নিরার পুতুলের বিয়ে

নূরনাহার নিপা »

আলো ঝলমল সুন্দর সকাল। কী যে ভালো লাগছে। নিরা ভাবছে অনেক সুন্দর সবুজে সবুজে ভরা অপরূপ প্রকৃতি। লাবন্যে ভরা বাংলাদেশ।
ইচ্ছে করে মেঘের পাহাড় পাড়ি দিয়ে চাঁদের বুকে ঘুরে বেড়ায়। চুক চুক করে দেখতে থাকে আকাশের বিশাল নীল। কত সুরে পাখিরা ডাকাডাকি করে, আর শিশির ভেজা সবুজ কচি দুর্বাঘাস দোলে। বড় বড় কচুপাতায় জল করে টলমল।
এই ফাঁকে কিছু শিউলি ফুল কুড়াবে নিরা।
রুজি আজ তার বন্ধুদের নিয়ে ওদের বাড়িতে টুকটুকিকে দেখতে আসবে। টুকটুকির এমন কী বিয়ের বয়স হলো!
মা নিরা কাছে টেনে মাথায় হাত বোলায়। মা বলে, ‘আজ কদিন দেখছি তোমার মন খারাপ। মুখটাও ফ্যাকাসে। বিষয়টা কী?’ নিরা বলে, ‘আগে টুকটুকির বিয়েটা হয়ে যাক, তারপর একদম মন দিয়েই পড়বো দেখে নিও।’
মা বলেন, ‘টুকটুকিটা কে?’
‘তুমি তো দেখছি সব ভুলে বসে আছো মা। আর কয়দিন পর আমার পুতুল টুকটুকির বিয়ে।’
‘ও আচ্ছা তাই? বিয়ে হচ্ছে কার সাথে ? বর কে?’
‘রুজির ছেলে, ছেলেটি বেশ সুন্দর স্মার্ট। অনেক পড়াশোনা জানা। তাই ওদের ডিমান্ড একটু বেশি। জানো মা, ঘটক ফাতেমা খালা যৌতুক চায়। দেখছো কি কাণ্ড? যৌতুক কেন দেবো? আমার টুকটুকি বা কম কিসে? টুকটুকির মতো এই পাড়ায় কয়জন মেয়ে আছে, বলো? রূপে গুণে অনন্যা টুকটুকি। বেশি যৌতুক চাইলে রুজিকে বলে দেবো মেয়ে বিয়ে দেবো না। আমি কিন্তু কোন যৌতুক দিতে পারবো না। আমি ইস্কুলের টিফিন থেকে কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছি। টুকটুকির বিয়েতে খরচ করবো বলে। অনেক ধুমধাম করে টুকটুকির বিয়ের আয়োজন করতে পারবো। আমি যা পারি উপহার দিবো, মেয়েটা আর শ্বশুর বাড়িতে ছোট হয়ে থাকবে না।’
মা অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নিরার মুখের দিকে। এতো কিছু মেয়েটা কীভাবে শিখলো? সত্যিই যেন নিরা বড় হয়ে গেল।
মায়ের চোখ দুটো টলমল করে, কবে নিরা বড় হবে।
পুতুল বিয়ে নিয়ে হইচই পড়ে গেছে চারপাশে। রুজি, রুনা, হাসিনা, শাহানা, শিল্পী, বকুল শামীম, ফেরদৌসী, সবাই টুকটুকিকে দেখে মুগ্ধ হলো। ফাতেমা খালা যৌতুকের কথা বলে।
নিরা বলে, ‘আমি যৌতুক দিয়েই টুকটুকির বিয়ে দেবো না।’
রুজি কিছুটা লজ্জায় পড়ে বললো, ‘আমি তো যৌতুক চাইনি। চেয়েছিলো ফাতেমা খালা।’
নিরা বলল, ‘সে তো তোমাদের ঘটক।’
রুজি বলে, ‘কী হয়েছে নিরা তোমার?’
‘কেনো মন খারাপ করে বসে আছো? আমাদের ভুল হয়ে গেছে। ফাতেমা খালা আর যৌতুক চাইবে না। আমি বলছি আর কোনো দিন কেউ যৌতুক চাইবে না।’
নিরা বলল, ‘এটা তো খুব ভালো কথা। তাহলে আর সমস্যা হবার কথা নয়। শুক্রবার সবার ইস্কুল বন্ধ, সেদিন বিয়ের আয়োজন করা হবে। ভরাপুকুর পাড়ে, অথবা বগারবিলে।’
শুক্রবার টুকটুকির বিয়ে। বরযাত্রী এলো। রাজপুত্র বেশে বর। বেলুন আর ফিতা দিয়েই দারুণ ভাবে সাজিয়েছে বগার বিলের আশপাশ। বড় মাদুর, চাদর, বিছিয়ে সবাই বসেছে। রুজি টুকটুকিকে সাজিয়েছে যেনো একেবারে লাল টুকটুকি পরি।
রুজি বলে, ‘বেশ, বেশ, দেখতে হবে না বউমাটা কার?’
নিরা বলে, ‘মেয়ে তো আমার। নিরা না হাসলেও অন্য সবাই হেসে উঠলো। এভাবেই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ হয়ে গেলো।’
রুজি নিরাকে বুকে জড়িয়ে বলে, ‘তোমার টুকটুকির খুব ভালো থাকবে, খুব যত্ন করবো চিন্তা করো না।’
টুকটুকির বিদায় হবার পর নিরার মনটা খারাপ হয়ে গেল। টুকটুকির ছাড়া কখনো একা থাকেনি। তার চোখ থেকে অশ্রু গড়াতে থাকল। নিরা মনে মনে ভাবল, এভাবে কি একদিন নিরারও বিয়ে হয়ে যাবে? নিরা ঘর থেকে বের হয়ে গেলে মাও কি এভাবে কষ্ট পাবে? এভাবে কাঁদবে? নিরা যতই ভাবে তার মাথাটা আউলা জাউলা হতে থাকে।
নিরা নিঃশ্চয় মাকে বলবে তাকে যেন টুকটুকির মতো কোথা ওর বিয়ে দেওয়া না হয়। মায়ের বুকফাটা কষ্ট সে কিছুতেই সহ্য করতে পারবে না।