বিগত দিনের করোনা অভিজ্ঞতা ও বর্তমানের আমরা

0
140

সফিক চৌধুরী »

বিগত কয়েকদিন যাবৎ সরকারি হিসাবে কোভিড আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আবার বাড়ছে, যা আমাদের জন্য দুঃসংবাদ। কিন্তু, এইযে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আবার বাড়ছে, তা মোকাবিলায় সরকার নাগরিকসহ আমরা সকলে কতটা প্রস্তুত? বিগত সময়ের বিবেচনায় আমরা কি সচেতন ও সতর্ক রয়েছি? করোনা মোকাবিলায় বিদেশ ফেরত বিশেষ করে যুক্তরাজ্য/ইউরোপ হতে আগতদের প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনেও ঢিলেঢালা মনোভাব, যাদেরকে হোম কোয়ারেন্টাইন থাকতে বলা হচ্ছে তাদের অধিকাংশই তা মানছেন না। অন্যদিকে, শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা ছাড়া দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, পর্যটন কেন্দ্র, বিপণিবিতানগুলো উন্মুক্ত, বইমেলা সহ সরকারিভাবেই জনসমাগমপূর্ণ নানা অনুষ্ঠান হচ্ছে, এমন বাস্তবতায় শুধু নাগরিকের উদাসীনতাকে দায়ী করা অনুচিত। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারে বারে বলা হচ্ছে, কোভিড ভ্যাকসিন গ্রহণ করলেও মাস্ক পরে যথাসম্ভব জনসমাগম এড়িয়ে সচেতনভাবে চলাচল করতে হবে। কিন্তু নাগরিক হিসাবে আমরা সতর্ক চলাচল করছি না, মাস্কবিহীন রাস্তা-ঘাটে ঘোরাঘুরি আর নানা পর্যটন এলাকায় ঘুরে বেড়ানো ইদানিং কেন যেন মনে হয় আরও বেড়েছে।
যুগ যুগ ধরে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাতে অবকাঠামো ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির মধ্যে ভারসাম্যহীনতা একটা বড় সমস্যা। নব্বই দশকের পর হতে ধীরে ধীরে আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো স্বল্প শয্যা হতে অবস্থানভেদে কোথাও কোথাও ১৫০-২০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত হয়েছে। যাকে আমরা উন্নতি হিসেবেই দেখেছি, কিন্তু অবকাঠামো হলেই তা যে স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন নয়, তা আমরা বিগত বছরে কোভিডের শুরু থেকে কিছুটা হলেও হয়তো অনুধাবন করতে পেরেছি। কেননা, দেখা গেছে অবকাঠামো বাড়ানো হলেও জনশক্তি প্রায় জায়গাতেই আগের শয্যা অনুসারেই রয়ে গেছে! সেই সাথে কোভিডকালে আমরা দেখেছি, হাসপাতালে অক্সিজেন সমস্যা, পর্যাপ্ত আইসিইউ’র অভাব, ভেন্টিলেশনের স্বল্পতা প্রকট। অর্থাৎ, অবকাঠামো বাড়ানো হলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। বাহ্যিক অবকাঠামো সৃষ্টি করে আমরা হয়তো দেখাতে পারছি হাসপাতাল ভবন হয়েছে কিন্তু আদতে সেখানে যথাযথ সেবা পাওয়া যাচ্ছে কি না, সে খবর আর রাখছি না। আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, হয়তো কোনো হাসপাতালে অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন, কিন্তু ডিগ্রিধারি নার্স অপ্রতুল, সাপোর্ট ফোর্স নেই। কোভিড আসার আগে এসব অপ্রতুলতা নিয়ে আমরা তেমন সরব ছিলাম না। কারণ, আমাদের সমাজের মধ্যবিত্তসহ একটা বড় অংশ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন! কিন্তু, করোনাকালে এসে নিজের দেশেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হতে গিয়ে আমরা চারিদিকে এত অব্যবস্থাপনা আর প্রায় ক্ষেত্রেই শুধু নাই নাই দেখে মাথা চাপড়িয়েছি। কিন্তু, আদৌ আমাদের বোধোদয় হয়েছে কী?
কোভিডকালে প্রায়শই আমাদের কিছু কিছু চিকিৎসকের চিকিৎসা না দেওয়ার যে সব নেতিবাচক সংবাদ শুনতে পেয়েছি, তা আমাদের ব্যথিত, মর্মাহত ও মাঝে মাঝে ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল বটে। কিন্তু, তাই বলে যখন গুটিকয়েক অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক ঘটনা পরবর্তীতে ঘটনার সামাজিক কার্যকারণ না খুঁজে চলতি হাওয়ার পন্থি হয়ে দ্রুতই পুরো চিকিৎসক সমাজকেই আসামির কাঠগড়ায় আমরা দাঁড় করিয়ে দিয়েছি, তখন তা সমাজের অসুস্থতার পরিচায়ক বলেই আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
কোভিডের আক্রমণের শুরুতে সারা দেশ যখন ঘরবন্দি তখন কিছু স্বাস্থ্যকর্মী নিরন্তর লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন, যদিও তার বেশিরভাগই অগোচরে রয়ে গিয়ে বেশি প্রচার পেয়েছে গুটিকয়েকের চিকিৎসা না দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া! তবে, নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, মারি’র কালে সামনের সারিতে থেকে নিজের ও পরিবারের কথা ভুলে অনেক চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীই সশরীরে, সেই সাথে মোবাইলে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত থেকে কাজ করে গেছেন নিরবে।
ভুলে গেলে চলবে না, যে কয়েক প্রকারের মানুষ এই যুদ্ধে সহজে হার স্বীকার করতে গররাজি ছিলেন, তাঁরা হলেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা। কেউ কেউ হতে পারে হয়তো, এমন আকালের দিনে এটা হতেই পারে, তবে বেশিরভাগই হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে ছিলেন না। তাই, এই অতিমারি ভাইরাস ঠেকানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের স্বল্পতা নিয়েই যুদ্ধে নেমেছিলেন তাঁরা। মৃত্যুর ঝুঁকির কথা জেনেও স্বেচ্ছায় তাঁরা কোভিড-১৯ ভাইরাসের মোকাবিলা করেছেন, মৃত্যুকে আলিঙ্গনও করেছেন অনেকে। যদিও কোভিডের শুরুতে কিছু ক্ষেত্রে সরকার স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পারেনি। সময়মতো সর্বোচ্চ মানের পার্সোনাল প্রোটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), গ্লাভস বা মাস্কের জোগান দিতে পারেনি, আবার এমন খবরও বেরিয়েছে, শুরুতে মাস্ক যা দিয়েছে, তার মান নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেই জিজ্ঞাসা ছিল। অথচ, সাধারণ আমরা মাস্ক বা পিপিই কেন যথাযথ মানসম্পন্ন নয় তা নিয়ে ছিলাম অনেকটাই নিশ্চুপ, আমরা শুধু চেয়েছি, চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা কোন প্রটেকশন না পেলেও চিকিৎসা দিয়েই যাবেন! একটা জিনিস আমাদের স্পষ্ট করে বুঝতে হবে যে, স্বাস্থ্যকর্মীরা সবচেয়ে বেশি রোগীর সংস্পর্শে যান। কোনও সংক্রমিত রোগীর থেকে এক জন ডাক্তার বা নার্সের মধ্যে যদি করোনার সংক্রমণ হয় তা হলে সেই ডাক্তার বা নার্স পরবর্তীতে যত জন রোগীর সংস্পর্শে আসবেন, সবার মধ্যে সংক্রমণ ছড়াবে। সে জন্য সর্বপ্রথম কর্তব্য হল, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পর্যাপ্ত প্রোটেকশন দেওয়া।
আসুন, এবার অন্তত নিজের বিবেককে প্রশ্ন করি। ভাবুন, যদি এই স্বাস্থ্যকর্মীরা আমাদের অনেকের মতো ঘরের দরজা বন্ধ করে লকডাউন হয়ে ঘরে বসে থাকতেন, তা হলে এত দিনে আমাদের কী পরিণতি হতো! অস্বীকার করার উপায় নাই, জনসংখ্যা পিছু চিকিৎসকের ভীষণ অভাব রয়েছে আমাদের দেশে, এমন পরিস্থিতিতে যে সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী এগিয়ে এসেছিলেন করোনা সহ সকল চিকিৎসায় তাঁদের জন্য আমাদের ধন্যবাদ, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
গত বছরের কোভিডকালে দেখেছি, এইযে আমাদের আইসিইউ সংকট, অক্সিজেনের স্বল্পতা, ফার্মেসিগুলোর ওষুধ নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতাসহ জবাবদিহিতাহীন বেসরকারি চিকিৎসা সেবা তা নিয়ে আমরা কেমন যেন নির্লিপ্ত! এতসব অব্যবস্থাপনার মাঝে আমরা আরও অবাক হয়ে দেখেছি, নাগরিকদের একটা বড় অংশই ব্যস্ত ছিলেন চাল-ডালের মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকেই অক্সিজেন সিলিন্ডার-অক্সিমিটার ইত্যাদি কিনে বাসায় মজুদ করে রাখতে। যার প্রভাবে বাজারে এগুলোর কৃত্রিম সংকট ও দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। আমরা কী ধরেই নিয়েছি, আমাদের নিজেদের অক্সিজেন নিজেদেরই কিনে বাঁচতে হবে? আর শুধু অক্সিজেন বাসায় কিনে রেখেই কী বাঁচা যাবে?
গত বছরের মার্চের শেষ নাগাদ দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি ও গণপরিবহন বন্ধ হওয়ার সময়ের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, কিছু ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক ও মানবিক ‘সততা’ ভুলে (যদিও এই ‘সততা’ আমাদের প্রায় পেশাতেই অনেকটা দুষ্প্রাপ্যই বটে) আকাশ-পাতাল মুনাফা করতে দ্বিধা করেননি, ঔষধ/মাস্ক/স্যানিটাইজার ইত্যাদি মানুষের বিপদের সুযোগে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ৭-৮ গুণ বাড়িয়ে বিক্রি করেছে দেদারসে, আবার তাঁদেরই কেউ কেউ হাসপাতালে গিয়ে যথাযথ চিকিৎসা সেবা না পেয়ে সেইসব হাসপাতাল বা চিকিৎসা না করানো চিকিৎসকদের ডাকাত, পাষাণসহ নানা অভিধায় ফেলে অভিসম্পাত দিয়েছেন। যদিও, আমরা আমাদের নিজেদের অবস্থানে সৎ ও নিষ্ঠাবান না হয়ে অন্যের কাছ হতে তা পূর্নমাত্রায় আশা করি।
পরিশেষে, বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেকটা একক নেতৃত্বে অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখে কোভিডের এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। দেশকে উত্তরোত্তর উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে তাঁর অঙ্গীকার এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। আমাদের প্রত্যাশা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অতিমারির আঁধার কেটে আলো আসবে।
লেখক : বিতার্কিক ও কলাম লেখক
নড়ষড়ংযধভরয়ঁব@মসধরষ.পড়স