পুরনো বৃত্তে ফিরে গেল মিয়ানমার

0
116

রায়হান আহমেদ তপাদার »

মিয়ানমারের স্বাধীনতার নায়ক জেনারেল অং সানের মেয়ে অং সান সু চি। তার যখন দুই বছর বয়স তখন তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র দুই বছর পর এই হত্যাকা- ঘটেছিল। মিস সু চিকে একসময় মানবাধিকারের বাতিঘর বলা হত- যিনি একজন নীতিবান অধিকারকর্মী হিসেবে দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতায় থাকা নির্দয় সামরিক জেনারেলদের চ্যালেঞ্জ করতে নিজের স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন।১৯৯১ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরষ্কার দেয়া হয় এবং তাকে ‘ক্ষমতাহীনদের ক্ষমতার অনন্য উদাহরণ’ হিসেবে সম্বোধন করা হতো। তখনও তিনি গৃহবন্দিই ছিলেন।১৯৮৯ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে অন্তত ১৫ বছর বন্দি জীবন কাটিয়েছেন মিস সু চি।২০১৫ সালের নভেম্বরে ২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবার অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি এনএলডি’র নেতৃত্ব দেন এবং যাতে বড় ধরণের জয় পান তিনি। মিয়ানমারের সংবিধান অনুযায়ী তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি কারণ তার সন্তানেরা বাইরের দেশের নাগরিক। তবে ৭৫ বছর বয়সী সু চি একজন ডি ফ্যাক্টো নেতা হিসেবেই সুপরিচিত।তবে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তার নেতৃত্বকে দেশটিতে মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি হওয়া আচরণ দিয়েই বর্ণনা করা হয়।
দুই হাজার সতেরো সালে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ স্টেশনে প্রাণঘাতী হামলার পর রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতন শুরু হলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। তবে মিস সু চির সাবেক আন্তর্জাতিক সমর্থকরা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন যে, তিনি ধর্ষণ, হত্যা এবং সম্ভাব্য গণহত্যা রুখতে কোন পদক্ষেপ নেননি এবং ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর নিন্দা কিংবা তাদের নৃশংসতার মাত্রাও স্বীকার করেননি।প্রাথমিকভাবে অনেকেই তার পক্ষে যুক্তি দেয়ার চেষ্টা করে বলেছেন যে, তিনি একজন বাস্তববাদী রাজনীতিবিদ যিনি বহু-জাতি বিশ্বাসের সম্প্রদায়ভুক্ত একটি দেশ শাসন করছেন যার জটিল ইতিহাস রয়েছে।
তবে ২০১৯ সালে হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অনুষ্ঠিত শুনানিতে সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপের বিষয়ে তার নিজের স্বপক্ষে উপস্থাপিত যুক্তি মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পর তার আন্তর্জাতিক সুনাম বলতে তেমন কিছু অবশিষ্ট থাকে না। দেশের ভেতরে ‘দ্য লেডি’ নামে পরিচিত মিস সু চি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠদের কাছে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় যারা রোহিঙ্গাদের প্রতি তেমন সহানুভূতিশীল নয়। গত ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডি পার্টি ৮৩% আসন পায় যাকে মিস সু চির বেসামরিক সরকারের প্রতি সর্বসাধারণের অনুমোদন হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ২০১১ সালে সামরিক শাসন শেষ হওয়ার পর এটি দ্বিতীয় বার নির্বাচন ছিল মাত্র।তবে সামরিক বাহিনী নির্বাচনের ফলকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তারা সুপ্রিম কোর্টে দেশটির প্রেসিডেন্ট এবং ইলেক্টোরাল কমিশনের প্রধানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে।
সম্প্রতি সামরিক বাহিনী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তোলার পর থেকে সামরিক অভ্যুত্থানের শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। বিবিসির দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সংবাদদাতা জনাথান হেড জানিয়েছেন, যদিও গত সপ্তাহে সামরিক বাহিনী সংবিধান মেনে চলার অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছে তার পরও এটাকে পুরো মাত্রায় সামরিক অভ্যুত্থান বলেই মনে হচ্ছে। এক দশকেরও বেশি সময় আগে সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল।বিবিসির সংবাদদাতা বলছেন, সংবিধান অনুযায়ী সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা রয়েছে যার মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারে তারা। কিন্তু মিস সু চির মতো রাজনৈতিক নেতাকে আটক করার ঘটনা উস্কানিমূলক এবং খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এমন পদক্ষেপ তীব্র বাঁধার মুখে পড়বে। রাখাইন রাজ্যে নতুন করে ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর অধিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধাপরাধ সংঘটন’ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। নতুন এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে, ভিন্ন জাতির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী গেরিলা বাহিনীর সদস্যরা সেনাবাহিনীর হাতে ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার হওয়ার পাশাপাশি বিচার বহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আরাকান আর্মি বিদ্রোহীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসার পর ঐ অভিযান শুরু করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। মিয়ানমারের এই সেনা অভ্যুত্থান এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যে সেনাবাহিনী এতদিন অং সান সু চির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে পর্দার অন্তরালে থেকে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিল, হঠাৎ এমন কী ঘটল যে, সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা নিতে হবে? ক্ষমতার এই পরিবর্তনের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসবে কিনা? সেনাবাহিনীর এই ক্ষমতা গ্রহণ চীন ও ভারত কোন দৃষ্টিতে দেখবে?সেনাবাহিনী তাদের স্বার্থে সু চিকে ব্যবহার করেছিল।
কিন্তু তাতে করে মিয়ানমারের মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি। মূল সমস্যা হচ্ছে,মিয়ানমারের জাতিগত দ্বন্দ্বের একটা সমাধান। জাতিগতভাবে বিভক্ত মিয়ানমারের সশস্ত্র তথা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরনো। গেল পাঁচ বছর অং সান সু চি এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি এবং এর কোনো সমাধানও করেননি। এখন সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। তারাও এ সমস্যার সমাধান করবে না। আর জাতিগত দ্বন্দ্বের কোনো সমাধান দিতে পারবে না সেনাবাহিনী। প্রায় ১১ লাখ মিয়ানমারের নাগরিক (রোহিঙ্গা) এখন বাংলাদেশে আশিত জীবনযাপনের কারণে। এদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সেনাবাহিনীর কোনো লক্ষণীয় উদ্যোগও থাকবে না। জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন হয়েছিল সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরে আসবে না।
যে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষার জন্য অং সান সু চি বিশ্বব্যাপী এক সময় প্রশংসিত হয়েছিলেন এবং নোবেল শাািন্ত পুরস্কারও পেয়েছিলেন, তিনি গণতান্ত্রিক বিশ্বে একজন নিন্দনীয় ব্যক্তি। ব্যক্তিগত স্বার্থে তিনি গণহত্যার মতো বিষয়টি বারবার এড়িয়ে গেছেন।
ইতিহাস তাকে ক্ষমা করবে না। মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণ নতুন কিছু নয়। মিয়ানমারে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকেছে। আবারও পুরনো বৃত্তে ফিরে গেল মিয়ানমার। একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে চলে গেল দেশটি এখন। শেষ রক্ষা হলো না অং সান সু চির। গত ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হয়েছিলেন।
চলতি বছরের এক ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশন বসার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই সেনাবাহিনী সেখানে ক্ষমতা গ্রহণ করল। অং সান সু চি ছিলেন মিয়ানমারের শীর্ষ নেত্রী, স্টেট কাউন্সিলর। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন তার দল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির নেতা উইন মিনত। সেনাবাহিনীর হাতে অং সান সু চি, উইন মিনতসহ দলের শীর্ষ নেতারা সবাই বন্দি। কার্যত সেনাপ্রধান মিন আউং হল্লাইয়ং এখন প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
গত চার বছর অং সান সু চি সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটা ‘সখ্য’ তৈরি করে, সেনাবাহিনীর সব অপকর্মকে সমর্থন করে নিজে ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিলেন।
সেনাবাহিনী যখন ১১ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানকে রাখাইন থেকে উচ্ছেদ করল, রাখাইনে গণহত্যায় জড়িত হলো, তখন অং সান সু চি অত্যন্ত নগ্নভাবে সেনাবাহিনীকে সমর্থন জানিয়েছিলেন। এমনকি হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে সেনাবাহিনীর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন। রোহিঙ্গা গণহত্যা ও নির্যাতনের দায়ভার সু চি এড়াতে পারেন না। এ কারণে সু চি আন্তর্জাতিকভাবে নিন্দিত হয়েছেন। তার অনেক খেতাব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সারাবিশ্বই তার প্রতি ধিক্কার জানিয়েছিল। শুধু ক্ষমতার লোভে অং সান সু চি এতদিন ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু যে সেনাবাহিনীর সব অপকর্ম তিনি এতদিন সমর্থন করে এসেছিলেন, সেই সেনাবাহিনীই তাকে উৎখাত করল।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট
ৎধরযধহ৫৬৭@ুধযড়ড়.পড়স