মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলি : নিরাপত্তাহীন এলাকাবাসী

মিয়ানমারে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নে দুই বাংলাদেশী কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হোয়াইক্যং ইউনিয়নের কানজর পাড়া এলাকার নাফ নদী সংলগ্ন সীমান্তে এ ঘটনা ঘটে। আহত কিশোররা হলেন, হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কানজর পাড়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ তোফায়েলের ছেলে মোহাম্মদ সোহেল (১৩) এবং একই এলাকার মো. ইউনুছের ছেলে ওবায়দ উল্লাহ (১৫)।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের আঁচ বাংলাদেশের সীমান্তে এসে লাগা এখন আর নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সম্প্রতি টেকনাফের উলুচামারি সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে দুই কিশোরের আহত হওয়ার ঘটনা আমাদের নিরাপত্তার চরম উদ্বেগকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সীমান্ত জনপদের মানুষ যখন নিজের উঠানে বা ধানক্ষেতে দাঁড়িয়েও গুলির শিকার হয়, তখন বুঝতে হবে পরিস্থিতি কেবল ‘উদ্বেগজনক’ নয়, বরং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা ও জনজীবনের ঝুঁকি
বিগত কয়েক মাস ধরে নাফ নদীর ওপারে জান্তা বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যে তুমুল যুদ্ধ চলছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের সার্বভৌম ভূখণ্ডে। এর আগে মর্টার শেলের গোলাবর্ষণ এবং আকাশসীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এখন সরাসরি গুলিবর্ষণে কিশোররা আহত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করে যে, ওপার থেকে নিক্ষিপ্ত অস্ত্রের গতিপথ নিয়ে মিয়ানমার কোনো দায়বদ্ধতা দেখাচ্ছে না। টেকনাফ ও উখিয়ার সীমান্তজুড়ে মানুষের মনে এখন স্থায়ী আতঙ্ক বিরাজ করছে। চাষাবাদ, মাছ ধরা কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন সেখানে স্থবির হয়ে পড়েছে।

সীমান্তে এই নৈরাজ্য চলতে দেওয়া যায় না। এ বিষয়ে কেবল ‘পতাকা বৈঠক’ বা মৌখিক প্রতিবাদে কাজ হচ্ছে না। মিয়ানমার সরকারকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে একজন নাগরিকের ওপর আঘাত আসাও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক ফোরামে এই বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করতে হবে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-কে কেবল প্রহরায় সীমাবদ্ধ না থেকে অত্যাধুনিক নজরদারি ও পাল্টা সুরক্ষামূলক ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সীমান্তের সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে টহল ও জনবল বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। সীমান্ত সংলগ্ন যেসব এলাকা সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকির মুখে রয়েছে, সেসব এলাকার বাসিন্দাদের সাময়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে কৃষিজীবী ও স্কুলগামী শিশুদের চলাচলে নির্দিষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট তাদের নিজস্ব বিষয় হতে পারে, কিন্তু সেই সংকটের বিষবাষ্পে যখন বাংলাদেশি কিশোরদের রক্ত ঝরে, তখন তা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আমরা শান্তিকামী জাতি, কিন্তু এই শান্তিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।