ভার্চ্যুয়াল দুনিয়া, সস্তায় খ্যাতি, বিপন্ন তারুণ্য

0
352

সনেট দেব »
মাত্র ৫, ১০ কিংবা ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও। এমনই ভার্চ্যুয়াল জগতের নতুন অ্যাপ টিকটক ও লাইকি ভিড়িও করে রাতারাতি তারকা বনে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে বর্তমান তরুণ প্রজন্ম। মিলিয়ন মিলিয়ন ভক্ত তাঁদের। অদ্ভুত সব চুলের কাটিং, বিচিত্র রকম শরীরের অঙ্গ-ভঙ্গি, বিকৃত মুখের শব্দ উচ্চারণ। কি আছে এই ভিডিওতে? জনপ্রিয় কোনো গানের সঙ্গে ঠোঁট মেলানো (লিপ সিং), হিন্দি বা বাংলা ছবির কোনো বিখ্যাত সংলাপ আওড়ানো, নাচ-গান, মজা করা’র এমন ভিডিওই সাধারণত বাংলাদেশ থেকে টিকটক, লাইকিতে ছাড়তে দেখা যায়। ছোট ছোট অনুপ্রেরণামূলক (মোটিভেশনাল) কথা মজার ভঙ্গিতেও বলে অনেকে। কিন্তু বলার ধরণ ও উপস্থাপনা এতোটা বাজে হয় যে তা আর মোটিভেশনাল পর্যায়ে না থেকে হাসির খোরাক হয়ে উঠে। এ যেন এক অসুস্থ জগৎ। তবে বাংলাদেশে এই দুটি অ্যাপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে। বয়সে বেশির ভাগই এরা কিশোর বা তরুণ।
চীনের খ্যাতনামা সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স ২০১৪ সালে সাংহাই থেকে মিউজিক্যাল.লি নামে অ্যাপ তৈরি করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। টিকটক একটি স্মার্টফোনের অ্যাপ। টিকটকের স্লোগান হলো তোমার দিন বানাও: আসল মানুষ, আসল ভিডিও (মেক ইওর ডে: রিয়েল পিপল, রিয়েল ভিডিও)। ২০১৬ সালে চীনে ডুইন নামের অ্যাপ ছাড়ে বাইটড্যান্স। ২০১৮ সালে মিউজিক্যাল.লি ও ডুইন এক করে নতুন নামে ছাড়া হয় টিকটক। টিকটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় বিশ্বব্যাপী। তবে ডুইন এখনো রয়েছে টিকটকের চীনা বোন হিসেবে। শুরু থেকেই এতে যে কেউ চাইলে ৫, ১০, ১৫ সেকেন্ডের ভিডিও দিতে পারত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখন দুই-আড়াই মিনিট পর্যন্ত দৈর্ঘ্যের ভিডিও দেওয়া যায়।

‘টিকটক কিংবা লাইকি’তে প্রদর্শিত অনেক ভিডিও আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। তাছাড়াও সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও অন্যতম কারণ এই দুইটি অ্যাপ। আমি সরাসরি এই অ্যাপ বন্ধের কথা বলবো না। তবে এটা ব্যবহারের একটি সুনিদিষ্ট নীতিমালা দরকার। কারা ভিডিও করতে পারবে, ভিডিওর ধরণ কেমন হবে, ভাষা কিংবা অঙ্গ-ভঙ্গি। সব বিষয়ে একটি নিয়ম থাকতে হবে। না হয় আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম অসুস্থ বিনোদনের ও সস্তায় খ্যাতি পাওয়ার আশায় আরো বিপথগামী হতে পারে। আর আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বিপথে যাওয়া মানেই দেশের জন্য বড় হুমকিস্বরূপ।

টিকটকের তুলনায় নতুন লাইকি। সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিগো টেকনোলজি তৈরি করেছে এটি। বিগো ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এটি বাজারে ছাড়ে। বিগোর মূল প্রতিষ্ঠান চীনভিত্তিক জয়। বর্তমানে প্রতি মাসে লাইকির সক্রিয় ব্যবহারকারী সাড়ে ১১ কোটি। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ অ্যাপ ইমো ব্যবহারকারীরা সরাসরি লাইকি ব্যবহার করতে পারেন। আগে এর নাম ছিল লাইক। এখন হয়েছে লাইকি। গত বছরে ৮ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব আয় ছিল লাইকির।
দুটি অ্যাপেরই জনপ্রিয়তার কারণ সহজে ভিডিও করা যায়, সম্পাদনা করা যায়, নানা রকম আবহ এবং অগমেন্টেড রিয়েলিটি (নতুন কোনো বাস্তবতা যুক্ত করা) যোগ করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও রয়েছে এই দুটি অ্যাপের। মূলত কম বয়সী ছেলেমেয়ে ও তরুণেরা এই অ্যাপগুলো ব্যবহার করে। ওবারলো ডটকমের এক পরিসংখ্যান বলছে, টিকটকের ৪১ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ১৬ থেকে ২৪ বছর। বাংলাদেশে এই টিকটক এবং লাইকি দুটিই বেশ জনপ্রিয়। এই দুটি অ্যাপ চালাতে বা ভিডিও দিতে খুব বেশি গতির ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয় না। তাই শহরের বাইরে, এমনকি গ্রাম পর্যন্ত এদের ব্যবহারকারীরা ছড়িয়ে আছেন।
কিন্তু হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে ‘টিকটক’ ও ‘লাইকি’ নামের অ্যাপস দুইটি। কারণ গত ২ আগস্ট ইয়াসিন আরাফাত অপু নামে একজন ‘টিকটক’ ও ‘লাইকি’ ইউজার ঢাকার উত্তরায় তাঁর কয়েকজন বন্ধুসহ সড়ক বন্ধ করে ভিডিও করছিলেন। সেখানে একজনের গাড়ি আটকে যায়। পরে তাঁর সঙ্গে অপুর হাতাহাতি আর মারামারিও হয়। উত্তরা পূর্ব থানায় সেই গাড়িচালকের করা মামলায় গ্রেপ্তার হন অপু। তার সপ্তাহখানেক আগে মামুন নামে আরেকজন ‘টিকটক’ ও ‘লাইকি’ ইউজারকে রাস্তায় প্রকাশ্যে মারধর করে উত্তেজিত জনতা। পুলিশের ভাষ্যমতে তাদের এমন প্রচার-প্রচারণার আড়ালে থাকতে পারে কিশোর গ্যাং তৈরি করা। সস্তা জনপ্রিয়তা নিয়ে এই গ্যাংগুলো পরে যে কোন অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে বলেও অনেক মনোবিজ্ঞানীরা শঙ্কা করছেন।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছে, জনপ্রিয় টিকটকার কিংবা লাইকির লিডারশিপ বোর্ডে থাকা ভিডিও নির্মাতাদের বেশির ভাগেরই বয়স ২০-২৫ বছরের আশপাশে। কিন্তু তাদের ফলোয়ারের সংখ্যা লাখ লাখ। কারও কারও ২৫, ৩০ লাখের বেশি। এর ফলে ভার্চ্যুয়াল দুনিয়ায় দ্রুত পরিচিতি পেয়ে যায় তারা। টিকটকার বা লাইকির ভিডিও নির্মাতাদের ছোট ছোট ভিডিও এক করে ইউটিউব বা তাদের ফেসবুক পেজেও ছাড়া হয়। ইউটিউব চ্যানেল থেকেও এমন করা হয়। বর্তমানে টিকটকের সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ কোটি। ১৫৫টি দেশে ৪০টি ভাষায় চলে এটি। প্রতিদিন ১০০ কোটি ভিডিও দেখা হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১০০ কোটি বার নামানো হয় (ডাউনলোড) টিকটক। এক বছরের ব্যবধানে গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে ২৩৩ কোটি টিকটক অ্যাপ নামানো হয়েছে। এই সংখ্যা ফেসবুক, গুগল, ইউটিউব অ্যাপের চেয়েও বেশি। যুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেক ক্রাঞ্চ বলছে, জুনে লাইকির সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ১৫০ মিলিয়নে। যদিও এ বছরের শুরুতে টিকটকের দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২০০ মিলিয়ন।
শুধু তরুণ প্রজন্ম নয় টিকটক ও লাইকি’তে আছেন বাংলাদেশের অনেক মূলধারার তারকাও।
বিশেষ করে করোনাকালে এই সংখ্যা বেড়েছে। তাঁদের অভিনীত কোনো নাটক বা সিনেমার অংশ নয়, লিপ সিং, সংলাপ দিয়ে এই মাধ্যমের চলতি ধারা মেনেই ছোট ছোট ভিডিও দিচ্ছেন তাঁরা। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবের পর নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন শ্রেণির দর্শকের কাছে পৌঁছার জন্যই এই প্রচেষ্টা।
সম্প্রতি ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র স্বার্থে আগামী সেপ্টেম্বর নাগাদ টিকটক যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার হুমকি দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কখনো এগুলোতে থাকা বিষয়বস্তুর কারণে, কখনো-বা বাণিজ্যের স্বার্থে টিকটক বা লাইকির মতো অ্যাপ মাঝে মধ্যে নিষিদ্ধ হয় বিভিন্ন দেশে। চীন-ভারতের সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনার সময় ভারত ও পাকিস্তানে জুন থেকে বন্ধ রয়েছে টিকটক ও লাইকি। বাংলাদেশেও বছরখানেক আগে কয়েক দিনের জন্য বন্ধ হয়েছিল টিকটক।
এখন প্রশ্ন হলো, এই টিকটক ও লাইকি আমাদের তরুণ প্রজন্মের মনে নীতি-নৈতিকতা কিংবা শিষ্টাচার তৈরিতে কতটুকু ভূমিকা রাখছে? কতটা মানবিক হওয়ার দায়িত্ব পালন করছে? প্রযুক্তির বদৌলতে অনেক কিছুই আসবে কিন্তু শিক্ষণীয়, সমাজ ও দেশের উন্নয়ন হয় এমন কিছুই আমাদের গ্রহণ করা উচিত। অসুস্থ বিনোদনের লক্ষ্যে নিজের বিবেক বিসর্জন দিয়ে সমাজ ও আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিরোধী কোন প্রযুক্তির পক্ষে আমি নই। ‘টিকটক কিংবা লাইকি’তে প্রদর্শিত অনেক ভিডিও আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায় না। তাছাড়াও সমাজের নৈতিক অবক্ষয়েরও অন্যতম কারণ এই দুইটি অ্যাপ। আমি সরাসরি এই অ্যাপ বন্ধের কথা বলবো না। তবে এটা ব্যবহারের একটি সুনিদিষ্ট নীতিমালা দরকার। কারা ভিডিও করতে পারবে, ভিডিওর ধরণ কেমন হবে, ভাষা কিংবা অঙ্গ-ভঙ্গি। সব বিষয়ে একটি নিয়ম থাকতে হবে। না হয় আমাদের এই তরুণ প্রজন্ম অসুস্থ বিনোদনের ও সস্তায় খ্যাতি পাওয়ার আশায় আরো বিপথগামী হতে পারে। আর আমাদের বর্তমান প্রজন্ম বিপথে যাওয়া মানেই দেশের জন্য বড় হুমকিস্বরূপ। অভিভাবকদেরও এই বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখতে হবে। নিজের সন্তানের যতœ নিন। তাদের চলাফেরার উপর নজর রাখুন। র্স্মাট ফোনে আপনার সন্তান কি করে তার খবর রাখুন। সবার একান্ত প্রচেষ্টায় আমাদের তরুণ প্রজন্মকে বিপথগামী করা থেকে মুক্ত রাখার এটাই উপযুক্ত সময়।

লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

sonnetdev1989@gmail.com