সাম্প্রতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেশের সড়ক পরিস্থিতির যে বীভৎস চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল উদ্বেগজনক নয়, বরং রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ১৭ থেকে ২৬ মার্চ—এই মাত্র দশ দিনে দেশে ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৭৪ জন। উৎসব বা ছুটির আমেজ যখন মানুষের মনে প্রশান্তি আনার কথা, তখন প্রিয়জনের লাশ হয়ে বাড়ি ফেরা এক নির্মম জাতীয় ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, আমাদের সড়কগুলো এখন আর যাতায়াতের মাধ্যম নয়, বরং মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি ধ্রুব কারণ বছরের পর বছর ধরে বিদ্যমান। প্রথমত, বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা। চালকদের মধ্যে আগে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। দ্বিতীয়ত, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অবৈধ থ্রি-হুইলার। হাইওয়েতে ধীরগতির যানবাহন ও যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ বাসের অবাধ চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়ত, চালকদের ক্লান্তি ও অদক্ষতা। বিশেষ করে উৎসবের সময় চালকরা বিশ্রামের সুযোগ না পেয়ে টানা গাড়ি চালান, যা মারাত্মক দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সড়ক নিরাপদ করতে হলে কেবল শোক প্রকাশ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কাঠামোগত পরিবর্তন ও আইনের কঠোর প্রয়োগ। লাইসেন্সবিহীন চালক এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। দেশের মহাসড়কগুলোর ব্ল্যাক স্পট বা দুর্ঘটনাপ্রবণ বাঁকগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার করতে হবে।চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দূরপাল্লার পথে পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একজন চালক যেন টানা ৮ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালান, তা তদারকি করা প্রয়োজন। হাইওয়েগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং স্পিড গান ব্যবহারের মাধ্যমে গতির সীমাবদ্ধতা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ডিজিটাল ট্রাফিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা উন্নত করা এখন সময়ের দাবি। যত্রতত্র রাস্তা পারাপার বন্ধে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে পথচারীদের উৎসাহিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কোনো নিয়তি নয়, বরং এটি একটি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। ২৭৪টি প্রাণ ঝরে যাওয়ার অর্থ হলো ২৭৪টি পরিবারের স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া। আমরা যদি আজই সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হই, তবে কালকের সংবাদপত্রের পাতায় আরও বড় কোনো শোকের খবর আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে। নিরাপদ সড়ক কেবল একটি স্লোগান নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় সরকার, পরিবহন মালিক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনগণ—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
এ মুহূর্তের সংবাদ


















































