শনখোলা পাড়ার কৃষি বিপ্লব একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত

23খাগড়াছড়ির দীঘিনালা এক সময় তামাক চাষের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু পাহাড়ের সেই ধূসর তামাকের ধোঁয়া ভেদ করে এখন উঁকি দিচ্ছে সবুজ বিপ্লবের নতুন সম্ভাবনা। মাইনী নদীর তীরবর্তী শনখোলা পাড়ার কৃষকেরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশককে বিদায় জানিয়ে বেছে নিয়েছেন সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও বিষমুক্ত পদ্ধতি। এই পরিবর্তন কেবল একটি জনপদের কৃষি চিত্র বদলে দিচ্ছে না, বরং টেকসই ও পরিবেশবান্ধব আগামীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে।

শনখোলা পাড়ার এই নীরব বিপ্লবের মূলে রয়েছে মানুষের সচেতনতা এবং সঠিক দিকনির্দেশনা। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘তৃণমূল’-এর হাত ধরে শুরু হওয়া এই অগ্রযাত্রায় যুক্ত হয়েছেন প্রায় ৪০ জন কৃষক। শৈলেন্দ্র প্রসাদ চাকমা বা তুহিনা চাকমার মতো প্রান্তিক কৃষকেরা প্রমাণ করেছেন যে, আধুনিক বিজ্ঞানের নাম করে ঢেলে দেওয়া রাসায়নিক ছাড়াও অধিক ফলন সম্ভব। পুকুরের একই জলাধারে মাছ, ধান ও কচু চাষের মতো সমন্বিত উদ্যোগ আমাদের কৃষিকে নিয়ে যাচ্ছে এক অনন্য উচ্চতায়। এটি যেমন মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করছে, তেমনি নিশ্চিত করছে নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহ।

প্রাকৃতিক উপায়ে চাষাবাদ শুধু স্বাস্থ্যকর নয়, এটি কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান করছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক কেনার উচ্চমূল্য থেকে কৃষকেরা মুক্তি পাচ্ছেন। নিজেদের বাড়িতে তৈরি জৈব সার এবং রেশমি চাকমার মতো উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত ‘ভার্মি কম্পোস্ট’ বা কেঁচো সারের ব্যবহার উৎপাদন খরচ কমিয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ। বিষমুক্ত ফসলের চাহিদা বাজারে এতই বেশি যে, কৃষকদের এখন আর পণ্য বিক্রি করতে বাজারে ছুটতে হচ্ছে না; বরং পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা জমি থেকেই সতেজ সবজি কিনে নিচ্ছেন।
সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো তামাক চাষ থেকে কৃষকদের ফিরে আসা। তামাক চাষ যেমন মাটির উর্বরতা নষ্ট করে, তেমনি মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। সেই বিষাক্ত ফসলের বদলে মাচায় মাচায় লাউ, শসা আর ক্ষীরার সবুজ আভা পাহাড়ের প্রাণবৈচিত্র্যকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

শনখোলা পাড়ার এই উদ্যোগ এখন আর কেবল একটি পাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের এই কঠিন সময়ে রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব কৃষিই হলো আমাদের ভবিষ্যৎ। কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, তামাক চাষের প্রতি আগ্রহ কমা এবং বিষমুক্ত সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়া একটি শুভলক্ষণ। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যদি এই মডেল সারা খাগড়াছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে পাহাড় হয়ে উঠবে নিরাপদ খাদ্যের সবচেয়ে বড় ভাণ্ডার।
শনখোলা পাড়ার কৃষকেরা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে, প্রকৃতির সঙ্গে সন্ধি করেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব। তাঁদের এই পরিশ্রম আর নিষ্ঠা কেবল নিজেদের ভাগ্য বদলাচ্ছে না, বরং আমাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বিষমুক্ত আহার। এই কৃষি বিপ্লব অব্যাহত থাকুক এবং পাহাড়ের প্রতিটি ভাঁজে ছড়িয়ে পড়ুক এ দৃষ্টান্ত।