বিজ্ঞান : কার্বন ডাই-অক্সাইড, কুয়াশা, কালবৈশাখী, কক্ষপথ, কর্কটক্রান্তি, কেন্দ্রমণ্ডল, কৃষ্ণবস্তু

346

সাধন সরকার :

 

কার্বন ডাই-অক্সাইড

আমাদের চারপাশে বায়ুর সাগরে ঘুরে বেড়াচ্ছে হরেক রকমের গ্যাস। এর মধ্যে রয়েছে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, আর্গন, কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস ইত্যাদি। জলবায়ুর পরিবর্তনে কার্বনসংশ্লিষ্ট যৌগ কার্বন ডাই-অক্সাইড (ঈঙ২) গ্যাসের ভূমিকা রয়েছে। কার্বন ও অক্সিজেনের সম্মিলনে গঠিত গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড। কয়লা যখন পোড়ানো হয় কিংবা জ্বালানো হয় জীবাশ্ম জ্বালানি তখন কার্বনের সঙ্গে অক্সিজেন যুক্ত হয়ে তৈরি হয় অতি বিষাক্ত কার্বন মনোক্সাইড কিংবা পরিবেশের জন্য দূষণকারী গ্যাস কার্বন ডাই-অক্সাইড। আমরা সচারচর কোমল পানীয়র বোতল খুললেই  যে বুদবুদ দেখি তা হলো কার্বন ডাই-অক্সাইড। বন্ধুরা, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিবেশগত প্রভাব উল্লেখযোগ্য বিষয়। কার্বন ডাই-অক্সাইড একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রিনহাউজ গ্যাস যা ভূপৃষ্ঠের তাপ শোষণ করে। বায়ুম-লীয় কার্বন ডাই-অক্সাইড পৃথিবীতে জীবনের একটি প্রাথমিক উৎস এবং এর ঘনত্ব পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে সালোকসংশ্লেষণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। শিল্পবিপ্লবের পর থেকে কার্বনভিত্তিক জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুম-লে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবজগতের জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে।

কার্বন ডাই-অক্সাইড শুধু পরিবেশ উষ্ণকারী গ্যাস নয়, মূলত আরও দুটো গ্যাস আছে মিথেন (ঈঐ৪) ও নাইট্রাস অক্সাইড (ঘ২ঙ) । কিন্তু পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে মূল ভূমিকায় আছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, তাই কার্বন নিয়ে এত কথাবার্তা। প্রধানত এই তিনটি গ্যাসকে গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়। এই গ্যাসগুলো সূর্য থেকে আসা তাপমাত্রা ধরে রেখে পৃথিবীকে উষ্ণ করে তোলে। আবার এই গ্যাসগুলো না থাকলেও পৃথিবীতে প্রাণিকুলের বেঁচে থাকতেও সমস্যা তৈরি হবে। পৃথিবীর গর্ভ থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি বের করে এনে তাদের পোড়ানোর ফলে তৈরি হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড। সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করে থাকে ধনী দেশগুলো। কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের বৈশিষ্ট্য হলো- এটি রংহীন, বর্ণহীন, গন্ধহীন পরিষ্কার গ্যাস। এটি নিজে জ্বলে না এবং অপরকে জ্বলতে সাহায্য  করে না। এটি বিদ্যুৎ কুপরিবাহী।

কুয়াশা

বায়ুম-লে জলের কণা যখন মেঘের মতো ভেসে বেড়ায় তখন কুয়াশার সৃষ্টি হয়। আর্দ্র বায়ু (বাতাসে জলের পরিমাণ) ভূ-পৃষ্ঠের নিকটস্থ শীতল (ঠান্ডা) বায়ুর সংস্পর্শে এসে ঘনীভূত (মিশে যাওয়া) হয়ে অতি সুক্ষ্ম জলকণায় পরিণত হয়। এ সব সুক্ষ্ম জলকণা এতই হালকা থাকে যে ভূ-পৃষ্ঠের ওপর পানির বিন্দু আকারে পড়ে না গিয়ে ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন এলাকায় মেঘের মতো ভেসে বেড়ায়। কুয়াশা দেখতে অনেকটা ধোঁয়ার মতো। অতিরিক্ত কুয়াশায় দূরের জিনিস দেখা যায় না। কুয়াশাকেও এক ধরনের মেঘ বলা যেতে পারে! কুয়াশা আবার গাছের পাতা বা ঘাসের ওপর জমা হলে তা ক্ষুদ্র পানির কণা আকারে দেখা যায়।

কালবৈশাখী

বাংলাদেশে চৈত্র-বৈশাখ মাসে স্বল্প পরিসরে অল্প সময়ব্যাপী বজ্রবিদ্যুৎসহ এক প্রকার প্রবল ঝড়ের সৃষ্টি হয়। মূলত একে কালবৈশাখী ঝড় বলে। বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্বভারতে মার্চ থেকে কালবৈশাখী ঝড় দেখা যায়। বন্ধুরা, অনেক সময় এই ঝড় জীবনঘাতী রূপ ধারণ করে। গ্রীষ্ম ঋতুর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে এ ঝড়ের আগমন ঘটে। কালবৈশাখীর বায়ুর গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৬০ কিলোমিটার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারের বেশিও হতে পারে। কালবৈশাখীর স্থায়িত্বকাল স্বল্পতর, তবে কখনো কখনো এ ঝড় এক ঘণ্টারও বেশিকাল স্থায়ী হয়। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের তাপমাত্রা পূর্ববর্তী মাসগুলির (শীতকালের মাসগুলি) তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিতে সারাদেশে বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাংশে দৈনিক তাপমাত্রা সর্বোচ্চ পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। বায়ুম-লের নি¤œস্তরে উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ুর উপস্থিতি কালবৈশাখী সৃষ্টির অপরিহার্য পূর্বশর্ত। কালবৈশাখীকে বায়ুপুঞ্জ বজ্রঝড় অথবা পরিচলনগত বজ্রঝড় নামেও আখ্যায়িত করা যায়। বাংলাদেশে কালবৈশাখী সৃষ্টির প্রধান কারণ হচ্ছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বদিক থেকে আসা উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু যা ঊর্ধ্বে ২ কিলোমিটার পর্যন্ত আরোহণ করে থাকে। এ উষ্ণ ও আর্দ্র বায়ু উত্তর-পশ্চিম এবং পশ্চিম দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল ও শুষ্ক বায়ুর সঙ্গে মিলিত বা মুখোমুখি হয়। আবার স্থানীয়ভাবে কোনো এলাকার ভূ-পৃষ্ঠ অত্যধিক তাপমাত্রা অথবা অন্যান্য কারণে উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বায়ুম-ল যথেষ্ট অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং এ ঝড়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়।

কক্ষপথ

সৌরজগতের প্রতিটি গ্রহই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। পৃথিবী সৌরজগতের একটি গ্রহ। সৌরজগতের একটি গ্রহ হিসেবে পৃথিবী নিজ অক্ষে (নিজের চারদিকে) আবর্তন করছে (ঘুরছে) আবার একটি নির্দিষ্ট পথে সূর্যের চারদিকেও পরিক্রমণ (ঘুর্ণন) করছে। যে পথে পৃথিবী এবং অন্যান্য গ্রহসমূহ সূর্যকে আবর্তন করে তাকে কক্ষপথ বলে। এই কক্ষপথটি মূলত ডিম্বাকার। এভাবে নিজ কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ বা ঘুরতে পৃথিবীর ৩৬৫ দিন বা ১ বছর সময় লাগে।

কর্কটক্রান্তি

সমগ্র পৃথিবীকে একটি ছকে কল্পনা করে মাঝ বরাবর নিরক্ষরেখা টেনে ওপরের অংশকে উত্তর অক্ষাংশ নাম দেওয়া হয়েছে। সাড়ে ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশকে কর্কটক্রান্তি বলে। সুর্যের উত্তরায়ণের (সূর্য উত্তর দিকে গমন করে) কারণে ২১ জুন মধ্যাহ্নে উত্তর অক্ষাংশে সূর্য লম্বভাবে কিরণ দেয়। ফলে উত্তর গোলার্ধে এ দিন অর্থাৎ ২১ জুন সবচেয়ে বড় দিন ও বিপরীতভাবে সবচেয়ে ছোট রাত হয়। এই প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সাড়ে ২৩ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ বিশেষভাবে চিহ্নিত করে একে একটি ক্রান্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে বলে রাখা ভালো, সূর্যের উত্তরায়ণের এটিই শেষ সীমা। কর্কটক্রান্তি রেখা (পশ্চিম থেকে পূর্বদিক থেকে) বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি সর্বমোট ১১টি জেলার ওপর দিয়ে অতিক্রম করেছে।

কেন্দ্রমণ্ডল

ধারণা করা হয়, পৃথিবী একটি গোলকের ন্যায়! ভূপৃষ্ঠের কঠিন বহিরাবরণ বা মাটি ভেদ করে ভূঅভ্যন্তরের অনেক অনেক গভীরে (মাটির অনেক গভীরে) সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ সীমিত! তাই বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে পৃথিবীর উপরিভাগ বা মাটি থেকে অনেক নিচের দিকে কেন্দ্র পর্যন্ত ৩টি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো- অশ্নম-ল বা ভূত্বক, গুরুম-ল, কেন্দ্রম-ল। পৃথিবীর ওপর অর্থাৎ আমরা যার ওপর বাস করি সেই মাটির বা তারও খানিক নিচ পর্যন্ত অশ্মম-ল। তারপর রয়েছে গুরুম-ল। গুরুম-লের নি¤œভাগ থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত স্তরকে কেন্দ্রম-ল বলে। পৃথিবীর কেন্দ্রে এই ম-ল অবস্থিত। প্রচ- তাপ ও চাপে কেন্দ্রম-লের পদার্থগুলো স্থিতিস্থাপক (স্থির) অবস্থায় রয়েছে। প্রধানত নিকেল (ঘর) ও লোহা (ঋর) দ্বারা এই স্তর গঠিত এজন্য একে ‘নিফি’ (ঘরভর) স্তর হিসেবেও অভিহিত করা হয়।

কৃষ্ণবস্তু

বন্ধুরা, কৃষ্ণবস্তু নাম শুনেই জটিল মনে হচ্ছে! তাই নয় কী! যেসব বস্তুর তাপ শোষণ ও বিকিরণ (শক্তির এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গমন বা ছড়ানো) করার ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি এবং যেখানে তাপের প্রতিফলন (আলো বা তাপের বাধা পেয়ে ফিরে আসা) ও প্রতিসরণ (আলোকরশ্মির দিক পরিবর্তন) আদৌ নেই তাকে কৃষ্ণবস্তু বলে। মূলত চরম বা প্রকৃত কৃষ্ণবস্তু পৃথিবীতে নেই। পৃথিবী নিজেও একটি কৃষ্ণবস্তু! মহাশূন্যে যে ব্লাকহোল রয়েছে তাকে মোটামুটিভাবে কৃষ্ণবস্তুর উদাহরণ বলা যেতে পারে। এতে কোনো প্রতিফলন বা সঞ্চালন হয় না, কেবলই শোষণ ঘটে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে কৃষ্ণবস্তু আদর্শ তাপ বিকিরণকারী বস্তুতে পরিণত হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই বিকিরণ লাল রং থেকে শুরু হয়ে কমলা, হলুদ এবং সাদা রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্যে ঘটে এবং শেষ হয় গিয়ে নীলরঙে।

(সূত্র : উইকিপিডিয়া)