ধর্ষণ রোধে চাই রাষ্ট্রীয় কঠোর পদক্ষেপ

0
308

এটিএম মোসলেহ উদ্দিন জাবেদ »

সাম্প্রতিক সময়ের একটি অন্যতম উদ্বেগজনক ও আলোচিত বিষয় হলো ধর্ষণ। গত ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে সিলেটের এম সি কলেজের ছাত্রাবাসে এক তরুণীকে ফিল্মিস্টাইলে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের একদল কর্মী। উক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পরেরদিন শাহপরান থানায় ৯ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন ধর্ষিতার স্বামী। ইতিমধ্যে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বেশিরভাগ আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে । স্বামীর সঙ্গে ওই তরুণী বেড়াতে বেরিয়েছিলেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়- পিতা-মাতার সামনে কন্যাকে ধর্ষণ, শিশুকন্যাকে ধর্ষণ, গৃহবধু ধর্ষণ, প্রতিবন্ধী নারীকে ধর্ষণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ধর্ষণ ইত্যাদি যেন এখন আমাদের সমাজে নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসব থেকে পরিত্রাণের জন্য এখন রাষ্ট্রকে কঠোর হওয়ার সময় এসে গেছে।
গত বছর ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি পরীক্ষা দিতে গেলে মাদ্রাসার অধ্যক্ষের ইন্ধনে কিছু চিহ্নিত দূর্বৃত্ত তার গায়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ওইদিন রাতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। গত ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে নুসরাত মারা যান। এর আগে গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা। এ মামলা তুলে নিতে চাপ দিতে থাকে দুর্বৃত্তরা। এতে নুসরাত ও তার পরিবার রাজি হয়নি। এর জের ধরেই এতবড় নৃশংস ঘটনা ঘটানো হয়। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিকিৎককের কাছে জবানবন্দি দেন নুসরাত। এই হত্যাকা-কে জায়েজ করার জন্য স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও পুলিশের ভূমিকা ছিল বিতর্কিত, নিন্দনীয় ও অগ্রহণযোগ্য। পরবর্তীতে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের তৎপরতায় অপরাধীরা গ্রেফতার হয়েছে ও এর দ্রুত বিচার হয়েছে। এর আগে ২০১১ সালে ঢাকা ভিকারুন্নেসা স্কুলের বসুন্ধরা শাখার শিক্ষক পরিমল জয়ধরের ধর্ষণের ঘটনা ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্তৃক যৌন নির্যাতনের বড় ঘটনা। যথাযথ বিচারের মাধ্যমে পরিমল জয়ধরের সাজা হয়েছে, যা এখন সে ভোগ করছে।
গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গণধর্ষণ ছিল ব্যাপক আলোচিত। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচিত ধর্ষণগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইলে চলন্ত বাসে গর্ণধর্ষণের পর তরুণী রূপাকে হত্যা, বরগুনার বেতাগী উপজেলার উত্তর করুণা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে শিক্ষিকাকে গণধর্ষণ, বগুড়ার তুফান কা-, বনানীর হোটেল রেইনট্রিতে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী ধর্ষণ ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু ধর্ষণ ও হত্যা উল্লেখযোগ্য। অবাক হলেও সত্যি, পবিত্র ঈদুল আযহার দিনেও ধর্ষকরা নিজেদের নিবৃত্ত রাখেনি। হাসপাতালে মাকে রেখে বাড়ি ফেরার পথে এক তরুণী গণধর্ষণের শিকার হয় পটুয়াখালীর বাউফলে। আবার এমন অনেক ধর্ষণের ঘটনা আছে, যেগুলো কখনোই প্রকাশিত হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, অপ্রকাশিত ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত ঘটনার বহু গুণ বেশি। সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এমন ঘটনা এখন আর আমাদের অজানা নয় যে, একবার ধর্ষণ করে তার ভিডিও রেকর্ড করে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণ করা, এমনকি দলবদ্ধ হয়ে পৈশাচিক উৎসবে মত্ত হওয়ার মতো পাশবিক প্রবৃত্তি।
ধর্ষণ হল যৌনতার একধরণের বিকৃত উপস্থাপন। এটি মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে আমাদের সমাজে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নারী এবং শিশু ধর্ষিত হচ্ছে। আবার ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ঘটছে। এর মধ্যে কিছু গণমাধ্যমে আসে, অনেকগুলো আবার খবরে আসে না। কারণ ধর্ষণের বেশিরভাগ ঘটনাই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। দু’একটি ঘটনা মিডিয়াতে এলে আমরা দু’চার কথা বলি। তারপর সবাই যার যার কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে যাই। এভাবে চলতে থাকলে সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধ ধ্বংস হওয়া নিশ্চিত। সম্প্রতি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, চলতি বছর শুধু জানুয়ারি মাসে দেশে ৫২টি ধর্ষণ, ২২টি গণধর্ষণ এবং ৫টি ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি আরো জানায় ২০১৮ সালে ৯৪২ টি ধর্ষণের ঘটনা হয়েছে সারাদেশে। লিখিত বক্তব্যে মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, ২০১৮ সালে ১৮২ জন নারী গণধর্ষণ, ৬৩ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা এবং ৬৯৭ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে সংগঠনটি জানিয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব, সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতার কারণে এসব ঘটনায় অপরাধীরা ধরা পড়ছে না।
ধর্ষণের মূল কারণগুলো হল নগ্নতা, অতৃপ্ত যৌন আকক্সক্ষা, বেহায়াপনা, অবাধ যৌনাচার, রাস্তার পাশে দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, ফুটপাতে অশ্লীল ছবি সম্বলিত উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্রপত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, চলচ্চিত্রে খলনায়ক কর্তৃক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের দৃশ্যের মাধ্যমে সমাজে রাস্তাঘাটে বাস্তবে ধর্ষণে উৎসাহ যোগান, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, টুয়েনটি প্লাস চ্যানেলে নীল ছবি প্রদর্শন ইত্যাদি কারণে আজ যুবসমাজের মধ্যে দিন দিন ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধর্ষণের আরো একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হচ্ছে বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও ছেলে-মেয়েকে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারে অভিভাবকদের উদাসীনতা।
একাকিত্ব বোধ, অক্ষমতাবোধ, রাগ, অপমানজনক অনুভূতি, হতাশা, ব্যর্থতা বা ব্যক্তিজীবনে কষ্ট, অপ্রাপ্তি এসব থাকলে ধর্ষণের আকাক্সক্ষা বৃদ্ধি পায়। সাইকোপ্যাথিক ব্যক্তিত্বের অধিকারী লোকেরা ধর্ষণ করে। ধারাবাহিক ধর্ষণের কারণও এটি। মাদকাসক্তি মানুষের স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ লোপ করে, এটিও ধর্ষণের আরেকটি কারণ। ক্ষমতাবান ব্যক্তি সুযোগ পেয়ে কোনো দুর্বল মেয়ে, শিশু বা ছেলের ওপর ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটায় ধর্ষণের মাধ্যমে। ধর্ষণের আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আইনের প্রতি মানুষের ভয় কম বা নেই। ২০১৩ সালে এক জরিপে দেখা গেছে যে, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন পুরুষ জীবনে অন্তত একবার কোনা নারীকে ধর্ষণ করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ পুরুষকেই কোনো আইনি ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ধর্ষণের জন্য মেয়েদের ছোট পোশাককেও দায়ী মনে করেন কেউ কেউ। আমার মতে নারীদের পোশাক মূল সমস্যা নয়। পুরুষের বিকৃত মানসিকতাই মূলত দায়ী। যদি নারীদের পোশাকই মূল সমস্যা হতো, তাহলে ছোট ছোট শিশুরা কেন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে? ছোট ছোট শিশুদেরতো পোশাকের কোনো সমস্যা নেই। ধর্ষক এখন আর শুধু দূরের কেউ না। কাছেরও অনেকে এ অপকর্মে যুক্ত। ফলে সহপাঠী, বন্ধু, সহকর্মী, ড্রাইভার ও সহকারী, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, পরিবারের নিকটজন, এমনকি আরও অনেকে এ তালিকাকে ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর করছে। এদের নিবৃত্ত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধিত-২০০৩)’, যেখানে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদ- (বিশেষ ক্ষেত্রে মৃত্যুদ-) ও অর্থদ-ের বিধান রাখা হয়েছে। নারীর অধিকার রক্ষায় সংবিধানের ২৮নং অনুচ্ছেদে বিশেষ ক্ষেত্রে নারীর অগ্রাধিকার প্রদানসহ রাষ্ট্র ও জন-জীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার লাভের বিষয়কে গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। সংবিধান ও জাতিসংঘের সিডও সনদের আলোকে তৈরি করা হয়েছে ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’। এতকিছুর পরও বন্ধ হচ্ছে না ধর্ষণ নামক এই মহামারি সামাজিক ব্যাধি।
ধর্ষণের প্রতিকারের বিষয়ে প্রথমে আমাদের পারিবারিক শিক্ষাকে বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবার থেকে আমরা সঠিক শিষ্টাচার ও মূল্যবোধের শিক্ষা পাই। পরিবারের মুরুব্বি ও কর্তাব্যক্তিদের সচেতন হতে হবে, ছোট সদস্যদের সচেতন করতে হবে। ছেলে-মেয়েদেরকে যথাসময়ে বিয়ের ব্যবস্থার বিষয়ে পরিবার থেকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবারের কোনো সদস্য এই ধরণের ঘটনার সাথে জড়িত থাকলে অপরাধ গোপন না করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ধর্ষণ রোধে চাই সরকারের কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ। ধর্ষণকারীর বিচার হতে হবে অতি দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক। ধর্ষণসহ যেকোনো অপরাধ করে যেন কেউ পার পেয়ে না যেতে পারে সে ব্যাপারে সচেষ্ট থাকতে হবে যাতে করে এই পাপ কাজটি করার আগে শতবার চিন্তা করে। অশ্লীল পত্রপত্রিকা ও বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করতে হবে। ধর্ষণ শুধু একটি ব্যাধি নয়, এটি দেশ ও জাতির জন্য অনেক বড় একটি অভিশাপ। এই অভিশাপের কালো অধ্যায় থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধর্ষণ নামক ব্যাধি ও অভিশাপ থেকে আমাদের সমাজ রক্ষা পেতে পারে বলে মনে করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক