চলচ্চিত্র
আশীষ নন্দী »
জাহিদুর রহিম অঞ্জন পরিচালিত ‘মেঘমল্লার’ চলচ্চিত্রের শুরুতে দেখা যায় কালো মেঘ পূঞ্জিভুত হচ্ছে আকাশে। সন্ধ্যায় শহরের নদীর ঘাটে চার পাঁচ জনের একটি সশস্ত্র গেরিলা দল নামে। দলের কেউ এসেছে পরিবারের সাথে দেখা করতে কেউ বাজার করতে। টিম লিডার সকলকে বলে দিল একঘন্টা পরে এখান থেকে বেইজ ক্যাম্পে ফিরে যাবে।
একজন গেরিলা ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রেল লাইন ধরে হাঁটে। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাটি তার বুবুর বাসায় প্রবেশ করে। বুবুর স্বামী কেমিস্ট্রির লেকচারার নুরুল হুদা কলেজ কোয়ার্টারে থাকে। সে খুব আতঙ্কগ্রস্ত তার মুক্তিযোদ্ধা শ্যালককে নিয়ে। তার কলেজের সহকর্মী ও প্রতিবেশী সাদিক সাহেব জানে তার শ্যালক মিন্টু যুদ্ধে গেছে। কিন্তু সে চায় না বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাক। সে সারাক্ষণ এতটা উৎকন্ঠিত যে রেডিওতে খবর পর্যন্ত শুনতে চায় না। তাই সে রেডিও’র জন্য ব্যাটারি কিনে না বলে তার সহকর্মীকে। মুদির দোকানদারকে ব্যাখ্যা দেয় সে ব্যাটারি কিনছে টর্চের জন্য। তার মনে হয় অন্য ক্রেতাটি পাকিস্তান আর্মির চর। তাকে অনুসরণ করছে। নিজের বাসায় রেডিও আছে তা প্রতিবেশী সহকর্মীর কাছে প্রকাশ করার জন্য রাতে স্ত্রীকে ভর্ৎসনা করে।
নুরুল হুদার স্ত্রী আসমা তাকে ও তাদের ছোট্ট মেয়ে সুধাকে তার বাপের বাড়ি রেখে আসতে বলে। নুরুল হুদা স্ত্রীকে আশ্বস্ত করে সে আর কয়টা দিন অপেক্ষা করবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেবে কী করবে।
পরদিন সকালে তুমুল বৃষ্টিতে নুরুল হুদাকে কলেজের প্রিন্সিপাল ডেকে পাঠায়। তাকে ডাকতে আসা পিয়ন জানায় কলেজ ক্যাম্পাসের ট্রান্সফরমার ধ্বংস করে দিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। সেই সাথে প্রিন্সিপালের বাসায় বোমা মেরেছে তারা। আরও জানতে পারে সেখান পাকিস্তানী মিলিটারি কমান্ডার উপস্থিত আছেন। এখান থেকে গল্পের পরিণতি শুরু হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জনপদের মানুষ নানা রকম উদ্বেগ উৎকন্ঠায় দিন কাটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করে অনেকে শহীদ হয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ না করা অনেক মানুষ আছেন যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন। তারা অনেকে শহীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি বা হয়েছে। আমরা তাদের সবার কথা জানতে পারিনি। একটি সাধারণ পরিবারের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠায় বর্ষা দিনের গল্প আছে “মেঘমল্লার” চলচ্চিত্রে। বর্ষায় বাংলার যে সবুজ সৌন্দর্য তা সুন্দর ভাবে ফুটে উঠেছে এই চলচ্চিত্রে। প্রকৃতি, সুর, শব্দ ও সংলাপের মাধ্যমে যে চলচ্চিত্রের গল্প প্রকাশ করা যায় তাই দেখিয়েছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র মানে প্রচুর গোলাগুলি। অতি বাড়াবাড়ি, অতি নাটকীয়তা ছাড়াও শুধু ইঙ্গিতে ও সংগীতে এবং সংলাপে চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব তার উদাহরণ হয়ে আছে “মেঘমল্লার” চলচ্চিত্র। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের “রেইন কোর্ট” গল্পের ছায়া অবলম্বনে চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি উপভোগ করতে মনোযোগী দর্শক প্রয়োজন।
১৯৭১ সালে ব্যবহৃত গাড়ি বা কোনো বাড়ি বিশ্বাসযোগ্য ভাবে উপস্থাপন করা খুব দুরূহ ব্যাপার। ছোট একটি শহরের বাড়ি ঘর, গাড়ি, শহরের রাস্তা আজকের দিনে ১৯৭১ সালকে উপস্থাপন করা বেশ কষ্টসাধ্য। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে কাঠের তৈরি বাসের বডি ছিলো। সেই বাস উঠে গেছে অনেক কাল আগে। তারপরেও সেই সময়কার একটি কাঠ বডি বাস ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সেটি কয়েকবার দেখানোটা ঠিক হয়নি। একটি টুস্ট্রোক অটোরিকসা দেখানো হয়েছে সেই সময়কার বাস্তবতা ধরতে। সেটিও যথাযথ হয়নি। মিলিটারীর একটি জীপ দেখানো গেছে যা সেই সময়ে সামরিক বাহিনী ব্যবহার করতো। অন্যটি আধুনিক সময়ের, এগুলোকে খুব বড় করে দেখার কিছু নেই। ছবির গল্প আমাদের সাথে সেতু বন্ধন তৈরি করতে পেরেছে এইটি চলচ্চিত্রকার জাহিদুর রহিম অঞ্জনের বড় সাফল্য। তিনি তার কাজের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতার পুরস্কার। তিনি ২০১৪ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন এই দুই শাখায়। এছাড়া শ্রেষ্ঠ শব্দশিল্পী হিসেবে পুরস্কার জিতেছেন রতন পাল। বিশেষ শিশু শিল্পী হিসেবে পুরস্কার পেয়েছেন মারজান হোসেন জারা। শহীদুজ্জামান সেলিম, অপর্ণা ঘোষ, জয়ন্ত চট্যোপাধ্যায়, আমিনুল ইসলাম মুকুল, মারজান হোসাইন জারা প্রমুখ এই চলচ্চিত্রের অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রটি সরকারী অনুদানে নির্মিত। সাথে সহযোগী প্রযোজক হিসেবে আছে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন।
জহিদুর রহিম অঞ্জন একজন মেধাবী চলচ্চিত্র পরিচালক। তিনি চলচ্চিত্র বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেছেন ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে। চলচ্চিত্র বিষয়ে তিনি শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন। বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর “চাঁদের আমবস্যা” অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন জাহিদুর রহিম অঞ্জন। সেই ছবিটি এখন মুক্তির অপেক্ষায় আছে। জন্ম ২৭ নভেম্বর ১৯৬০ সালে খুলনায় মৃত্যু ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ সালে।






















































