নারীপাচার চক্র গুঁড়িয়ে দিন : মামলা নিষ্পত্তি দ্রুত হওয়া প্রয়োজন

32

সাম্প্রতিক সময়ে নারী পাচারের যে সব ভয়াবহ ঘটনা গণমাধ্যমে এসেছে, তাতে দেশের বিবেকবান মানুষ শংকিত, শিহরিত ও উদ্বিগ্ন। এ নারকীয় অপরাধ সমাজ ও রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে, সমাজের সুস্থিরতা বিপন্ন হচ্ছে। পুলিশ কর্তৃক নারী পাচার চক্রের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। তাদের কাছ থেকে নারীদের নিগ্রহ, নির্যাতনের রোমহর্ষক বিবরণ আমাদের সমাজের এক চিরায়ত অভিশাপকেই উন্মোচিত করেছে। আন্তর্জাতিক নারী পাচার চক্রের নেটওয়ার্ক এখন দেশজুড়ে, নারী পাচারকারী সিন্ডিকেট গরিব অসহায়, ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী, শিশু ও কিশোরীদের নানা প্রলোভন, ফাঁদে ফেলে তাদের পাচার করছে বিভিন্ন দেশে। ভারতের বড় বড় শহরের যৌন পল্লীতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যৌনকর্মী হিসেবে তাদের বিক্রি করা হচ্ছে। নারী ও শিশু পাচার, নারী নিগ্রহ, নির্যাতন আমাদের সমাজের অমানবিক দিক নির্দেশ করছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণœ হচ্ছে, তেমনি তা আমাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চিত্রকে উপহাস করছে।
আধুনিক প্রযুক্তির বিশ্বে অনলাইনে পাচার কার্যক্রম অনেক বেশি সক্রিয় এবং শক্তিশালী। এটি অপরাধীদের অনেকটা নির্বিঘেœ তাদের অপকর্ম চালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিচ্ছে, এর ফাঁদে আটকে পড়ে আমাদের কিশোরী, তরুণী এবং গরিব পরিবারের নারীদের জীবন হয়ে উঠছে অভিশপ্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে নারী পাচার চক্র তাদের অপরাধকর্ম চালিয়ে যেতে পারছে কী করে? সম্প্রতি পাচারকারী দলের এক চক্র ভারতে ধরা পড়লে তাদের জবানবন্দিতে নারী পাচারের নানা তথ্য বেরিয়ে আসে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক তথ্যে জানা যায়, প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ হাজার নারী ও শিশু পাচার হয়, এশিয়ায় নারী পাচার ঘটনায় নেপালের পরই বাংলাদেশের স্থান।
নারী ও শিশু পাচারকারী চক্রের সদস্যরা মাঝে মাঝে ধরা পড়লেও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় বিচার বিলম্বিত হয়। অনেকে জামিনে বেরিয়েও আসে। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা থাকলেও মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। সূত্র মতে, এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৭৩৫টি মামলা হলেও নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৮১০টি। সমাজবিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিচার সম্পন্ন করে পাচারকারীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে নারী ও শিশু পাচার ঘটনা কমে আসবে। নারী পাচারের বিরুদ্ধে সরকারকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। পুলিশ প্রশাসনকে নজরদারি বাড়াতে হবে। সেই সাথে এ ধরণের ঘৃণ্য অপকর্মের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি। সমাজে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সুরক্ষা ও তাদের জীবন জীবিকা নিশ্চিত করতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। জনপ্রতিনিধি, সমাজের সচেতন অংশ, অভিভাবকদের যথার্থ ভূমিকা থাকা চাই। আন্তঃদেশীয় নারী পাচার রোধে ভারতের সাথে যৌথ কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিভাগীয় শহরে মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যক্রম ভার্চুয়ালি সচল করার কথাও বলছেন আইনবিদগণ।