মামুনুল মাহফিলে যোগ দেননি

0
296

দিনভর নানা গুঞ্জন, উত্তেজনা
ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা মাঠে
আমরা সরকারের বিরুদ্ধে নই: বাবুনগরী

সুপ্রভাত রিপোর্ট :
হাটহাজারীতে আল আমিন সংস্থার ধর্মীয় সমাবেশে যোগ দেননি হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। তাকে চট্টগ্রামে প্রতিহতের ঘোষণার মধ্যেই তিনি হাটহাজারীতে পৌঁছেছেন এবং মাহফিলে যোগ দেবেন এমন গুঞ্জন দিনভরই প্রচার হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা সংবাদ মাধ্যমে। তবে তিনি চট্টগ্রামে এসেছেন কি-না তা নিশ্চিত করা না গেলেও তিনি মাহফিলে বক্তৃতা করতে না যাওয়ায় কার্যত উত্তেজনা প্রশমিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

আল্লামা বাবুনগরী যা বললেন
আমাদের হাটহাজারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেছেন, ‘আমরা সরকারের দুষমন নই। হেফাজতে ইসলামের কোন ভূমিকা সরকারের বিরুদ্ধে নয়। আমরা সরকার বা দেশবিরোধী নই। ইসলাম, মুসলমান, দেশ ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী আমরা।’
হেফাজতে ইসলামের পতাকাতলে ঐক্যবদ্ধ থাকতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দারুল উলুম হাটহাজারীর শায়খুল হাদীস, শিক্ষা পরিচালক ও হেফাজত ইসলামের আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।
শুক্রবার দুপুর থেকে হাটহাজারী পার্বতী মডেল উচ্চ বিদ্যালয় ময়দানে আল আমিন সংস্থার ব্যবস্থাপনায় তাফসীরুল কুরআন মাহফিল সমাপনী দিনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। আল আমিন সংস্থার নেতৃবৃন্দ মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা হাফেজ রিজওয়ান আরমানের ধারাবাহিক সঞ্চালনায় শুক্রবার বাদ জুমা মাওলানা মুফতী জসীম উদ্দীনের উদ্বোধনী আলোচনার মাধ্যমে সমাপনী দিনের কার্যক্রম শুরু হয়।
আল্লামা বাবুনগরী বলেন, ‘আমরা সরকারের দুষমন নই, আপনার আশপাশে ঘাপটি মেরে থাকা রাম-বাম আর নাস্তিক মুরতাদরাই আপনার প্রকৃত দুষমন। তারা আপনাকে ইসলামের বিপক্ষে দাড় করিয়ে তৌহিদি জনতা ও আপনার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে চায়। ওদেরকে চিহ্নিত করুন।’
তিনি আরো বলেন, বর্তমান পুরো বিশ্বে আস্তিক আর নাস্তিকের লড়াই চলছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে কোন লড়াই নেই, শুক্রবারের জুমার নামাজে তারাও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করে। আওয়ামী লীগ বিএনপি পরস্পরের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন হয়, মুসলমান হিসেবে সকলেই ভাইভাই। কিন্তু আস্তিক আর নাস্তিক কখনো এক হতে পারে না। বিশ্বজুড়ে চলা আস্তিক আর নাস্তিকের এ লড়াইয়ে নাস্তিকদেরকে দাঁতভাঙা জবাব দিতে হবে।
আল্লামা বাবুনগরী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন মদীনার সনদে দেশ চলবে। প্রধানমন্ত্রীর এ কথার সাথে সহমত পোষণ করছি। আমরাও চাই মদীনার সনদে দেশ চলুক।
মদীনার সনদে দেশ চললে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে, সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি গড়ে ওঠবে। এ সনদের আলোকেই পৃথিবীতে আদর্শ ইসলামী সমাজ ও আন্তর্জাতিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।’
ফ্রান্স বিষয়ে তিনি বলেন, রাসূলের দুশমন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বমুসলিমের কাছে ক্ষমা না চাইবে তাদের পণ্য আমরা বর্জন করবো। তাদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকের অশ্রাব্য ভাষায় গালমন্দ, কুশপুত্তলিকা দাহ করা, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. কে রাজাকার ডাকার কড়া সমালোচনা করে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, দেশের একজন শীর্ষ স্থানীয় আলেম মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে এসব অবমাননা সহ্য করা হবে না। অনতিবিলম্বে এসব ঘৃণ্য কর্মকা- বন্ধ করতে হবে।
মাওলানা মামুনুল হককে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাহফিলে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে আজ বায়তুল মুকাররম চত্বরে বিক্ষোভ মিছিলে লাঠিচার্জের তীব্র জানিয়ে বাবুনগরী বলেন, তৌহিদি জনতার ওপর এমন লাঠিচার্জ দুঃখজনক। বিক্ষোভ মিছিল থেকে গ্রেফতারকৃতদের আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি না দিলে পরামর্শ সাপেক্ষে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ।
শাইখুল হাদীস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমীরে হেফাজত নির্বাচিত করায় এবং করোনা মহামারিতে আর্তমানবতার সেবায় অসামান্য অবদান রাখায় আল মানাহিল ওয়ালফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মাওলানা হেলাল উদ্দীন নানুপুরীকে আল আমিন সংস্থার পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মাননা ক্রেস্ট দেয়া হয়।
যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মাঠে
এদিকে বার্তা সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এক খবরে জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিহত করার ঘোষণার পর থেকে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের অবস্থান জানাতে পারেনি হাটহাজারীতে তার ধর্মীয় সমাবেশের আয়োজক আল আমিন সংস্থা।
মামুনুল হককে প্রতিহত করতে সকাল থেকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নিয়েছেন নগর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। সেখানে বিক্ষোভ করছেন যুবলীগের কয়েকশ নেতাকর্মী। দুপুরে নগর ছাত্রলীগের কর্মীদের নগরীর অক্সিজেন মোড়ে অবস্থান নেয়। তারা সেখানে ঝাড়– মিছিল করেম বলে জানা গেছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগও হাটহাজারী সড়কে অবস্থান নেয় বলে খবর পাওয়া গেছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনে বিরোধীতাকারী মামুনুল হককে চট্টগ্রামে প্রতিহতের ঘোষণা দেওয়া হয় গত বৃহস্পতিবার বিকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে ‘জঙ্গিবাদ বিরোধী ছাত্র ও যুব ঐক্য পরিষদ’ নামের সংগঠনের সমাবেশ থেকে। এরপর রাত থেকেই মামুনুল হকের উপস্থিতি নিয়ে নানা তথ্য ছড়াতে থাকে।
মামুনুল হক কোথায় জানতে চাইলে মাহফিল আয়োজনকারী আল আমিন সংস্থার সম্পাদক মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে উনার হাটহাজারী আসার কথা ছিল।
‘গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে উনার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। উনার মোবাইল বন্ধ।’
মামুনুল হক চট্টগ্রামে আসবেন কিনা বা এসে পৌঁছেছেন কিনা এমন প্রশ্নে আহসান উল্লাহ বলেন, ‘যেহেতু যোগাযোগ হচ্ছে না তাই বলতে পারছি না তিনি কোথায়।’
মামুনুল হকের ফোন বন্ধ বলে আহাসন উল্লাহ দাবি করলেও সকাল পৌনে ১১টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কয়েকবার কল করে সেটি খোলা পাওয়া গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুল ফোন ধরেননি। খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুর রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করে সাড়া মেলেনি।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিনের কাছে জানতে চাইলে তিনিও মামুনুল হকের অবস্থান জানাতে পারেননি।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আনোয়ার হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হাটহাজারীতে পরিস্থিতি শান্ত আছে। সেখানে আমাদের লোকজন আছে। আয়োজকদের সাথেও কথা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবরকম প্রস্তুতি আছে। দ্ইুদিন যাবত মাহফিল হচ্ছে। আশা করি পরিস্থিতি ভালো থাকবে।’
মামুনুল হক কোথায় বা তার আসার বিষয়ে কোনো তথ্য আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আয়োজকদের জানার কথা। এ বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য নেই।’
এদিকে মামুনুল হকের আগমন ঠেকাতে সকাল থেকে নগর যুবলীগ আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চুর নেতৃত্বে বিমানবন্দর সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন নেতাকর্মীরা।
নেতাকর্মীরা সেখানে ‘রাজাকার যেখানে প্রতিরোধ সেখানে, মামুনুল হক যেখানে প্রতিরোধ সেখানে’, ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘বীর চট্টলার মাটিতে মামুনুল হকের ঠাঁই নাই’, ‘তুমি কে আমি কে বাঙালি বাঙালি’, ‘আমাদের ধমনীতে শহীদের রক্ত’, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগান দিচ্ছেন।
মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, ‘চট্টগ্রামে যেখানেই মামুনুল হককে পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে। জাতির জনককে নিয়ে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছে মামুনুল হক তারপর কোনোভাবে তাকে চট্টগ্রামে আসতে দেওয়া হবে না।’
সড়কপথে মামুনুল হক হাটহাজারী যেতে পারেন এমন ধারণায় নগরীর অক্সিজেন মোড়ে অবস্থান নেয় নগর ছাত্রলীগের কর্মীরা।
নগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর বলেন, ‘বিমানবন্দরে পতেঙ্গা থানা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আছেন। আমরা মহানগরের নেতাকর্মীরা অক্সিজেন মোড়ে অবস্থান নিব।’
গতকাল শুক্রবার দুপুর দুইটায় হাটহাজারী পার্বতী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তিনদিনের তাফসীরুল কুরআন মাহফিলের সমাপনী দিনে তিনজন প্রধান বক্তার একজন মামুনুল হক।
আল আমিন সংস্থার ব্যানারে মূলত হেফাজতে ইসলাম সংশ্লিষ্টদের ওই আয়োজনে মামুনুল হককে সংবর্ধনা দেওয়া হবে বলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার আছে।
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হাটহাজারী বড় মাদ্রাসায় সাম্প্রতিক ঘটনাবলী, প্রয়াত আমীর শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ, নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়া, শফীর জানাজায় জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি এবং আমীর পদে জুনাইদ বাবুনগরীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় মামুনুল হকের নেপথ্যের ভূমিকার কথা বারবার আলোচনায় এসেছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সভাপতি মামুনুল হক সদ্য ঘোষিত হেফাজতে ইসলামের কমিটিতে যুগ্ম মহাসচিবের পদ পেয়েছেন।
নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে রাজধানীর ধোলাইরপাড়ে জাতির পিতার ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা করে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি করে মামুনুল হক।
এরপর ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপমন্ত্রী ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের সাংসদ মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতাকারীরা ক্ষমা না চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।