বায়দূষণে মৃত্যু বাড়ছে করোনাকালে ঝুঁকি প্রবল

0
214

সুভাষ দে »

বাংলাদেশে বায়ুদূষণে মৃত্যু বাড়ছে। ২০১৯ সালে বায়ুদূষণজনিত রোগে বাংলাদেশে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বায়ুদূষণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অব কলাম্বিয়া ও হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউটের বিশ্ব বায়ু পরিস্থিতি ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বায়ুদূষণ পরিস্থিতি বিস্তারিতভাবে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বায়ুদূষণের কারণে ২০১৯ সালে বিশ্বে ৬৭ লাখ মানুষ মারা গেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া যাকে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বায়ুর অঞ্চল বলা হয়েছেÑ সে অঞ্চলে মৃত্যু ২১ লাখ। ভারতে ১৬ লাখ ৭০ হাজার, পাকিস্তানে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭০০, বাংলাদেশে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫০০ ও নেপালে ৪২ হাজার মানুষ মারা গেছে বায়ুদূষণে। (সূত্র : প্রথম আলো ২২ অক্টোবর-২০২০) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নেপালে বায়ুদূষণ দ্রুত বাড়ছে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে ভারত ও বাংলাদেশে। শীর্ষ দূষিত বায়ুর শহরের মধ্যে ঢাকাকে দেখানো হয়েছে তৃতীয় স্থানে। প্রতিবেদনে বায়ুদূষণে শিশুমৃত্যুর বিষয়ও উঠে এসেছে। বলা হয়, বাংলাদেশে প্রতিবছর শিশু মৃত্যুর ২০ শতাংশ ঘটে বায়ুদূষণজনিত নানা রোগে। এর মধ্যে আবার ৬২ শতাংশের মৃত্যু হয় ঘরের ভেতর দূষিত বায়ুর প্রভাবে।
বিশ্ব বায়ু পরিস্থিতির ওপর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান করোনা সংক্রমণ বায়ুর মানের কারণেÑদ্রুত হবে। আসন্ন শীতে দূষিত বাতাসে ভর করে করোনাভাইরাস সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে পারে। করোনা সংক্রমণ ও বায়ুদূষণ রোধ বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বায়ুদূষণের ক্রমাবনতির কারণে আসন্ন শীতে বাংলাদেশকে করোনা প্রতিরোধে সামগ্রিক প্রস্তুতি নিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ছাড়াও পরিবেশগত মান উন্নীত করতে বিশেষ করে বায়ুদূষণের জন্য যেসব কারণ দায়ী সে সবের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
নভেম্বরÑডিসেম্বর থেকে কয়েক মাস বায়ুর মান বেশি খারাপ থাকে। এই সময় দূষিত বস্তুকণা (পিএম ২.৫ ও পিএম ১০) বাতাসে ভর করে যেটি বর্ষাকালে এবং বাতাসের প্রবাহ বেশি থাকলে বেশি অবস্থান করতে পারে না। বায়ুবিষয়ক গবেষক ও ষ্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কামরুজ্জামান সংবাদ মাধ্যমে বলেন, শুধু ঢাকা শহর নয়, পুরো দেশের বায়ুর মানের দ্রুত অবনতি হচ্ছে। রাজধানীসহ বড় শহরগুলি রীতিমতো গ্যাস চেম্বারে পরিণত হচ্ছে।
অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, ও যত্রতত্র অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শহরতলীর ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণ ঘটছে। সেই সাথে রয়েছে শহরে বিভিন্ন সংস্থার খোঁড়াখুুঁড়ির কারণে প্রচ- ধুলাবালি।
অথচ নগর উন্নয়ন ও সেবায় যে সব সংস্থা জড়িত তারা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে উদাসীন। ধুলোবালি, গৃহস্থালি বর্জ্য, শুকনো বর্জ্য মাসের পর মাস পড়ে থাকে আর মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। শহরেÑনগরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়মিত করা, প্রতিদিন পানি ছিটানো আবশ্যক। এ কাজগুলি করা হয় না। করোনাকালে এ ধরণের অবহেলা বা উদাসীনতা আরও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে।
গ্রামাঞ্চলে বায়ু সাধারণত নির্মল থাকলেও কাঠ ও ঘুটি পুড়িয়ে রান্না করার কারণে বাড়ির পরিবেশ দূষিত হয়। গ্রামাঞ্চলে রান্নাঘরে বায়ু চলাচল যথাযথভাবে করতে পারে না। এই অবস্থায় রান্নাঘরে অবস্থান করা নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য বায়ুদূষণের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ থাকে। বায়ুদূষণের প্রধান কারণ ইটভাটা। বনাঞ্চলের কাঠ পোড়ানো, চিমনির কম উচ্চতা, গাছপালা ধ্বংস এসব কারণে জনবসতির পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। অনবরত কার্বন নিঃসরিত হচ্ছে নানাভাবে।
দূষিত বায়ুর কারণে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ফুসফুসের জটিলতা, হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগ ব্যাধিতে ভুগছে মানুষ। বনাঞ্চল ও গাছপালা নিয়মিত সংহারের কারণে সতেজ নিঃশ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। বায়ুদূষণ রোধে বাংলাদেশের নির্মল বায়ু আইন প্রণয়ন বিশ্ব বায়ু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে প্রশংসা পেয়েছে।
দেশে প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে অনেক ধরণের আইন রয়েছে কিন্তু এসবের কার্যকর প্রয়োগ খুবই কম। সকল জেলায় পরিবেশ আদালত নেই। চট্টগ্রাম, পার্বত্য জেলাসমূহ ও কক্সবাজারের পাহাড় বনাঞ্চলের নিয়মিত ধ্বংসসাধন চলছে। বনভূমি কমছে শিল্পায়ন ও নগরায়নের কারণে। বনভূমি উজাড় হলে বায়ুদূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। স্থানীয় প্রশাসন, চসিক কিংবা চউক পরিবেশ অধিদফতর এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার উচিত বায়ুদূষণ রোধে আইন অনুসারে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া। অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতে হবে যে কোনো মূল্যে; লোকালয়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এলাকায় ইটভাটা স্থাপনে অনুমতি দেওয়া যাবে না। শহরের রাস্তাগুলিতে নিয়মিত পানি ছিটাতে হবে। বর্জ্য অপসারণ তাৎক্ষণিকভাবে করতে হবে। নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত না রেখে ঢেকে রাখতে হবে। বৃক্ষরোপণকে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে অবশ্য করণীয় করে তুলতে হবে। রান্নাঘরে বায়ু চলাচলে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা চাই। বসতঘর বদ্ধ অবস্থায় রাখা চলবে না।
চট্টগ্রামসহ দেশের হাসপাতালগুলিতে বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা দিতে হবে ভাল করে। এ ব্যাপারে পরিসংখ্যান থাকা চাই। করোনাভাইরাসের সময় বায়ুদূষণ বেড়ে যাওয়া দুঃসংবাদ। বিশ্বজুড়ে বেশ কয়েকটি গবেষণায় বায়ুদূষণের সঙ্গে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নির্মাণ কাজের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী বিধিনিষেধ আরোপ এবং বাতাসে ধূলো ছড়াতে পারে এমন সব কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। প্রকাশ্যে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নগর ও জেলা প্রশাসনকে বায়ুদূষণজনিত ভয়াবহ পরিস্থিতিতে উদাসীন থাকলে চলবে না। দেশ এখন করোনা পরিস্থিতির মধ্যে, এই সময় বায়ুদূষণের উপাদানগুলি করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াবে। সুতরাং সকল প্রকার প্রতিকার ও সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যেমন ব্যক্তিকে তেমনি সকল পর্যায়ের প্রশাসনকেও দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে পরিবেশকে নির্মল ও সতেজ রাখা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে প্রাধান্য দিলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক