আমাদের কক্সবাজার প্রতিনিধির পাঠানো সংবাদে বলা হয়েছে, জেলার উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চল নতুন করে ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখে। গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহ হ্রাস ও উচ্চমূল্যের অজুহাতে রোহিঙ্গারা নির্বিচারে বনের কাঠ উজাড় করছে। মানবিক কারণে আশ্রয় দেওয়া একটি জনগোষ্ঠী যখন জীবনধারণের প্রয়োজনে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংস করতে বাধ্য হয়, তখন তা কেবল পরিবেশগত বিপর্যয় নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সংকটের রূপ নেয়।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, রোহিঙ্গা শিবিরে ১২ কেজির একটি গ্যাস সিলিন্ডার বর্তমানে ৪৫ দিনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা বাস্তবে ১৫ থেকে ২০ দিনের বেশি চলে না। বাকি দিনগুলোর রান্নার চাহিদা মেটাতে রোহিঙ্গারা বেছে নিচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে। একেকটি পরিবারের দৈনিক গড়ে পাঁচ কেজি কাঠের প্রয়োজন হলে, ৩৩টি শিবিরের প্রায় সাড়ে ১২ লাখ মানুষের জন্য মাসে যে বিপুল পরিমাণ কাঠের প্রয়োজন হয়, তার পুরোটাই আসছে পার্শ্ববর্তী বন থেকে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মাসে প্রায় সোয়া ছয় লাখ মণ কাঠ সাবাড় হচ্ছে উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড় থেকে। এটি কেবল কোনো সংখ্যা নয়, বরং একটি জীবন্ত বাস্তুসংস্থানের মৃত্যুঘণ্টা।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তা কমে যাওয়া এবং স্থানীয় বাজারে সিলিন্ডার গ্যাসের অত্যধিক দাম (প্রায় ২২০০ টাকা) রোহিঙ্গাদের চরম সংকটে ফেলেছে। মাসিক খাদ্য সহায়তার পরিমাণ ১২ ডলার থেকে কমিয়ে বর্তমানে ৮ ডলারে নামিয়ে আনায় তাদের দৈনন্দিন ভরণপোষণই এখন হিমশিম খাওয়ার মতো। এই অর্থনৈতিক চাপই মূলত তাদের বনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানবিক সংকটের সমাধান কি পরিবেশের বিনিময়ে হতে পারে?
২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়গুলো ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে বনায়নের মাধ্যমে কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও বর্তমানের এই কাঠ সংগ্রহের হিড়িক সেই অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে। বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, মাটির ক্ষয় বাড়ছে এবং পাহাড় ধসের ঝুঁকি প্রকট হচ্ছে। বিশেষ করে হাতি চলাচলের করিডোরগুলো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রায়ই মানুষ-হাতি দ্বন্দ্বের ঘটনা ঘটছে। জীববৈচিত্র্যের এই অপূরণীয় ক্ষতি আগামী প্রজন্মের জন্য এক অশনিসংকেত।
এই সংকট নিরসনে কেবল নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের জন্য রান্নার গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ এবং সিলিন্ডারের স্থায়িত্ব বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোকে পুনরায় জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য জোরালো তাগিদ দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব স্টোভ বা বিকল্প জ্বালানির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন রক্ষার গুরুত্ব নিয়ে শিবিরের ভেতরে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালাতে হবে। বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি জোরদার করতে হবে যাতে কোনোভাবেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে কাঠ পাচার না হতে পারে।
মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করতে গিয়ে আমরা যদি পরিবেশগত বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানাই, তবে তার মাসুল দিতে হবে দীর্ঘকাল। রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি এই মুহূর্তে পরিবেশ রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। বন শেষ হয়ে গেলে কেবল পাহাড়ই হারাবে না, বরং পুরো অঞ্চলের জলবায়ু ও জনজীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চলকে এই ‘কাঠের ক্ষুধা’ থেকে রক্ষা করার।
মতামত সম্পাদকীয়





















































