ভাষাতেই আমার পরিচয়

0
113

রায়হান আহমেদ তপাদার »

একুশ মানে ফাগুনের আগুন রাঙা ফুল-একুশ মানে লক্ষ্য নির্ভুল-একুশ মানে রফিক, শফিক, বরকত ও জব্বার-একুশ মানে বাঙালি জাতির অহংকার-একুশ মানে মায়ের মুখের ভাষা-একুশ মানে স্বপ্ন, সাধ ও আশা। রাষ্ট্রভাষা বাংলা সাক্ষী আজ সেই গৌরবের। মায়ের ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখার অনন্য ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। বছরের এই একটি মাসের জন্য লেখক-পাঠক-পুস্তক ব্যবসায়ীরা আগ্রহভরে প্রতীক্ষায় থাকেন।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এবার করোনা মহামারির কারণে যথাসময়ে ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ অনুষ্ঠিত হতে পারছে না। আপাতত গ্রন্থমেলার তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ মার্চ থেকে, যা চলতে পারে এপ্রিলের প্রথমার্ধ পর্যন্ত। প্রস্তুতিও চলছে সেভাবেই। ইতোমধ্যে দেশে করোনা প্রতিরোধী ভ্যাকসিন প্রদান শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সব কিছুই নির্ভর করবে সার্বিক পরিস্থিতির উন্নতির ওপর।
কিন্তু যে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বায়ান্নতে মাতৃভূমির অকুতোভয় সন্তানেরা জীবন দিয়েছিলেন সে ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় ব্যর্থ হলে পরম গৌরবময় সেই আত্মদান বৃথা যাবে। তাই ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে বড় উপায় হলো বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও শুদ্ধতা এবং সৌন্দর্য যাতে অক্ষুণœ থাকে সে লক্ষ্যে সক্রিয় থাকা। মাতৃভাষা সহজাতভাবেই মানুষ আয়ত্ত করে থাকে বটে, যদিও তার চর্চা বা প্রয়োগে সচেতন না হলে সে ভাষার শুদ্ধতা ও বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না। ভাষা ব্যবহারে হেলাফেলা ও অসতর্কতার কারণে শুদ্ধতা হারাতে পারে প্রাণের ভাষা-এটা মনে রাখা কর্তব্য।
ভাষার মাস তাই ভাষার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের পাশাপাশি দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতার মাসও। ভাষার মাসে মাতৃভাষার প্রতি মানুষের ভালবাসা জাগিয়ে তোলা এবং ভাষা-সচেতনতা গড়ে তোলার কাজটি তাৎপর্যপূর্ণভাবে শুরু করা এবং তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা প্রয়োজন। নবীন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, আকাক্সক্ষা আর স্বপ্নের আদান-প্রদান মাতৃভাষার মাধ্যমেই সবচেয়ে সফলভাবে সম্পন্ন হতে পারে। আর এটাও অনস্বীকার্য যে, ভাষার ভালবাসা লালনের মধ্য দিয়ে নিজস্ব ভাষাভাষী মানুষের প্রতি ভালবাসা ও মমতা তৈরি হয়, যা সুখে-দুঃখে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে একে অন্যকে পাশে রাখে। আশঙ্কার বিষয় হলো, বাংলা ভাষায় ইংরেজিসহ বিদেশি শব্দের প্রবল অনুপ্রবেশ ঘটছে। এ বিষয়ে সতর্কতা জরুরি। লক্ষ্য রাখতে হবে পরিচর্যার অভাবে যেন বাংলা ভাষার বিশুদ্ধতা বজায় থাকে। আজ বাংলা ভাষার শহীদ মিনার স্থান পেয়েছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা সংক্রান্ত জাতিসংঘের অফিসিয়াল সাইটে। নিজের মাতৃভাষার প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি বিশ্বের সব জাতি এখন মনে রাখে বাংলা ভাষাকেও। কেবল কি একুশ তারিখ? গোটা ফেব্রুয়ারি মাসই কি এখন বাংলা ভাষার মাস নয়? সারা ফেব্রুয়ারিজুড়েই মুখর থাকে ঢাকা, কলকাতা, আগরতলা, শিলচরের মতো বাঙালির কেন্দ্রভূমিগুলো মুখর থাকে দূরদেশের বাঙালি অধ্যুষিত জনপদগুলোও।
একুশ যদি মাথা উঁচু করার দিন হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসও নিশ্চয়ই মাথা উঁচু করার মাস। ফেব্রুয়ারি আদতে বাংলা ভাষার ফাগুন, বাংলা ভাষার বসন্ত দিন। রবীন্দ্রনাথের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী, দেবো আর নেবো, মিলাবো আর মিলবো। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, যা সুন্দর, যা ভালো তার কোন দেশকাল নেই। একুশের আত্মদানের ভেতর দিয়ে আমরা জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসন পেয়েছি। এ জন্যই তো ভাষা শহীদের মাসে খবর পেয়েছি, জাতি সংঘ সদর দফতরের সামনে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার অনন্য স্বীকৃতির নিদর্শন হিসেবে ভাস্কর্য স্থাপনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় জীবনে সংযোজিত হচ্ছে এক নতুন অধ্যায়।
এ কথা বললে ভুল হবে না যে, বাঙালির সভ্যতার ভিত রচিত হয়েছে একুশের শহীদের আত্মদানের ওপর ভাষাই মানুষকে মানুষ করে তোলে। নির্মম সত্য কথা। মানুষের ব্যক্তি জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রজীবন ও জাতীয় জীবনের বিকাশ ঘটে ভাষার মাধ্যমে। ভাষা মানুষের বেঁচে থাকার হাতিয়ার। এ হাতিয়ার কেড়ে নিতে চেয়েছিল শাসকরা রুখে দিয়েছিল ভাষা শহীদরা। যে মানুষের মতো মানুষ হতে হলে চাই মাতৃভাষা, চাই নিজেদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি। একুশে ফেব্রুয়ারি ইতিহাসকে সফল করে তুলতে হলে মাতৃভাষা আর মাতৃভাষার সাহিত্যকে আমাদের জীবনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। করতে হবে তাকে সব জ্ঞানের বাহন।
একুশের শহীদরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে প্রমাণ করেছেন আমরা জাতি হিসেবে মহত্ত্ব ভ্রষ্ট নই, প্রাণহীন নই, জীবন্মৃত নই, প্রাণের যে বৈশিষ্ট্য তা আমাদের আছে। প্রাণ দিয়েই আমরা প্রাণের মূল্য রক্ষা করেছি, জীবন দিয়ে জীবনের মর্যাদা খাড়া করেছি। রক্ত দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছি। মানুষ কল্পনা করে, স্বপ্ন দেখে, প্রেমে, বিরহে অশ্রুবর্ষণ করে, বিদ্রোহে প্রতিবাদে জেগে ওঠে মাতৃভাষার মাধ্যমে। ধার করা ভাষায় প-িত হওয়া যায়, মানুষ হওয়া যায় না। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন দেশের প্রধান সাংস্কৃতিক ঘটনা। ভাষার মাসজুড়ে জাতীয় মননের প্রতীক বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে একাডেমি প্রাঙ্গণ ও অধুনা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজন হয়ে থাকে প্রাণের গ্রন্থমেলা।
লেখক : প্রাবন্ধিক
ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স