১১৩ প্লট সম্বলিত একটি মিথ্যা ও বানোয়াট নকশা প্রণয়ন করেন। যা সিডিএ’র অনুমোদিত নয়। এরমধ্যেই ১৯৯৬ সালের ২৫ জুলাইয়ে নির্মল চন্দ্র দাশের স্ত্রী তাপতী দাশের নামে বেআইনিভাবে বরাদ্দ দেন সভাপতি মাহবুবুল আলম ও সম্পাদক নিজাম উদ্দিন। যাতে কোষাধ্যক্ষ শহীদ উল আলম ও নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী হোসনে আরাকে সাক্ষী করা হয়। কিন্তু সমিতির অনুমতি না নিয়ে একই দলিল দিয়ে ২০০৫ সালের ২৯ মে মো. সেলিমের কাছে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার টাকায় প্লট বিক্রয় করেন তাপতী দাশ। যদিও শর্ত অনুযায়ী ২৫ শতাংশ অর্থ অর্থাৎ ১ লাখ ৩১ হাজার ২৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন আসামিরা।
একইভাবে নিজেদের সৃজন করা ১১০ নম্বর প্লট সমিতির সদস্য না হওয়া সত্ত্বেও শহীদ উল আলমের স্ত্রী তসলিমা খানমের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। যা পরবর্তীতে তসলিমা খানম ২০০৩ সালের ১৯ মার্চে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সাবেক ডিএফও আব্দুল ওয়াদুদের স্ত্রী হুমায়েরা ওয়াদুদের কাছে ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। এখানেও শর্তানুযায়ী ১ লাখ ৪ হাজার ৫০০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেয়ার কথা থাকলেও তা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন তারা। এছাড়া ১১১ নম্বর প্লটটিও একই কায়দায় আসামি নিজাম উদ্দিনের স্ত্রী হোসনে আরার নামে বরাদ্দ দেয়া হয়। যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
আপত্তি উঠে সোসাইটির তৎকালীন কমিটির পক্ষ থেকেও : প্লট নিয়ে অনিয়মের বিষয়টি জানার পর সমিতির তৎকালীন সদস্য প্রয়াত কাজী জাফরুল ইসলাম ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে সিডিএ’র বরাবরে জালিয়াতিপূর্ণ নকশার বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করতে আবেদন করেন। পরবর্তীতে একই বছরের ২৬ জানুয়ারি সিডিএ’র সিনিয়র প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার মো. মহসীন লিখিতভাবে সৃজনকৃত নকশা চউকের অনুমোদিত নয় বলে জানান। যা নিয়ে পরবর্তীতে সমিতির অভ্যান্তরীণ তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়। কমিটিও বিষয়টি তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পায় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
জালিয়াতির প্রমাণ মিলে সমবায় অফিসের তদন্তে : ২০০৪ সালের ১০ জানুয়ারি প্রয়াত প্রবীণ সাংবাদিক কাজী জাফরুল ইসলামসহ অন্য সদস্যের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জেলা সমবায় কার্যালয় থেকেও অনিয়মের আলোচ্য বিষয়ে তদন্ত শুরু হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা থানা সমবায় অফিসার মো. মঞ্জুরুল আলম তদন্ত শেষে একই বছরের ২৫ মে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। যাতে উল্লেখ করা হয় ‘তিনজন কর্মকর্তার স্ত্রী নামে সমিতির প্লট বরাদ্দের বিষয়টি প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত, প্রাক্তন কমিটি কর্তৃক ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ প্লট বরাদ্দ, নকশা বহির্ভূত কার্যক্রম ইত্যাদি ব্যাপক তদন্তের বিষয় হওয়ায় ‘সমবায় আইন/০১ এর ৪৯ ধারায় ব্যবস্থা গ্রহণ ব্যতিরেকে সমাধান করা সম্ভব নহে’ বলে সুপারিশ করেন। সুপারিশের প্রেক্ষিতে জেলা সমবায় অফিস থেকে দুজন তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘বিরোধী তিনটি প্লট বরাদ্দ/হস্তান্তর/রেজিস্ট্রি ইত্যাদি সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ও বিধিবহিভূর্ত এবং বাতিলযোগ্য। উল্লেখিত তিনটি প্লট বরাদ্দ/হস্তান্তরসহ যাবতীয় অবৈধ কর্মকান্ড সম্পাদনের জন্য ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম, নির্মল দাশ, শহীদ উল আলম, নিজাম উদ্দিন একক ও যৌথভাবে দায়ী।’ পরবর্তীতে অবৈধ ওই তিনটি প্লট বাতিল করে সমবায় অফিস। সমবায় অফিসের এই আদেশের বিরুদ্ধে অভিযুক্তরা হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে ৬ নভেম্বর আদালত উক্ত রিট খারিজ করে আবেদন নিস্পত্তি করেন। অভিযুক্তদের আবেদন খারিজ হওয়ার পর বেআইনিভাবে বরাদ্দ পাওয়া ৩টি প্লট উদ্ধারে ১৫৬ জন সদস্যের উপস্থিতিতে এজেন্ডাভিত্তিক আলোচনা হয়। যা বার্ষিক সাধারণ সভার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আসামীদের বিরুদ্ধে দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলা দায়ের করার সিদ্ধান্তসহ পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়।
অবশেষে দুদকের মামলা : পুরো ঘটনার ব্যাপারে দুদকের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে অনুসন্ধান কর্মকর্তা কমিশন বরাবর চলতি বছরের গত ২৬ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিল করেন। এরপ্রেক্ষিতে কমিশন অভিযুক্ত এ ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দেন। গত ২৪ নভেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক (অনুসন্ধান ও তদন্ত-৫) মো. আনোয়ারুল হকের সাক্ষরিত এক চিঠিতে মামলা দায়ের করে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দুদক জেলা কার্যালয়-চট্টগ্রাম-১ -কে নির্দেশনা দেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতেই গত ২৫ নভেম্বর সহকারী পরিচালক আবু সাঈদ বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা রুজু করেন একই কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. এনামুল হক।