টানা কয়েক মাস সহনীয় পর্যায়ে থাকার পর ব্রয়লার মুরগির বাজার আবারও ‘ডাবল সেঞ্চুরি’ হাঁকিয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ২০৫ টাকায় পৌঁছানো কেবল অস্বাভাবিক নয়, বরং সাধারণ ক্রেতাদের জন্য চরম অস্বস্তিকর। আমিষের সবচেয়ে সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে পরিচিত ব্রয়লার মুরগির এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের খাদ্যতালিকায় বড় ধরনের আঘাত।
বাজারে দাম বাড়ার নেপথ্যে বরাবরের মতোই একে অপরকে দোষারোপ করার পুরনো সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতারা দুষছেন পাইকারদের, পাইকাররা আঙ্গুল তুলছেন মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের দিকে, আর বড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও মুরগির ঘাটতির কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে উৎপাদন ব্যয় কি এতটাই বেড়েছে যে কেজিতে ৫০ টাকা বাড়াতে হবে? এই যুক্তি কোনোভাবেই সাধারণ ভোক্তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আমাদের দেশের পোল্ট্রি খাত মূলত মুষ্টিমেয় কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে। যখনই বাজারে কোনো পণ্যের চাহিদা বাড়ে বা সরবরাহে সামান্য হেরফের হয়, তখনই এই চক্রটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটতে শুরু করে। রেয়াজউদ্দিন বাজার বা বকসিরহাটের মতো বড় পাইকারি বাজারগুলোতে খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের ছুটির অজুহাতে পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয়েছে। এটি স্পষ্টতই একটি পরিকল্পিত কারসাজির ইঙ্গিত দেয়।
শুধুমাত্র ব্রয়লার নয়, সোনালি, পাকিস্তানি কক কিংবা দেশি মুরগির দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। ৩২০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত দরে মুরগি বিক্রি হওয়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার নামান্তর। পোল্ট্রি ফিড বা খাদ্যের দাম বাড়ার অজুহাত সব সময় দেওয়া হলেও, বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এই অস্থিরতাকে আরও উসকে দেয়।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেবল জেল-জরিমানা বা দায়সারা অভিযান যথেষ্ট নয়। পোল্ট্রি ফিডের আমদানিকারক থেকে শুরু করে বড় খামারি এবং পাইকারি আড়তদার—সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কেন হঠাৎ করে সরবরাহ কমল এবং এর পেছনে সিন্ডিকেটের কারসাজি আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। নিত্যপণ্যের বাজারের এই বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে জনমনে ক্ষোভ বাড়বে। সরকার ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অবিলম্বে সক্রিয় হতে হবে। পোল্ট্রি খাতের অদৃশ্য সুতো যারা নাড়াচাড়া করছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের প্রোটিনের শেষ আশ্রয়স্থলটিও সাধারণের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
মতামত সম্পাদকীয়



















































