প্রযুক্তির কল্যাণে কৃষির নবজাগরণ, প্রয়োজন সরকারি সহযোগিতার

সভ্যতা ও উন্নয়নের আদি সোপান হলো কৃষি। বাঙালির অস্তিত্বের সাথে মিশে থাকা এই চিরচেনা কৃষি খাত আজ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একসময় লাঙল-জোয়াল আর প্রকৃতির মর্জির ওপর নির্ভরশীল কৃষি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন এবং আইওটি ডিভাইসের স্পর্শে আধুনিক ও স্মার্ট হয়ে উঠছে। এই নবজাগরণ কেবল শস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি টেকসই ও লাভজনক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে আমাদের পথ দেখাচ্ছে।

সম্প্রতি কৃষি বিভাগের করা সমীক্ষা বলছে, ২০০০ জন কৃষকের মধ্যে ৮২ শতাংশ পাওয়ার টিলার ব্যবহার করেন। ৫৬ শতাংশ কৃষক পাওয়ার সার, ৩১ শতাংশ রিপার, ১৭ শতাংশ কম্বাইন হারভেস্টার, ১২ শতাংশ কৃষক রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ব্যবহার করেন। ৯৮ শতাংশ কৃষকের মতে, কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের কারণে শস্য সংগ্রহে অপচয় কমেছে। ৯৮ শতাংশ কৃষক বলছেন, যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে আগের তুলনায় শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বি-এআরসি) তথ্য অনুযায়ী, এক বিঘা ধান কাটতে যেখানে শ্রমিক লাগে ১২-১৫ জন, কম্বাইন হার্ভেস্টার তা করে ফেলে মাত্র ২০-২৫ মিনিটে। যন্ত্রের ব্যবহারে উৎপাদন খরচও কমছে। কৃষিকাজে শ্রমিকরা আগ্রহ হারালেও দেশে ক্রমান্বয়ে খাদ্যের উৎপাদন বাড়ছে। উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় জনপ্রিয় হচ্ছে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, রিপার ও কম্বাইন হারভেস্টারের মতো বড় বড় কৃষি যন্ত্রপাতি। দেশে ছোট-বড় মিলে সার্বিক কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার ১২ হাজার কোটি টাকার।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে কায়িক শ্রমের যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি বেড়েছে কাজের গতি। ধান রোপণ থেকে শুরু করে কাটা ও মাড়াই—সবখানেই এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির জয়জয়কার। তবে প্রযুক্তির এই ছোঁয়া কেবল যান্ত্রিকীকরণেই থমকে নেই; যুক্ত হয়েছে ‘প্রিসিশন ফার্মিং’ বা নির্ভুল কৃষির ধারণা। স্যাটেলাইট ইমেজিং এবং সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে এখন মাটির আর্দ্রতা, পুষ্টিগুণ এবং ফসলের রোগের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে অনায়াসেই। এর ফলে সারের অপচয় রোধ হচ্ছে এবং ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
স্মার্ট কৃষির আরেকটি অভাবনীয় দিক হলো ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার। বিশাল ফসলের মাঠে ওপর থেকে ঔষধ ছিটানো বা ফসলের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা এখন মিনিটের ব্যাপার। এর পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকরা ঘরে বসেই আবহাওয়ার বার্তা এবং বাজারমূল্য জানতে পারছেন, যা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকের পকেটে নায্য মূল্য নিশ্চিত করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে খরা বা লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে বায়োটেকনোলজির অবদানও অপরিসীম।
তবে এই নবজাগরণকে সফল করতে হলে প্রযুক্তির সুফল প্রান্তিক কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি সাধারণ কৃষকের নাগালের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের পরিধি আরও বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপগুলোকে উৎসাহিত করা এবং গ্রাম পর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো শক্তিশালী করা সময়ের দাবি।প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষির এই রূপান্তর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ। প্রথাগত কৃষি থেকে আধুনিক ‘স্মার্ট কৃষি’তে উত্তরণের এই পথচলা যদি মসৃণ হয়, তবে আমাদের কৃষকরাই হবে আগামী দিনের সমৃদ্ধ অর্থনীতির মূল কারিগর। কৃষির এই নবজাগরণই হবে আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের অন্যতম প্রধান শক্তি।