রাউজানে শিশু মৃত্যু কি কেবলই দুর্ঘটনা?

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় গভীর নলকূপের পরিত্যক্ত গর্তের ৩০ ফুট নিচে পড়ে মিসবাহ নামে চার বছর বয়সি এক শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নলকূপের গর্তে পড়ে একটি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি সংবাদ নয়, বরং আমাদের সমষ্টিগত অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার এক নিদারুণ দলিল। যে বয়সে শিশুটির আঙিনায় খেলে বেড়ানোর কথা ছিল, সেই বয়সে তাকে বরণ করতে হলো অন্ধকার গর্তের অকাল মৃত্যু। এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—কর্তৃপক্ষ এবং পরিবার, উভয় পক্ষের সামান্যতম অসতর্কতা কীভাবে একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিতে পারে। এর আগে গত বছরের ১০ ডিসেম্বর রাজশাহীর তানোরে পরিত্যক্ত নলকূপের গভীর গর্তে পড়ে যায় দুই বছরের শিশু সাজিদ। মৃত অবস্থায় ৩০ ফুট গভীর গর্ত থেকে প্রায় ৩২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করা সম্ভব হয় তাকে।

একটি গভীর নলকূপ খননের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া নয়, বরং আইনি ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা। রাউজানের এই ঘটনায় দেখা গেছে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় অরক্ষিত অবস্থায় গর্ত ফেলে রাখা হয়েছিল। সাধারণত ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গর্তটি ঘিরে রাখা বা উপযুক্ত ঢাকনা ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করে না। জননিরাপত্তার তোয়াক্কা না করে এমন ‘মৃত্যুকূপ’ তৈরি করে রাখা স্পষ্টতই অপরাধমূলক অবহেলা। স্থানীয় প্রশাসনের তদারকি ও তদারকি ব্যবস্থার অভাব এখানে স্পষ্ট। যদি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থাকত, তবে জনবহুল স্থানে এভাবে উন্মুক্ত গর্ত রাখা সম্ভব হতো না।

অন্যদিকে, পরিবারের দায়কেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে বা মফস্বল এলাকায় যখন বড় কোনো নির্মাণকাজ চলে, তখন শিশুদের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা জরুরি। শিশুরা স্বভাবজাতভাবেই কৌতূহলী এবং বিপদের গভীরতা বুঝতে অক্ষম। বাড়ির পাশে এমন মরণফাঁদ থাকা সত্ত্বেও শিশুকে একা ছেড়ে দেওয়া এক প্রকার ঝুঁকিকে আমন্ত্রণ জানানো। প্রযুক্তির এই যুগে বা কর্মব্যস্ততার অজুহাতে আমাদের পারিবারিক নজরদারি কি শিথিল হয়ে পড়ছে? এই প্রশ্নটি আজ প্রতিটি মা-বাবার নিজেকে করা উচিত।
কেবল শোক প্রকাশ বা তদন্ত কমিটি গঠন করে ফাইল চাপা দিলে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ হবে না। যারা নিরাপত্তা বেষ্টনী ছাড়াই গর্ত উন্মুক্ত রাখে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভার পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকি করতে হবে যাতে কোনো এলাকায় এমন বিপজ্জনক গর্ত বা নির্মাণকাজ অরক্ষিত না থাকে। পরিবারের সদস্যদের বুঝতে হবে যে, চারপাশের পরিবেশ সব সময় শিশুর জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষ করে নির্মাণাধীন এলাকায় শিশুদের প্রবেশাধিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে।
রাউজানের এই শিশুটি কোনো নিয়তি বা ভাগ্যের ফেরে মারা যায়নি; সে আমাদের অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার শিকার। আমরা কি আর কোনো প্রাণ হারানো পর্যন্ত অপেক্ষা করব, নাকি এখনই দায়িত্বশীল হব?