ভোট

সাইয়্যিদ মঞ্জু »

শহরের ধুলোমাখা এক পুরোনো লাইব্রেরির কোণে বসে বৃদ্ধ অবিনাশ বাবু চশমাটা নাক থেকে নামালেন। সামনে পড়ে আছে পুরোনো খবরের কাগজের হলুদ হয়ে যাওয়া কাটিং। একটি ১৯২৬ সালের, অন্যটি ১৯৯১-এর। পাশে রাখা চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, যেন ইতিহাসের কোনো এক দীর্ঘশ্বাস। ​অবিনাশ বাবুর ভাবনায় ভেসে উঠল চব্বিশ বছরের এক টগবগে যুবক। যার কলম থেকে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। ব্রিটিশবিরোধী উত্তাল সময়ে সেই ‘বিদ্রোহী’ কবি নামলেন ভোটের ময়দানে। পূর্ববঙ্গ থেকে কেন্দ্রীয় আইনসভার লড়াই। জনসভায় মানুষের ঢল নামে, কবির গলায় মালা পরে, তার গান শুনে উদ্বেলিত হয় জনতা। কিন্তু ভোটের দিন দেখা গেল এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। রক্ষণশীল সমাজের অন্দরে তখন ‘বিদ্রোহী’ ইমেজের চেয়ে জাঁদরেল রাজনীতিকের ওজন বেশি। ভোটের গণনায় দেখা গেল হাজার খানেক ভোট পেলেও কবির জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। কবি সেদিন হেসেছিলেন কি না জানা নেই, তবে বাংলার ধুলিকণা বোধহয় সেদিন একটু লজ্জিত হয়েছিল।
​সময় বহমান। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল কয়েক দশক পর। এবার নেত্রকোনার মেঠো পথে এক অন্য কবি। তার মাথায় বাবরি চুল, কাঁধে ঝোলা ব্যাগ। তিনি মানুষের অধিকারের কথা বলেন কবিতায়, মিছিলে। ১৯৯১ সালের সেই নির্বাচনে জনতা তাকে দেখতে এল, তার আবৃত্তি শুনে করতালি দিল। কিন্তু যখনই আঙুলে কালির দাগ লাগানোর সময় এল, জনতা হয়ে গেল ভীষণ হিসেবী। সেই একই দৃশ্য-হাজারের গণ্ডি পার হতেই কবির দম ফুরিয়ে গেল।
​অবিনাশ বাবু ভাবলেন, কবিরা তো আসলে মায়ার কারিগর। তারা চাঁদ ধরিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখান, কিন্তু সংসদ তো চায় রাস্তার ড্রেন আর সারের হিসেব। মানুষ কবিকে পূজা করে মন্দিরে রেখে, কিন্তু ঘর চালানোর চাবিটা দিতে চায় কোনো এক ঝানু মালিকে। নজরুল আর নির্মলেন্দু গুণ- দুজনেই চেয়েছিলেন কলমের কালিকে ব্যালটের কালিতে রূপান্তর করতে। কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিলেন, কবিতা পড়ার সময় মানুষ যে চোখে তাকায়, ভোট দেওয়ার সময় সেই চোখে থাকে বাস্তবের রুক্ষ চশমা। ​চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে অবিনাশ বাবু আপনমনেই বিড়বিড় করলেন, জনগণ কবিদের মাথায় তুলে নাচে ঠিকই, কিন্তু সিংহাসনের কাঁটাগাছে তাদের বসাতে চায় না। কলম আর ব্যালটের দূরত্বটা আসলে একশ বছরেরও বেশি।
​বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বইছে। হয়তো কোনো এক অনাগত কবির হারের খসড়া তৈরি হচ্ছে প্রকৃতির ল্যাবরেটরিতে।