পাহাড়ধস ট্র্যাজেডি আর নয়

0
197

আফছার উদ্দিন লিটন »

চট্টগ্রাম শহর পাহাড় ঘেরা প্রকৃতি নিয়ে সজ্জিত। সমগ্র চট্টগ্রাম এক সময় পাহাড় দ্বারা আবৃত ছিল। কালের পরিক্রমায় জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে শহরের বন-জঙ্গল ও পাহাড় কেটে সমান করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে দেশে পাহাড় থাকবে কিনা তা বলা মুশকিল।
সবুজ-শ্যামল এই বাংলাদেশে যদি কখনো অপরিকল্পিত আবাসন গড়তে পাহাড় শূন্য হয়, তাহলে দেশে ভয়াবহ পরিবেশ ও প্রতিবেশের বিপর্যয় ঘটবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে আমাদের আগামী প্রজন্মের উপর।
চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়েই এখন ভূমিদস্যুদের লোভাতুর দৃষ্টি রয়েছে। পাহাড় কাটা নিষিদ্ধ করে আইন প্রণয়ন করা হলেও থেমে নেই পাহাড় কাটা। পাহাড় কেটে ক্ষত-বিক্ষত করে রাখে ভূমিদস্যুরা। ফলে দেশে পাহাড় ধসের ঘটনা এখন একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাহাড় ধস ট্র্যাজেডি ঃ প্রতি বছর পাহাড় ধসে অগণিত মানুষের মৃত্যু হওয়ায় এটি এখন ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১১জুন চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হয়েছিল। ২০০৮ সালে ১৪ জন, ২০০৯ সালে ৩ জন, ২০১০ সালে ৩ জন, ২০১১ সালে ১৭ জন, ২০১২ সালে ২৮ জন, ২০১৩ সালে ২ জন, ২০১৪ সালে ১ জন, ২০১৫ সালে ৬ জন, ২০১৬ সালে নগরীতে কেউ মারা না গেলেও সে বছরের ১৩ জুন রাঙ্গুনিয়া ও চন্দনাইশে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালে পাঁচ জেলায় পাহাড় ধসে ১৬৩ জনের মৃত্যু হয়।
রাঙ্গামাটি পাহাড় ধস ট্র্র্যাজেডি: চট্টগ্রামে ১১ বছরে ঝরে গেছে ২৪০টি প্রাণ। বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী চার দশকে চট্টগ্রামে ৫শ’র বেশি মানুষের মৃত্যু হয় পাহাড়ের মাটি চাপায়। ২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন ভারি বর্ষণের কারণে রাঙ্গামাটিতে ব্যাপক পাহাড় ধস হয়।
একই দিনে খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামেও ভারি বৃষ্টিপাত হয়। ওই দুই দিনে পাহাড় ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অভাবের তাড়নায় ছুটে আসা উদ্বাস্তু ও নি¤œআয়ের লোকেরা সাধারণত এসব ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্বল্প আয়ের এসব লোক না পারে ভালো কিছু খেতে, না পারে কিছু করতে। মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও করতে পারে না। অভাবের কারণে তাঁদের অনেক স্বাদ-আহ্লাদ অপূর্ণ থেকে যায়।
নগরীর যেখানে পাহাড় এবং পাহাড়ের পাদদেশে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দেখা যায় সেইসব এলাকায় লক্ষাধিক লোকের বসবাস রয়েছে।
প্রতি বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি এবং ভারি বর্ষণের কারণে পাহাড় ধস হয়। যত্রতত্র ভাবে পাহাড়ে বসবাস এবং অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে পাহাড় ধস হয়। পাহাড়ি বনাঞ্চল ধ্বংস করার কারণেও পাহাড়ধস হয়ে থাকে।
পাহাড় ধসের জন্য দায়ি কারা ঃ পাহাড় ধসের জন্য মূলত: ভূমিদস্যুরা প্রধানত দায়ি। ভূমিদস্যুরা ভূমিলোভী। সাধারণত যে সরকার ক্ষমতায় থাকে সে দলের হয়ে থাকে। এরা ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পেশি শক্তি দিয়ে পাহাড়ের জায়গা দখল করে। প্রতি বছরই ভারি বর্ষণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে।
এ যেন একটি নিত্য নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এত পাহাড় ধস ও প্রাণহাণির পরও সরকারের পক্ষ থেকে এর যথাযথ প্রতিকার দেখা যাচ্ছে না।
পাহাড় ধস প্রতিরোধের উপায় ঃ পাহাড় ধস প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন খুবই জরুরি। পাহাড়ধস ও পাহাড় ধসের প্রাণহানি প্রতিরোধ করতে হলে পাহাড় রক্ষার ব্যাপারে সরকারের কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে।
পাহাড় কাটা প্রতিরোধের জন্য সঠিক পদক্ষেপ ও সময়োপযোগী নীতিমালা অবিলম্বে প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সে সাথে পাহাড়ের অবৈধ দখলদার, ভূমিদস্যুসহ পাহাড় কাটার সাথে জড়িত ও সহযোগিতাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
বর্ষার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর যেখানে যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে ঘনবসতি রয়েছে চসিক ও চউক থেকে বিশেষ নজরদারি ও তদারকি করা প্রয়োজন। যৌক্তিক কারণ ছাড়া পাহাড়ধসে না।
যে কারণে পাহাড় ধসে সে কারণটি খতিয়ে বের করলে পাহাড় ধস প্রতিরোধ করা সম্ভব। কাজেই পাহাড়ধস প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে বৃষ্টির সময় পাহাড়ের বালিগুলো ড্রেনে নেমে আসে এবং পলি জমাতে ড্রেনের স্বাভাবিক প্রবাহব্যাহত হয় যার ফলে নগরীতে জলাবদ্ধতা চরম আকারে দেখা দিচ্ছে।
পাহাড় কাটার ফলে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।
পাহাড় কাটার কারণে বৃষ্টির সময় ঝরে যাওয়া বালুগুলো বৃষ্টির সাথে নালা-নর্দমায় চলে আসে, ফলে নালা-নর্দমার পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে না পারায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়। যা জনগণের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রকৌশলী প্রফেসর মোজাম্মেল হক চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর বিষয়ে একটি বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনা করেছিলেন।
তাঁর মতে, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলি রক্ষা ও নিরাপদ করে তোলা খুব একটি কঠিন কাজ নয়। যে কারণে পাহাড় ধসে সে কারণটি খতিয়ে বের করলে পাহাড় ধস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, পাহাড় সংরক্ষণ অতীব জরুরি। প্রকৃতিপ্রদত্ত এই জাতীয় সম্পদ রক্ষার্থে জনসাধারণকে এখন থেকে ভাবা উচিত। পাহাড় থাকলে বনাঞ্চল থাকবে। পাহাড় বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক
ধভংধৎঁফফরহ৪৮১২@মসধরষ.পড়স