শীতকাল এলেই গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আমেজ শুরু হয়। পিঠা-পুলি আর কাঁচা খেজুরের রস ছাড়া যেন বাঙালির শীত পূর্ণতা পায় না। কিন্তু এই তৃপ্তির স্বাদ যে জীবনের শেষ নিঃশ্বাসে পরিণত হতে পারে, তা আমরা অনেকেই ভুলে যাই। নিপাহ একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস, যার কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা বা প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। এই ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ‘ফ্লাইং ফক্স’ বা ফলখেকো বাদুড়।
গভীর রাতে যখন গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য হাঁড়ি পাতা হয়, তখন বাদুড় সেই রসে মুখ দেয় বা লালা ত্যাগ করে। এমনকি হাঁড়ির ওপর মলমূত্রও ত্যাগ করতে পারে। বাদুড় যদি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত থাকে, তবে সেই রস পান করার মাধ্যমে মানুষের দেহে অতি সহজেই ভাইরাসটি প্রবেশ করে। শুধু রস পান করাই নয়, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলেও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর হার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
নিপাহ ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে ‘কাঁচা রস’ পানের মোহ আমাদের ত্যাগ করতে হবে। অনেকেই মনে করেন, রস ছেঁকে নিলে বা পরিষ্কার করে নিলে তা নিরাপদ। এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। ভাইরাসের উপস্থিতি খালি চোখে বা সাধারণ ফিল্টারে দূর করা সম্ভব নয়। রসকে নিরাপদ করতে হলে তা অন্তত ৭০ থেকে ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফুটিয়ে নিতে হবে। ফুটানো রস বা তা থেকে তৈরি গুড় কিংবা পাটালি খাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি নেই।
সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হলেও তৃণমূল পর্যায়ে এখনো অসচেতনতা রয়ে গেছে। গ্রামবাংলার গাছিদের রসের হাঁড়ি ঢেকে রাখার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি (যেমন- স্যাপ স্কার্ট বা জাল ব্যবহার) গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। তবে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো কাঁচা রস পান করা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকা। এছাড়া আংশিক খাওয়া বা বাদুড়ে মুখ দেওয়া কোনো ফল গ্রহণ করা যাবে না।
শীতের আনন্দ যেন বিষাদে পরিণত না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, এক গ্লাস কাঁচা রস পানের ক্ষণিক তৃপ্তির চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। জনসচেতনতা এবং খাদ্যাভ্যাসে সামান্য পরিবর্তনই পারে আমাদের এই মরণঘাতী ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা করতে। আসুন, নিজে সচেতন হই এবং অন্যকেও সচেতন করি।
এ মুহূর্তের সংবাদ


















































