পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ এখন

0
328

সুভাষ দে »

এক গভীরতর অসুখ এবং একই সাথে বিপন্ন বিস্ময়ে আক্রান্ত আমাদের পৃথিবী। অসুখটির নাম করোনা ভাইরাস, কোভিড-১৯। অচেনা এই রোগ কোনো অবয়বে ধরা যাচ্ছে না, প্রতিষেধকও আবিষ্কৃত হয়নি। এদিকে পৃথিবীর ২১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই ভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা ৭ লক্ষ ছাড়িয়েছে অনেক আগেই, আর আক্রান্ত। ধনী-গরিব, উন্নত অনুন্নত সব দেশেই ছোবল কোভিড-১৯ এর। এ কেমন অলৌকিক অসুখ গোটা বিশ্বকে তছনছ করে দিচ্ছে। রোগের সময় প্রিয়জন কাছে যেতে পারছে না, প্রিয়জনের মৃত্যুতে তার মুখটি দেখার সাধ্য নেই, হাসপাতাল থেকেই প্যাকেট বন্দি করে মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হচ্ছে অথবা সৎকার করা হচ্ছে। এ রকম ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেছে কি কেউ? এ কেমন সময়- প্রেমিকা তার প্রেমিকের হাত স্পর্শ করতে পারছে না। সন্তানদের বাবা-মার কাছ থেকে শর্তাতীত দূরত্বে অবস্থান করতে হচ্ছে। আমাদের দেশটিও এই ঘাতক রোগের কবলে।

করোনা ভাইরাস এখন কেবল রাষ্ট্রীয় নীতি বা একদেশীয় সামর্থের কোনো ব্যাপার নয় বরং এটি এখন আন্তরাষ্ট্রীয় বৈশ্বিক ব্যবস্থায়ও প্রভাব ফেলছে। বলা যায় বিশ্বায়নের দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পরিবর্তনেরও আভাস দিচ্ছে। বিশ্বের ধনী ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি গরিব ও অনুন্নত দেশগুলির সম্পদ লোটার জন্য যে যুদ্ধ উত্তেজনা, সংঘাত, ভ্রাতৃঘাতী হানাহানির মধ্যে নিক্ষেপ করেছে তাদের সমর কূটনীতি দিয়ে, এখন তারা নিজেরাই করোনার সামনে অসহায় বোধ করছে। সমর কৌশল আর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের মাপকাঠি আজ করোনার থাবায় ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়েছে। বিশ্বে কি নতুন ভাবনার দিন আসবে এই ভয়াবহ বিপত্তিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে? পাশ্চাত্য আর আমেরিকার কূটনীতি ও বাণিজ্য শ্রেষ্ঠত্বের দিন কি শেষ হয়ে আসছে, নাকি তারা আবার প্রবল বিক্রমে ক্ষতি সারবার পর ঝাঁপিয়ে পড়বে দেশে দেশে কে জানে?

করোনা মহামারির উদ্ভব প্রকৃতিতে, বিজ্ঞানীদের এই ধারণা আমরা শক্তিমদমত্ততার কারণে মানতে না চাইলেও বিজ্ঞানীদের তত্ত্ব বলছে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে তার স্বাভাবিক আবর্তন নিয়মে। মানুষ যেভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশের ধ্বংস সাধন করে ব্যক্তিগত, সুখ-সাচ্ছন্দ্য, মুনাফা তৈরি করছে, তাতে প্রকৃতিতে এক ধরনের শূন্যতা বিরাজ করার ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে। এটি মানবজাতির জন্য শুভ লক্ষণ নয়। প্রকৃতি কি তার এই পরিণতি তো নির্বিকার অবলোকন করে তার নিশ্চিহ্নকরণ দেখবে? মোটেই নয়, এবং সেটা প্রকৃতির ধর্মও নয়। আমরা যেভাবে পারমাণবিক পরীক্ষা চালাচ্ছি, রাসায়নিক যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করছে। জীবের বাস্তুসংস্থান, ইকোসিস্টেম ক্রমাগত ধ্বংস হচ্ছে। নদী, সমুদ্র, বায়ু, মাটি, পানির ভয়াবহ দূষণে মৃতদের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে পরিবেশ, তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের সর্বত্র। আর এখান থেকেই ব্যাপক ভাইরাস জন্ম নিচ্ছে। আজকের বিশ্বের প্রাণঘাতী রোগগুলির উৎপত্তি প্রাণী থেকেই; সার্স, ইবোলা, বার্ড ফ্লু, প্লেগসহ নানা ধরনের রোগ এবং সর্বশেষ কোভিড-১৯। এ সবগুলির মহামারি রূপ বিশ্ব দেখেছে।

গবেষকরা বলছেন, সম্প্রতি নয়, বছরের পর বছর ধরে করোনা ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেটিই এখন বৈশ্বিক সংকট। বিবর্তনমূলক পরিবর্তনের মাধ্যমে ভাইরাসটি এক সময় মানুষ থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ার শক্তি অর্জন করে যা মানুষের জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষক বা ভাইরাসের বিবর্তনমূলক অতীত নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানীদের প্রকাশ করা তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা করেন, এতে দেখা যায় অনেক বছর আগে ভাইরাসটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এটি চীনের উহানে প্রথম শনাক্ত করা হয়। (সূত্র: প্রথম আলো ৩১ মার্চ ২০২০)।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের (এন আই এইচ) পরিচালক চিকিৎসক ফ্রান্সিস কলিন্স বলেছেন, গবেষণার তথ্যমতে অনেক বছর আগেই করোনা ভাইরাস প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এর পর তা ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে মানুষের মধ্যে প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি হয়ে উঠে। কিছু দিন আগে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে কলিন্স আরো বলেছেন, বছরের পর বছর বা সম্ভবত দশকের পর দশক ক্রমান্বয়ে। (প্রথম দফা প্রতিরোধ চেষ্টায় মানুষ দুর্বল হয়েছে, মারা গেছে, নিমিষে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে করোনা ভাইরাস। মানুষ এখন প্রতিরোধের দ্বিতীয় পর্যায়ে। প্রতিরোধ এই বৈশ্বিক মহামারি একদিন হয়তো শেষ হবে, কিন্তু বিশ্বকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়ে।) প্রকৃতির ওপর মানুষের বিজয় নিশান চাপিয়ে দেয়ার পর আর অহংকার ভেঙে পড়ার পর। প্রতিষেধক ভ্যাকসিন, ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। মানুষের এই টিকে থাকার প্রয়াস সফল হবে নিশ্চয়ই। কিন্তু ট্রাজেডি থেকে কোনো ফলদায়ক সূচনাযজ্ঞ কি শুরু হবে!

এবার আমাদের দেশের কথায় আসি। বাংলাদেশ এখন করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে; সারা দেশে লকডাউন চলছে। সরকার প্রথমে অনেকটা অপ্রস্তুত থাকলেও তা এখন সারিয়ে নিচ্ছে। ফল ও পাচ্ছে কিছুটা। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী সশস্ত্রবাহিনী, পুলিশ-প্রশাসন এখন মানবতার সেবায়। এ এক অন্য রূপ তাদের। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরুণরা মানুসেষর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সীমিত সাহায্য নিয়ে। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরের মানসিকতা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে করোনা মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান খালেদা জিয়ার ৬ মাসের জন্য দ-াদেশ স্থগিত রেখে  জামিনে মুক্তি এই মুহূর্তে একটি শুভ ঘটনা।

করোনার দুর্যোগ বলে দিচ্ছে, প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশের সংহার নয় আর, সজীব বাংলাদেশ চাই। নতুন বাংলাদেশ চাই। যেখানে উন্নয়ন-অগ্রগতির সাফল্যের মূলকেন্দ্র থাকবে মানুষ। লোভ, মুনাফা, স্বার্থপরতা, বৈষম্যের সাতকাহন আর নয়। রোগে শোকে, বিপদে, বিপন্নতায় মানুষের জন্যেই সকল প্রচেষ্টা নিয়োজিত হোক।

যুদ্ধের অবসান হোক বিশ্বে, প্রকৃতি, পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর বিরূপ রূপান্তরের বিরুদ্ধে লড়াই হোক এক সাথে। মৈত্রী ও সহযোগিতায় রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সু-সম্পর্ক হোক; রাষ্ট্রের সকল উন্নয়ন চিন্তার কেন্দ্রে থাকুক মানুষ। করোনার ভয়াবহতা থেকে মুক্ত হয়ে শুভ আর কল্যাণের রেশ ছড়িয়ে পড়–ক সবখানে।

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন, ‘পৃথিবীর গভীর গভীরতর অসুখ এখন/ মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীর কাছে। এই গভীরতর অসুখ থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে সকল মানুষ মৈত্রী ও কল্যাণের হাতটি বাড়িয়ে দিন। কেননা আমাদের অশেষ ঋণ এই সুন্দর ও নির্মল পৃথিবীর কাছে। ধরিত্রীর আকাশ, মৃত্তিকা, বায়ু, জল, তৃণ, পশুপাখি, পাহাড়-নদী সর্বত্র অফুরন্ত সবুজ সমাহার। এর সকল কিছুই মানুষের সবল শ্বাস নেওয়ার উপকরণ। আসুন, ধরিত্রীর অসুখ সারিয়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই।

লেখক : সাংবাদিক