রাতুলপিডিয়া

গাজী তারেক আজিজ »

এবারের বইমেলা একটা ভিন্ন চমক নিয়ে হাজির। একটা স্টলে বই বদল করে নেওয়া যাবে। যদিও রাতুল কথাটা শুনেছে তার দুই বছরের বড় ভাইয়ের কাছে। তার নাম মিতুল। মিতুল জানে রাতুলের বই পড়া অভ্যাস। সে নিজেও পড়ে। তবে রাতুলকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। মিতুল চুপিচুপি তার মামাকে বলে- মামা জানো রাতুল বই পড়ে না, স্ক্যান করে। মামা বললো- সে আবার কী জিনিস? মিতুল বলে- আমার যে বই পড়তে দুই তিনদিন লেগে যায়, রাতুল সে বই মাত্র দেড় কি দুই ঘন্টায় পড়ে নেয়। অবশ্য মিতুল রাতুলের বই পড়া নিয়ে সন্দেহ থেকেই এমনটা বললেও মামা একটু কৌশলী হন। কারণ রাতুল কথাটা জানতে পারলে মনে কষ্ট পাবে।
বিকেলে মামা জাফর ইকবালের একটা কিশোর উপন্যাস। দন্তস্য রওশনের একটা কিশোর গল্পে এ বই এবং স্বল্প পরিচিত একজন লেখকের একটা কিশোর থ্রিলার বই নিয়ে হাজির। বিষয়টা শুধু মিতুলই আঁচ করতে পারে। তবে কিছু বলে না রাতুলকে। রাতুল তার ঘরে ঢুকে পড়ার টেবিলে দেখতে পায় একটা প্যাকেট। কিছুটা কৌতুহল নিয়ে প্যাকটা খোলে। দেখতে পায় তিনজন লেখকের তিনটা বই। নাম দেখেই সে বোঝে একেকটা বই একেক ধরনের। পাঠ করে আনন্দ পাবে। এদিকে মিতুল দেখে রাতুল কী করে! এরই মধ্যে মামা ঘরে প্রবেশ করে। রাতুল মামার দিকে তাকাতেই মামা বলেন- তোর জন্য আনলাম। রাতুল তখন বলে- তা বুঝলাম! কিন্তু উপলক্ষ্য কী? মামা সহাস্যে বললেন- কেন আমি কি আনতে পারি না? রাতুল বলে- তা না, তুমিই তো সবচেয়ে বেশি বই উপহার দাও। মামা বলেন- তাহলে! এদিকে মিতুলও ঘরে ঢোকে। অনেকটা অভিনয় ভঙ্গিতে বলে- আরে মামা কখন এলে? মামা বলেন- এই তো একটু আগেই! পড়ার টেবিলে বই দেখে মিতুল বলে- আরে এগুলো কখন নিলি রে রাতুল? রাতুল বলে- এগুলো মামা-ই এনেছেন। মিতুল মুখে কিছুটা হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে- বাহ্ বেশতো! পড়া যাবে। তখনই রাতুল একটা বই এগিয়ে মিতুলকে দেয়, বলে- এটা তুমি পড়! মিতুল তখন বলে- কেন এটা কি পড়বি না? রাতুল বলে- এটা শেষ করেছি। এমনটা শুনেই মামা বলেন- আমি মাত্রই রেখে গেলাম! অমনি তুই পড়ে নিলি? কখন? কীভাবে? তখন মিতুল বলে- লেখাটা কেমন রে? এমন ভাব করছে, যেন কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইছে। আদতে মামাকে ইঙ্গিত করে বুঝিয়ে দিল, রাতুল এমনই। তখন মামা বলেন- এটার কাহিনী এই এই…
রাতুল মামাকে সংশোধন করে দিয়ে বলতে থাকে, না মামা, এটার গল্পটা এই এই বিষয় নিয়ে। তবে খুব চমৎকার! মামা রাতুলের কথা শুনতে শুনতে বইটা হাতে নিয়ে কেবলই পৃষ্ঠা ওলটাতে থাকে। হ্যাঁ সব মিলে যাচ্ছে, সব মিলে যাচ্ছে। মামা খুবই আশ্চর্য হয় রাতুলের এই বৈশিষ্ট্য দেখে। রাতুল শুধুই বই পাঠ করে না। খুব মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে। রয়েছে অদ্ভুত বিশ্লেষণী ক্ষমতা। মামা তাকে বিরক্ত না করে চলে আসে। মিতুলকে দেয়া বইটা মিতুলও পড়া শুরু করে। তবে তার পড়ার ধরনও ভিন্ন। পড়তে পড়তে অমনোযোগী হয়ে একই পৃষ্ঠা আবার পড়ে। এতে তার গতি শ্লথ হয়। তবে তার পড়ার অভ্যাস খুব না হলেও নেহায়েতই কম নয়। তবে রাতুল রাতেই বাকি দুইটা বইও পড়ে শেষ করে। আর অপেক্ষায় থাকে বইগুলো অন্য কারও সাথে অদলবদল করার। সে এমনটা প্রায়শঃই করে। এইজন্য রাতুলের কাছে বইয়ের খুব একটা সংগ্রহ নেই। তবে সবগুলো বইয়ের বিস্তারিত মনে রাখার অদ্ভুত ক্ষমতার কারণে বন্ধুরা কেউ কেউ তাকে লাইব্রেরি বলে। আর কেউ কেউ বলে উইকিপিডিয়া। কেউ কেউ বলে সার্চ ইঞ্জিন। ক্লাসের শিক্ষকরা তাকে রাতুলপিডিয়া ডাকা শুরু করলে, দুষ্টু বন্ধুরা ডাকা শুরু করে আরপি! আর এটা নাকি জেন-জি ভাষা!
একবার ক্লাসে শিক্ষক একটা বিষয় বুঝিয়ে দিতে গলদঘর্ম। তখনই আরপি’র ডাক পড়ে। আরপি এতো সহজ করে বুঝিয়ে দিল যে, ক্লাসের সবচেয়ে ধীর বা বোকা কিসিমের ছাত্রটিও বুঝে যায়। এর পর থেকে কখনো কোন শিক্ষক না এলে আরপিই ক্লাস বন্ধুদের ভরসা।
একবার ক্লাস নিচ্ছিলো আরপি। তখন হঠাৎই শিক্ষা পরিদর্শক ভিজিটে এসে এই অবস্থা দেখতে পান। ক্লাস করাচ্ছে আরপি। তখন কাউকে কিছু না বলে তিনি প্রধান শিক্ষকের কামরায় ঢুকে শিক্ষকের হাজিরা খাতা তলব করেন। যথারীতি দেখতে পান সংশ্লিষ্ট শিক্ষক অনুপস্থিত! কারণ জিজ্ঞাসা করে পরিদর্শক বলেন- ক্লাস ফাইভের সেই ক্ষুদে শিক্ষককে নিয়ে আসা হোক। পিয়ন দৌড়ে আরপিকে নিয়ে হাজির হয়। তিনি প্রধান শিক্ষককে বলেন- এসব কী হচ্ছে? প্রধান শিক্ষক বলেন- স্যার আমাদের এই ছাত্র নিতান্তই সাদাসিধে ছাত্র নয়।
তার আছে ঐশ্বরিক ক্ষমতা। পরিদর্শক বলেন- তা তো দেখলামই! না হলে কি সহপাঠীদের ক্লাস নিতে বলা হয়! প্রধান শিক্ষক বলেন- স্যার ওর নাম রাতুল। একবার পড়লে আর পড়তে হয় না। যখন যা পড়ে সবই মনে রাখতে পারে। পরিদর্শক বলেন- তাই কি? কিছুটা আশ্চর্যের ভঙ্গিতে। প্রধান শিক্ষক বললেন- স্যার এমন ছাত্র বিরল প্রতিভা। আমি কখনো দেখিনি! তার আছে অদ্ভুত বিশ্লেষণী ক্ষমতা। তখন পরিদর্শক রাতুলের কাছে কয়েকটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন। তবে সেখানে কোন তীর্যকতা ছিল না। রাতুল একে একে সকল প্রশ্নের উত্তর দিলে পরিদর্শক নিজেও বিস্মিত হন। পকেটে থাকা একটা কলম উপহার দেন রাতুলকে। রাতুলের এই সহজাত ক্ষমতার কথা ছড়িয়ে পড়ে মিডিয়ার মাধ্যমে। রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যায় রাতুল। এই ভাইরাল হওয়া ইতিবাচক।
এখন আর কেউ তাকে শুধু রাতুল নামে চেনে না। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় সে এক বিস্ময়। তবে সে আগের মতোই সাধারণ। সে জানে, তার মাথার ভেতর যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার, তা কেবল নিজের জন্য নয়- সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। আর তাই বন্ধুরা এখন মজা করে বলে- ‘কোনো কিছু জানতে সার্চ ইঞ্জিনে যাওয়ার দরকার নেই, জাস্ট আরপি-কে জিজ্ঞেস করো!” রাতুলই হয়ে যায় রাতুলপিডিয়া বা আরপি! এটা কেবলই বন্ধুদের জগতে।