পাহাড়তলী রেল দপ্তরে অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা না কি অবহেলা

চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ড আমাদের রাষ্ট্রীয় সম্পদের এক চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। গভীর রাতে ‘পি-টু’ শাখায় সূত্রপাত হওয়া এই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে রেলের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি সাধারণ অগ্নিকাণ্ড মনে হলেও, ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং দপ্তরের তথাকথিত ‘আধুনিক’ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার শোচনীয় ব্যর্থতা জনমনে গভীর সংশয় ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
একটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা কেপিআই জোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা নড়বড়ে হতে পারে, পাহাড়তলীর এই ঘটনা তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু বিপদের মুহূর্তে পাহারারত আরএনবি সদস্যরা যখন সারিবদ্ধভাবে রাখা ‘ফায়ার এক্সটিংগুইশার’ বা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রগুলো ব্যবহারের চেষ্টা করেন, তখন একটিও কাজ করেনি। এটি কেবল কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়। প্রশ্ন জাগে, এই যন্ত্রগুলো নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হতো কি না? কোটি টাকার সরঞ্জাম যদি সংকটে অকেজো পড়ে থাকে, তবে সেই বিনিয়োগের সার্থকতা কোথায়?
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো অগ্নিকাণ্ডের সময় ও স্থান। গভীর রাতে যখন দপ্তরে লোকসমাগম থাকে না, ঠিক তখনই গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র রাখার কক্ষে আগুনের সূত্রপাত হওয়াটা নেহাত কাকতালীয় না-ও হতে পারে। অনেক সময় দপ্তরের অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ লোপাট করার জন্য ‘অগ্নিকাণ্ড’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার সংস্কৃতি আমাদের দেশে নতুন নয়। পাহাড়তলীর এই দপ্তরে কোটি কোটি টাকার মালামাল ও সরঞ্জাম কেনাবেচার হিসাব সংরক্ষিত থাকে। সেই ‘পি-টু’ শাখায় আগুন লাগা এবং নথিপত্র পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি কি কোনো অন্ধকার অধ্যায় আড়াল করার চেষ্টা? এই রহস্যের জট খোলা জরুরি।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে—এটি নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ। তবে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না অথবা প্রকৃত দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। আমরা চাই এবারের তদন্ত হোক স্বচ্ছ এবং প্রভাবমুক্ত। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামগুলো কেন অকেজো ছিল, কার অবহেলায় এই দশা হলো এবং আগুনের প্রকৃত উৎস কী ছিল—তা জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন।
পাহাড়তলীর এই ঘটনা থেকে রেলওয়েসহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা নেওয়া উচিত। শুধুমাত্র সরঞ্জাম কিনলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, সেগুলোর নিয়মিত মহড়া এবং কার্যকারিতা পরীক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নতুবা ‘রহস্যময়’ আগুনের লেলিহান শিখায় বারবার পুড়ে যাবে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস ও সম্পদ, আর আমরা কেবল তদন্ত কমিটির দীর্ঘসূত্রতার সাক্ষী হয়ে থাকব।
সরকারের কাছে আমাদের দাবি, তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক এবং রেলওয়ের সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা হোক।