সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ না হলে কঠোর কর্মসূচি

0
290

ঐক্য পরিষদের অবস্থান কর্মসূচিতে রানা দাশগুপ্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক :
হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সম্প্রদায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা গণনায় সংখ্যালঘু হতে পারে কিন্তু সারাবিশে^ সংখ্যালঘু নয়। আজ সবাইকে ভেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দুর্বল করলে, ভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরা সবল থাকবে এটা ভাববার কোন কারণ নেই। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। সামনে এগুনো ছাড়া বিকল্প পথ নেই। সংখ্যালঘুরা আর পালিয়ে যাবে না। কেউ পাশে না থাকলেও ঐক্যবদ্ধ শক্তি দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, অন্যায় এবং জুলুমের প্রতিবাদ করতে হবে। সমস্যার সমাধান না হলে এবং সংখ্যালঘুদের দাবি মানা না হলে ভবিষ্যতে লং মার্চের মতো কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে।
গতকাল শনিবার সকাল ১০টায় নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ আয়োজিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে অবস্থান কর্মসূচি পালনকালে পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত এসব কথা বলেন।
অবস্থান কর্মসূচিতে নগরী ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে বিভিন্ন সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী ব্যানার, ফেস্টুন ও প্লে কার্ড নিয়ে অংশ নেন।
অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘এ দেশের সংখ্যালঘুদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া দল ও সরকারের আর কারো উপর আস্থা ও বিশ^াস নেই। কারণ তারা যা বলেন তা করেন না, যা করেন তা বলেন না। সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষায় আপনি অনেকবার অনেক ভূমিকা রেখেছেন। উপর থেকে পানি ফেলেছেন কিন্তু সেই পানি নিচের দিকে দেখা আমরা পাইনি। কারণ আপনার দলের ভেতর দল আছে, আপনার প্রশাসনে পাকিস্তান আছে। প্রধানমন্ত্রী চান সংখ্যালঘুরা শান্তিতে থাকুক। কিন্তু দলের কয়জন চান সে নিয়ে সন্দেহ আছে।’
তিনি বলেন, ৬৪’র সাম্প্রদায়িক হামলার সময় দু’জন রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আতাউর রহমান খান এগিয়ে এসে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেছিলেন, শ্লোগান তুলেছিলেন, ‘বাঙালি রুখিয়া দাঁড়াও’-আজ সেই রাজনীতিবিদরা কোথায়? সাম্প্রদায়িকতার ক্রম উত্থান ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে রাজনীতিবিদদের কোনো ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ নেই।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা নূর হোসাইন কাসেমীকে ধন্যবাদ জানিয়ে রানা দাশগুপ্ত বলেন, পরশু এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মানবাধিকারবিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে সরকারকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। লালমনিরহাট ও কুমিল্লার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যেকোন ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তদন্তের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতে বলেছেন।
‘কিন্তু দুঃখের সাথে বলছি মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আপনি আমাদের ঘনিষ্ঠজন। আপনার কাছে বছরে চার থেকে ছয়বার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংকট নিয়ে কথা বলি। আজকে যখন আপনি বলেন, বাড়িয়ে বলা হচ্ছে। তাহলে হেফাজতে ইসলামের নেতাও কী বাড়িয়ে বলছেন?’
‘আমরা কখনো দেখিনি এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কারো ধর্ম অবমাননা করেছে। আমরা নিজেদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। একই সাথে অপরের ধর্মের প্রতিও আমরা সমানভাবে শ্রদ্ধাশীল। অথচ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হামলা হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে। কুশল চক্রবর্তীকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। শুধু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নয়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধর্মপ্রাণ শহীদুন্নবীকে হত্যা করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাদের বাড়িঘরে-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হচ্ছে, ছাত্র-ছাত্রীদের ছাত্রত্ব বাতিলের অপ্রপ্রয়াস চলছে, যারা ভিকটিম তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হচ্ছে, বাংলাদেশ সংখ্যালঘু শূন্য করার হুমকি দিচ্ছে। অথচ, সরকার ও প্রশাসন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। ফেইসবুক হ্যাক করে যেসব দুর্বৃত্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে চলেছে তাদের চিহ্নিত ও গ্রেফতার না করে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। এর ফল কখনো শুভ হবে না।
একাট্টা হয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে রুখে না দাঁড়ালে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। দেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছে তখন সবারই ভাবা দরকার এ দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের দেশ আছে কি না?’
কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে যে পরিবর্তন এসেছে সেটিকে আমরা স্বাধীনতার চেতনায় ফেরাতে পারিনি। আজ রাজনীতি ও সমাজে সাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আকাক্সক্ষা থেকে আজ আমরা অনেক দূরে।’
প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিক্ষু তার বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা কেমন আছেন! উপস্থিত জনতা বলেন, ‘আমরা ভালো নেই।’
হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিতাই প্রসাদ ঘোষ পরিচালনায় এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পরিষদের তাপস হোড়, অ্যাডভোকেট অজিত নারায়ণ অধিকারী, শ্যামল কুমার পালিত, অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার, শ্রীপ্রকাশ দাশ অসিত, অ্যাডভোকেট তপন কান্তি দাশ, সুমন দেবনাথ, অ্যাডভোকেট প্রদীপ কুমার চৌধুরী, অ্যাডভোকেট চন্দন বিশ^াস, অসীম কুমার দেব, সুমন কান্তি দে ও বিশ^জিৎ পালিত, বিকাশ মজুমদার, দেবাশীষ নাথ দেবু, অ্যাডভোকেট রুবেল পাল, রিমন মহুরী, পুলক খাস্তগীর, শৈবাল দাশ সুমন, রুমকি সেনগুপ্তা ও নিলু নাগ প্রমুখ।
সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি নিউমার্কেট থেকে কোতোয়ালী হয়ে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এসে শেষ হয়।