ভাষাসংগ্রামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

0
100

শ্যামল কান্তি দত্ত :

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) বাঙালিকে কেবল ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র উপহার দেননি, তিনি আন্তর্জাতিক শান্তি সম্মেলনে (১৯৫২) ও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (১৯৭৪) বাংলায় ভাষণ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিয়ে গেছেন। পাকিস্তান গণপরিষদে, শহিদ মিনারে, বাংলা একাডেমিতে, গণভবনে এবং বাংলাদেশ সংসদে দেওয়া ভাষণগুলোতে এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশাবলি তাঁর ভাষাপ্রেমের পেরণা। অথচ তাঁর ভাষাভাবনার স্বরূপ আজও অনেকটা অনুদ্ঘাটিত। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রণীত সংবিধানে এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশনায় সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের প্রয়াসে প্রমূর্ত হয় তাঁর ভাষাদর্শন তথা জীবনদর্শন। তাঁর ভাষাসংগ্রামের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেণে উন্মোচিত হবে বঙ্গবন্ধুর ভাষা-আদর্শ এবং তাঁর দেশপ্রেমের  চেতনা। যে-চেতনা বিতাড়িত করবে বাংলা ভাষার প্রতি বঞ্চনা, দূরীভূত হবে বাংলা ভাষা সম্পর্কে এ সময়ের বাঙালির সকল প্রকার হীনম্মন্যতা, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের সংগ্রা বেগবান হবে; সর্বোপরি, যথার্থ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসের দিকে অবলোকন করলে অস্বীকার করা অসম্ভব ভাষা-আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় আবির্ভূত বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অবলম্বন করেই অর্জিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ। অবশ্য আধুনিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রথম উন্মেষ বঙ্গবন্ধুর জন্মের আগে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় গান সৃষ্টির আমলে। আরও আগে থেকেই বাঙালি মানবতার গান গেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূলভিত্তি ছিল এই অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বঙ্গবন্ধু আবাল্য  জোরালো ভাষায় বক্তৃতা করতেন এবং তাঁর বক্তৃতা ছাপা হলে খুশি হতেন। বক্তৃতা আসলে বোধ ও বিশ্বাসের সম্মিলিত প্রকাশ; বাঙালি-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা-বিশ্বাস বিকশিত হয়েছিল বলেই বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলব- আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ তিনি তো শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন সারা বাংলাদেশের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।  বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রেরণায় সৃষ্ট বাংলাদেশের ভাষা-পরিস্থিতি অনুধাবনের জন্য তাই বঙ্গবন্ধুর ভাষসংগ্রামী রূপ সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক। আজন্ম মাতৃভাষাপ্রেমী এই মহান নেতা ১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্ব এবং পরবর্তী সময় আইনসভার সদস্য হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বাংলা ভাষার উন্নয়ন ও বিকাশে কাজ করেছেন এবং বাংলা ভাষা ও বাংলাভাষীদের দাবির কথা বলে গেছেন।  মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় তিনি যেমনটা বলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এই সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ সে তো ভাষারই সংগ্রাম; বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর মতো সে-সংগ্রামও অনেকটা অসমাপ্ত। চলমান  সংগ্রামকে লক্ষে পৌঁছানোর জন্যেই অবলোকন-বিশ্লেণ আবশ্যক ভাষাসংগ্রামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সংগ্রামী কর্মকা-ের।

কৈশোর থেকেই শেখ মুজিব একদিকে ছিলেন গুরুসদয় দত্ত প্রবর্তিত ব্রতচারী প্রশিক্ষণে দক্ষ সংস্কৃতিকর্মী, আরেক দিকে মুসলিম লীগ তথা পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। বাঙালি মুসলিম লীগারগণ ভারতভাগের পূর্বেই উর্দুর বিরোধিতা শুরু করেন, এবং ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগের লক্ষ্মৌ অধিবেশনে বাংলার সভ্যরা উর্দুকে ভারতের মুসলিমদের লিংগুয়া ফ্রাঙ্কা মনোনয়নের প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। আবার বিতর্কটি শুরু হয় যখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের জন্ম নিশ্চিত হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতার সিরাজউদ্দৌলা  হোটেলে পূর্ব পাকিস্তানের পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণে সমবেত হয়েছিলেন কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক কর্মী। সেখানে পাকিস্তানে একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠন করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়। সে প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি ভারত থেকে তৎকালীন পূর্ববাংলায় যখন প্রত্যাবর্তন করেন। তখন থেকেই ভাষা প্রতিষ্ঠার লক্ষে গণস্বাক্ষর অভিযান শুরু হয়, তখন থেকেই তিনি এর সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। ওই সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবগুলো পাঠ করেছিলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। প্রস্তাবগুলো ছিল : ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্তা গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া  দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।’  এভাবেই ভাষার দাবি বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল।

উনিশ শো সাতচল্লিশের ডিসেম্বরে সমকালীন রাজনীতিবিদসহ ১৪ জন ভাষাসংগ্রামী সবপ্রথম ভাষা-আন্দোলনসহ অন্যান্য দাবিসংবলিত ২১ দফা দাবি নিয়ে একটি ইশতেহার প্রণয়ন করেন। ওই ইশতেহারের দ্বিতীয় দাবিটি ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। ‘রাষ্ট্রভাষা-২১ দফা ইশতেহার : ঐতিহাসিক দলিল’ নামে প্রকাশিত ওই পুস্তিকাটি ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃত। এই ইশতেহার প্রণয়নে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ছিল অনস্বীকার্য এবং তিনি ছিলেন অন্যতম স্বাক্ষরদাতা। ৫ ডিসেম্বর ১৯৪৭-এ  খাজা নাজিমুদ্দিনের বাসভবনে মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলাকালে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে অনুষ্ঠিত মিছিলে মুজিব অংশগ্রহণ করেন এবং নেতৃত্বদান করেন। গোয়েন্দারা যেসব গোপন প্রতিবেদন  তৈরি করেছিলেন, তাতেও স্পষ্ট বলা হয়েছে, শেখ মুজিব ভাষা-আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন। ভাষা-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেই তিনি তাঁর সহনেতাদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ।

ছাত্র রাজনীতির শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধুর অসামান্য দূরদর্শিতা আর সাহসিকতা তাঁকে ভিন্ন এক অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিল। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ১০ দফা দাবির মধ্যে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার ও সামরিক বাহিনীতে বাঙালিদের নিয়োগ এবং বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার দাবি ছিল অন্যতম। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত-প্রস্তাবিত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবার দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে, তমুদ্দিন মজলিসের আহ্বানে ২৬ ফেব্রুয়ারির ধর্মঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলের ছাত্ররা ক্লাসবর্জন করে দলে দলে যোগদান করেন। এই সংগ্রামমুখর মিছিলের সমগ্র ব্যবস্থাপনায় ও পরিচালনায় শেখ মুজিব বলিষ্ঠ নেতৃত্বদান করেন। শেখ মুজিবসহ সব প্রগতিবাদী ছাত্রনেতাই বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন।  ১ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে প্রচারমাধ্যমে একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, ১১ মার্চের হরতাল সফল করতে । বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম (তমদ্দুন মজলিস সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য), নঈমুদ্দীন আহমদ (পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক) ও আবদুর রহমান  চৌধুরী (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনে পাকিস্তনি প্রতিতনিধিদলের  নেতা) জাতীয় রাজনীতি এবং রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের ইতিহাসে এ বিবৃতির গুরুত্ব অপরিসীম। পরদিন ২ মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে তমদ্দুন মজলিস ও মুসলিম ছাত্রলীগের যৌথসভায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, আবুল কাসেম, রণেশ দাশগুপ্ত, অজিত গুহ প্রমুখের নাম উল্লেখযাগ্য। সভায় গণপরিষদ-সিদ্ধান্ত ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে এই সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রাবাসগুলোর সংসদ প্রভৃতি ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠান দুজন করে প্রতিনিধি দান করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিব বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন। এর আগে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্যদের দিয়ে বাংলা ভাষার দাবিতে লিফলেট বিতরণ করিয়েছিলেন, ৪ মার্চ ১৯৪৮ একটা গোয়েন্দা তথ্যে তা উঠে আসে।  এতে প্রমাণিত হয় ভাষাসংগ্রামে তাঁর ভূমিকা ছিল যেমন বলিষ্ঠ, তেমনি সুদূরপ্রসারী।

১১ মার্চ ১৯৪৮, রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ইতিহাসে এক অনন্য-অবিস্মরণীয় দিন। এই দিনে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এদেশে প্রথম সফল হরতালে পিকেটিংসহ কর্মসূচির পুরো রূপরেখা তৈরি করেছিলেন শেখ মুজিব।

পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কলকাতাফেরত শেখ মুজিব  ১১ মার্চ ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব  দেয়ার কারণে রাজপথ থেকেই গ্রেফতার হন। ১৫ মার্চ ১৯৪৮-এ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ-এর সঙ্গে তৎকালীন পূর্ববাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে আট দফা চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বে জেলখানায় আটক ভাষা আন্দোলনের কর্মী রাজবন্দিদের চুক্তিপত্রটি দেখানো হয় এবং অনুমোদন নেয়া হয়; অনুমোদনের পর চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। কারাবন্দি অন্যদের সঙ্গে শেখ মুজিবও চুক্তির শর্ত দেখেন এবং অনুমোদন প্রদান করেন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে সর্বপ্রথম বাংলাভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। চুক্তির শর্ত মোতাবেক শেখ মুজিবসহ অন্য ভাষাসংগ্রামমীগণ কারামুক্ত হন। এই ঐতিহাসিক চুক্তির ফলে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার এদেশবাসীর কাছে নতিস্বীকারে বাধ্য হয়। ১৫ মার্চ আন্দোলনের কয়েকজন নেতাকে মুক্তিদানের ব্যাপারে সরকার গড়িমসি শুরু করে। এতেশেখ মুজিবুর রহমান ক্ষিপ্ত ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন এবং এর তীব্র প্রতিবাদ করেন। মুক্ত হয়েই তিনি ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সামনের সারিতে থেকে এ আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯ মার্চ যখন জিন্নাহ ঢাকার ঘোড়দৌড় মাঠে ঘোষণা করলেন. উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, তখন তরুণ শেখ মুজিবসহ অনেক ছাত্র চিৎকার করে জানিয়ে দিয়েছিল, ‘মানি না’। ভাষাসংগ্রাম শুরুর সময়ের সচেতন বাঙালির সাহসী প্রতিবাদের সে-ইতিহাসও তিনি লিখে রেখে গেছেন।

ভাষাসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ১৯৪৯-র অক্টোবরে শেখ মুজিবকে আটক করে পাকিস্তান সরকার। তবে ভাষা-আন্দোলন থেমে থাকেনি। আস্তে-আস্তে তা গণআন্দোলনে রূপ নিতে থাকে, শহর থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে। আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন ছাত্র ও তরুণেরা। তৎকালীন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছিল।  ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২-র বিকালে পল্টন ময়দানে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন জানান, ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। সেই সময় বঙ্গবন্ধু কারাবন্দি হিসেবে হাসপাতালে ছিলেন (ইতোমধ্যে ২৬ মাস কারাবরণ করে চলেছেন)। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে রাত একটার পরে তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ আরও অনেকে। সেই রাতেই বঙ্গবন্ধু সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের হুকুম দিয়েছিলেন এবং পরের রাতে তাদের আবার আসতে বললেন। সেখানেই ঠিক হয়েছিল একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। এভাবে, কারাগার  থেকেই ওই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন তিনি।  কারাগারে চিকিৎসাধীন শেখ মুজিব সুকৌশলে ভাষাসংগ্রামে দিকনির্দেশনা দানের নিদর্শন ভাষাসংগ্রামী গাজীউল হক  ও শেখ মুজিবের লেখায় রয়েছে। এমনকি বঙ্গবন্ধুবিরোধী বামপন্থী লেখক বদরুদ্দীন উমরও সে-সত্য অস্বীকার করেননি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ কারা হাসপাতালে থেকে ভাষাসংগ্রামীদের সাথে সংযোগ স্থাপন এবং ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ থেকে অনশন শুরুর ঘোষণাদেওয়াতে তাঁকে ফরিদপুর কারাগারে পাঠায় পাকিস্তান  সরকার। তবুও তিনি তাঁর সহনেতা মহিউদ্দীনের সঙ্গে অনশন করেন। বাস্তবে, পাকিস্তান আন্দোলনের তরুণকর্মীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ে গভীরভাবে। স্বপ্নভঙ্গের পর তাদের জাগিয়ে  তোলেন বাঙালি নেতারা। বিশেষ করে মওলানা ভাসানী তরুণ  নেতৃত্বকে উৎসাহ দিলেন; আর শেখ মুজিব সংগঠিত করলেন ছাত্রনেতাদের। ছাত্রনেতারা সংগঠিত করলেন সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের। এভাবেই আটচল্লিশ থেকে বায়ান্নপর্বে ভাষা আন্দোলন সংস্কৃতির চৌহদ্দি থেকে রাজনীতির অঙ্গনে চলে এল। স্বপ্নভঙ্গের পর নতুন করে জেগে ওঠা ছাত্র ও যুবসমাজকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়ায় শেখ মুজিব ও তাঁর সহনেতাদের অনুপ্রেরণামূলক নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। এমনকি ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে আমতলায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যখন হতবুদ্ধি, আওয়ামী লীগ ১৪৪ ধারাভঙ্গের বিরোধিতা করছে; এখন তারা কী করবে? এমন সময় ছাত্রলীগ সভাপতির হাতে এলো শেখ মুজিবের হাতেলেখা একটি চিরকুট। তাতে তাঁর নির্দেশ ছিল, ‘বাংলা ভাষার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। প্রয়োজনে ১৪৪ ধারাভঙ্গ করবে।’  পরের ঘটনা প্রায় সবারই জানা। একুশের আন্দোলনের সংবাদ শুনে  শেখ মুজিব কতোটা আশাবাদী হন, তিনি কতোটা দূরদর্শী নেতা তার প্রমাণ তাঁর লেখাতেও আছে।  সে-কারণে এরপর থেকে ভাষা-সংগ্রামে  নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবেই জেলমুক্ত শেখ মুজিবের ওপর বর্তায়।

অসুস্থ হয়ে পড়াতে গণদাবির মুখে ১৯৫২-র ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এর কয়েক দিন পর থেকেই তিনি ফের সারা পূর্ববাংলা ঘুরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো বক্তব্য দিতে থাকেন। শেখ মুজিব ২৭ এপ্রিল (১৯৫২) ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদের সম্মেলনে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বক্তব্য রাখেন । তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গণভোটের প্রস্তাব করলে তা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। সেদিনের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘দীর্ঘ আড়াই বছর কারাবাসের পর আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আপনারা যখন ভাষাসংগ্রামে লিপ্ত ছিলেন, আমি তখন কারাগারে অনশনরত।… মুসলিম লীগ সরকার আর ‘মর্নিংনিউজ’ গোষ্ঠী ছাড়া প্রত্যেকেই বাংলা ভাষা চায়।’ একই বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের সুপারিশের বিরোধিতা করে যুক্তি উপস্থাপন করেন। লক্ষণীয়,  শেখ মুজিব তাঁর নেতাকেও বাংলা ভাষা সম্পর্কে আঞ্চলিক ভাষা করার সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধিতা করতে ছাড়েননি। এ থেকে শেখ মুজিবের দৃঢ়চিত্ততা ও নেতৃত্বের স্বাক্ষর মেলে। বাংলা ভাষার প্রতি কী অসাধারণ দরদ থাকলে কেউ এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাই অনায়াসে বলা যায় বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি প্রেম তাঁর রাজনীতির মূলশক্তি।

মুসলিম লীগের কাগজগুলি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিবৃতি এমনভাবে বিকৃত করে ছাপায় যে, মনে হয় তিনিও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে। শেখ মুজিব সোহরাওয়ার্দীর এই মত স্পষ্ট করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তাঁর লিখিত সমর্থন আদায় করে আনেন পশ্চিম পাকিস্তান গিয়ে। একাজ শেখ মুজিবের পক্ষেই সম্ভব ছিল বলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অভিমত ব্যক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি গভীর দরদ আর অসীম রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ফলে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ওই বিবৃতিটি ১৯৫২র ২৯ জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত হয়। এ বিবৃতি ভাষাসংগ্রামীদের নতুন করে অনুপ্রাণিত করে। বাংলা ভাষা এবং ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর এই অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।  বঙ্গবন্ধু সুযোগ পেলেই চেয়েছেন তাঁর নিরীহ বাঙালিদের মনের গোপন ইচ্ছাটুকু অর্থাৎ বাংলা ভাষার ব্যবহারকে সামনে নিয়ে আসতে, আর  সেটি তিনি নানা উপায়ে প্রয়োগ করেছেন। তারও আগে তিনি মে মাসের শেষের দিকে করাচি ও লাহোরে যান, সেখানে তিনি প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকগণের প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেন ইংরেজিতে। তবে প্রমেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়ে বিস্তারিত কথা যুক্তিসহ তুলে ধরেন।   সে-বছর অক্টোবরে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ‘পিস কনফারেন্স অব দি এশিয়ান এন্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স’-এ পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে নয়াচীন সফর করেন। সেখানে অনেকে ইংরেজিতে বক্তৃতা করলেও তিনি এবং ভারতের মনোজ বসু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন। গৌরবময় সে-ঘটনাও তিনি লিখে গেছেন এভাবে, ‘বাংলা আমার মাতৃভাষা। দুনিয়ার সকল দেশের লোকই যার যার মাতৃভাষায় বক্তৃতা করে। শুধু আমরাই ইংরেজি ভাষায় বক্তৃতা করে নিজেদের গর্বিত মনে করি। আর আমার বক্তৃতা দেওয়া ছিল এই জন্য যে, বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিব।’ বাহান্নর পরও বঙ্গবন্ধু ভাষাসংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াননি। ভাষাসংগ্রামের সফলতার প্রতিটি পর্বে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ১৯৫২-১৯৫৩ পুরো সময় ধরেই সারাবাংলায় দুর্বার সাংগঠনিক সফর করেন, এবং সব জায়গাতেই তাঁর অন্যন্য বক্তব্যের সাথে সাথে শেষকথা একটাই, ভাষাশহিদের রক্ত বৃথা হতে দেওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর কথোপকথনে, ভাষণে, বিবৃতিতে জনগণকে কথা দিয়েছিলেন, শহিদের একফোঁটা রক্তও বৃথা হয়ে যেতে দেবেন না। তাই ভাষার জন্য সালাম রফিক বরকতসহ বাঙালির সেদিনের সেই মৃত্যু বৃথা হয়ে যায় নাই, যেমন বৃথা হয়ে গিয়েছিল করাচির ছাত্রদের মৃত্যু, পাঞ্জাবে ছাত্রদের মৃত্যু, আসামে জনতার মৃত্যু। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ওয়াদা অনুসারে তাঁর বাঙালি ভাষাশহিদদের মৃত্যু বৃথা হয়ে যেতে দেননি।  আমৃত্যু তিনি ভাষাসংগ্রাম সচল রেখেছেন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেশব্যাপী বৃহৎ পরিসরে প্রথম ভাষা শহিদ দিবস পালনের ডাক দেন তিনি, জনগণের সংগঠন বলতে আওয়ামী লীগই কেবল তখন শেখ মুজিবুরের  নেতৃত্বে উঠে দাঁড়াচ্ছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর সাংগঠনিক জেলাগুলোতে চিঠি দিলেন ভাষা শহিদ দিবস পালনের নির্দেশ দিয়ে। কালো পতাকা  দেখানো হলো। একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরিতে মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধুসহ নেতারা উপস্থিত হলেন। হাজার হাজার মানুষের মিছিল আরমানিটোলা ময়দানে গিয়ে শেষ হলো, শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার আহ্বান জানান এবং অবিলম্বে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে বললেন, ‘এটা আমাদের ভাষার দাবি নয়, এটা আমাদের বাঁচার দাবি।’ মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায় বাহান্নতে রক্ত ঝরে ঢাকার রাজপথে রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার মহান আন্দোলনই বাঙালি জাতিকে জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করে ।

বাহান্নর ভাষাসংগ্রামের চেতনাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। একুশের সেন্টিমেন্ট নিয়ে ১৯৫৩-তে ‘যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা দাবী’ নির্বাচনী ম্যনিফেস্টো প্রণয়নকালে আবুল মনসুর আহমদকে শেখ মুজিব বলেন, কেবল ভোটলাভের জন্যে একুশের নাম ব্যবহার করলে চলবে না, সর্বস্তরে বাংলা প্রচলন, বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি দাবি যুক্ত করতে হবে। মুজিবের দাবিতে ভাষাসংগ্রামীদের দাবিগুলো যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে যুক্ত হয়। ১৯৫৪-র প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিমস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।  শেখ মুজিব বাংলা ভাষা ও বাঙালির অধিকারের সেই একই দাবি ও কথাগুলো আরো বর্ধিত উচ্চারণে জাতির সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হন। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাদান, সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু, সংসদের  দৈনন্দিন কার্যাবলি বাংলায় চালু প্রসঙ্গে তিনি আইনসভায় গর্জে ওঠেন এবং মহানায়কের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৫-র ৫ জুন বঙ্গবন্ধু গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন, ২৫ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি অনেক কিছু বলার পর এক পর্যায়ে বললেন- ‘বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার ব্যাপারে কী হবে?’ ১৯৫৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো ছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ চান। এবং বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠা করবার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বলা বাহুল্য বঙ্গবন্ধুর বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করবার সংগ্রাম এখনও অব্যাহত আছে। তাঁর  দেওয়া সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে : ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ উৎকলিত আছে বটে, তবে সর্বস্তরে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পাকিস্তান গণপরিষদে ৯ নবেম্বর, ১৯৫৫ তারিখেও বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন: ‘মাননীয় ডেপুটি স্পিকার মহোদয়, আমাকে বাংলায় কথা বলতে হবে। আমি অত্যন্ত দুঃখিত যে এ ভাষা আপনার বোধগম্য হবে না, তবুও আমাকে বাংলাতেই বলতে হবে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ভাষণ বস্তুত পাকিস্তান গণপরিষদে মাতৃভাষার অধিকারকে সমুন্নত করার পথ খুলে দেয়।  যদিও পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সে পথ বারবার রুদ্ধ করতে মরিয়া ছিল। ১৯৫৬-র ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিব পাকিস্তান গণপরিষদের দৈনন্দিন কর্মসূচি বাংলায় মুদ্রণের বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য পেশ করেন। এখানে বাংলায় ভাষণদানের পাশাপাশি পাকিস্তান গণপরিষদের প্রতিটি কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নিশ্চয়তা রক্ষায় শেখ মুজিবের সংগ্রামী মনোভাব সুস্পষ্ট। বাংলা ভাষার মর্যাদাহানির জন্য তিনি গণপরিষদের কাছে  কৈফিয়ত তলব করতেও পিছপা হননি। ১৯৫৬-র ৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে আবারও বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষা নিয়ে কথা বলেন। সংশোধনী প্রস্তাব দেন শাসনতন্ত্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও উর্দু করবার। বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়চেতা মনোভাবের কারণেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী : জাতীয় ভাষা, দাপ্তরিক ভাষা, সরকারি ভাষা ইত্যাদি শব্দের মারপ্যাঁচে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষার মর্যাদাহরণের অপচেষ্টায় সফল হতে পারেনি, বাঙালিকে ধোঁকা দিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর ভাষাবিষয়ক অভিজ্ঞতা তাঁর বক্তব্যকে শাণিত করেছে, তাঁকে করেছে দক্ষ সংসদ সদস্য। তাঁর ভাষাদর্শনের গুণেই তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের জাতির পিতা।

বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬-র ২৯ ফেব্রুয়ারি। এর পেছনেও বিশেষ অবদান রয়েছে বঙ্গবন্ধুর। ভাষা-আন্দোলন কেবল ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমিত ছিল না। একুশের উৎস থেকে জেগেছিল গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন; সে স্বপ্নপূরণের  লক্ষে দানা বেঁধেছিল সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের রূপরেখার প্রথম লিখিত দলিল শেখ মুজিবের প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকা ‘আমাদের বাঁচার দাবী ৬-দফা কর্মসূচী’ (১৯৬৬)। সেখানেও শেখ মুজিব ভাষার দাবিতে সোচ্চার হয়ে লেখেন, ‘ইচ্ছা করিলে ভোটের জোরে শুধু বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিতে পারিতাম। তা না করিয়া বাংলার সাথে উর্দুকেও রাষ্ট্রভাষার দাবী করিয়াছিলাম।’ এভাবে স্বাধীনতা-সংগ্রাাম, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পথ দেখিয়েছে শেখ মুজিবের ভাষাসংগ্রাম। ভাষাবিজ্ঞানে পরিভাষা মানে সংজ্ঞার্থ শব্দ। যথাযথ পরিভাষা না থাকার কারণেই রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে; একথা অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ১৫  ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ভাষণে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার প-িতেরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদেরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’  সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধু যে কত আন্তরিক ছিলেন, ওপরের ভাষ্য থেকে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়।  অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, তাঁর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ানের  সংগ্রাম আজও অসমাপ্ত।

 

(পরবর্তী অংশ আগামী সংখ্যা ‘শিল্পসাহিত্য’ পাতায়)