বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এক প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই রেমিট্যান্সের উজ্জ্বল পরিসংখ্যানের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে হাজার হাজার নারী শ্রমিকের আর্তনাদ ও বঞ্চনার ইতিহাস। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে আসা পটুয়াখালীর লিজা আক্তারের করুণ কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি জমানো হাজারো বাংলাদেশি নারীর ভাগ্যের এক নির্মম প্রতিফলন। ১০ বছরে ৭০ হাজার নারীর নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা এবং শত শত নারীর লাশ হয়ে ফেরা আমাদের জাতীয় বিবেকের সামনে এক বিশাল প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
অভাবের তাড়নায় এবং সন্তানদের উন্নত ভবিষ্যতের আশায় লিজার মতো নারীরা যখন বিদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন তাদের স্বপ্ন থাকে কেবল দুবেলা দুমুঠো অন্নের। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে গৃহকর্মীদের শ্রম আইন বা মানবাধিকারের ন্যূনন্তম সুরক্ষা দেওয়া হয় না। প্রতিবেদনে উল্লিখিত ‘হাতবদল’ হওয়ার বিষয়টি আধুনিক দাসপ্রথারই এক নগ্ন রূপ। বিএমইটির তথ্যমতে, ১০ লাখের বেশি নারী বর্তমানে বিদেশে কর্মরত, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে। অথচ সেখানে তাদের কাজের পরিবেশ, আবাসন এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রায়ই অনিশ্চিত। যৌন নির্যাতন, শারীরিক নিগ্রহ এবং বেতন না পাওয়ার মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক খবরে পরিণত হয়েছে।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে ৭০ হাজার নারীর ফিরে আসা এবং ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৬ হাজারের বেশি নারীর মানবপাচারের শিকার হওয়া প্রমাণ করে যে, আমাদের অভিবাসন প্রক্রিয়া এখনো কতটা ত্রুটিপূর্ণ। সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, যারা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে বা পঙ্গুত্ব বরণ করে ফিরছেন, তাদের সামাজিক পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সমাজ ও পরিবার অনেক ক্ষেত্রে তাদের আপন করে নেওয়ার বদলে উল্টো লাঞ্ছিত করে, যা তাদের যন্ত্রণাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ থেকে নারী কর্মী পাঠানোর ইতিহাস খুব পুরনো না হলেও এর প্রসারের সাথে সাথে নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে গেছে। আমরা যদি কেবল রেমিট্যান্সের অংকের দিকে তাকিয়ে আমাদের মা-বোনদের অনিরাপদ পরিবেশে ঠেলে দিই, তবে তাকে কর্মসংস্থান না বলে ‘বিসর্জন’ বলাই শ্রেয়। অনেক ক্ষেত্রে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মিথ্যা প্রলোভন এবং সরকারের তদারকির অভাবে নারীরা দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
এই সংকট নিরসনে সরকারকে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে যেমন, যেসব দেশে নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে, সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী চুক্তি করতে হবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর লেবার উইংকে আরও সক্রিয় হতে হবে যাতে কোনো নারী বিপদে পড়লে তাৎক্ষণিক সহায়তা পান। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা সুরক্ষা নিশ্চিত না করে কর্মী পাঠাচ্ছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনতে হবে। শুধু গৃহকর্মী হিসেবে নয়, নারীদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলে উন্নত বিশ্বের নিরাপদ কর্মক্ষেত্রে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
৮ মার্চ বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে। সে উপলক্ষে অনেক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালার আয়োজন হয়েছে। কিন্তু সে চাকচিক্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে এ দেশের বিপুল সংখ্যক নারীর অসহায়ত্ব আর নিদারুণ বঞ্চনার করুণ কাহিনি।
রেমিট্যান্সের প্রতিটি মুদ্রা যদি নারীর চোখের জল আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে আসে, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। লিজাদের চোখের পানি মোছাতে রাষ্ট্রকে আজ অভিভাবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি।


















































