দুবাই বসে আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন যুবলীগ ‘ক্যাডার’হেলাল আকবর বাবর!

হেলাল আকবর বাবর

রেল ঠিকাদারের ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রাডো গাড়ি আত্মসাত, থানায় জিডি

মোহাম্মদ রফিক :

২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরুর আগে দুবাই পাড়ি জমালেও সেখানে বসেই অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছেন ‘কথিত’ যুবলীগ নেতা এবং পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর। অভিযোগ আছে, দুবাই বসে চট্টগ্রামে রেলের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিসহ এখনও নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন বাবর।

২ সেপ্টেম্বর তার (বাবর) বিরুদ্ধে রেল ১ কোটি ২৬ লাখ টাকার প্রাডো গাড়ি আত্মসাতের অভিযোগে নগরীর সদরঘাট থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন শাহ আলম নামে রেলের এক ঠিকাদার। কয়েকদিন ব্যবহারের জন্য তার কাছ থেকে নেয়া বিলাসবহুল গাড়ি এবং পাওনা কোটি টাকা ফেরত চাওয়ায় শাহ আলমকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন বাবর। চট্টগ্রাম শহরে তার হয়ে কিছু অনুসারীরা শাহ আলমকে বিভিন্ন হুমকি-ধমকিও দিচ্ছেন।

জিডিতে শাহ আলম উল্লেখ করেন-ব্যবসায়িক কারণে বাবরের সাথে পরিচয় হয় তার। সে সুবাধে আর্থিক লেনদেন হয়। কয়েকদিনের জন্য তার (শাহ আলম) প্রাডো গাড়িটি নেন বাবর। কারাগারে অমিত মুহুরী খুন হওয়ার পর বাবর চলে যান দুবাইতে। শাহ আলম তার পাওনা টাকা ও গাড়ি ফেরত চাইলে হত্যার হুমকি-ধমকি দেন বাবর। গত কয়েকদিন দিন ধরে কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে এবং অখ্যাত কিছু নিউজ পোর্টালে শাহ আলমের বিরুদ্ধে অশ্লীল, কুরুচিপূর্ণ, মিথ্যা, বানোয়াট পোস্ট দিচ্ছে।

শাহ আলম অভিযোগ করেন, ২২ আগস্ট বিকেল ৫টায় তার বাসায় গিয়ে কিছু অপরিচিত লোক বাবরের সাথে বিরোধ মীমাংসা করে ফেলতে বলেন, না হলে তার (শাহ আলম) অনেক বড় ক্ষতি হবে বলেও হুমকি দিয়ে আসেন। পুলিশ জানায়, ফেসবুকের ওই আইডিগুলো পরিচালনা করেন হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, মাহমুদুল করিম, জে এইচ হামিদ হোসেন, লিটন চৌধুরী রিংকু, আনোয়ার পলাশ, জোবায়ের আলম আশিক, মনির ইসলাম, সাইদ আল জাবির, মো. সাইফুল ইসলাম রাজ, সাহিল মিহির ইমন।

এ প্রসঙ্গে সদরঘাট থানার ওসি এসএম ফজলুর রহমান ফারুকী বলেন, রেলের ঠিকাদার শাহ আলম থানায় একটি জিডি করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরুর আগে বাবর দুবাই পাড়ি জমান। কিন্তু এখনো তার হয়ে রেল পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের চাপ দিয়ে চাঁদাবাজি করছেন তার অনুসারী রানা, অজিত, লিটুসহ কয়েকজন। ভুক্তভোগীরা প্রাণভয়ে থানায় অভিযোগ না করায় কার্যকর ব্যবস্থাও নিতে পারছে না পুলিশ।

২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সন্ত্রাসী অসীম রায় বাবু নিহত হওয়ার পরপরই দুবাই চলে যান বাবর। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে ফিরে আসেন বাবর। ২০১৯ সালের ২৯ মে রাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী খুন হলে বাবর আবার বিদেশ চলে যান। দুবাইয়ে অবস্থান করলেও বাবরের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী তার হয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন শাহ আলম।

যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক  চৌধুরীর সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে বেপরোয়া হয়ে উঠে বাবর। রেল পূর্বাঞ্চলের প্রায় সব টেন্ডারে ১০ শতাংশ হারে কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে বাবরের বিরুদ্ধে। যুবলীগের প্রভাব খাটিয়ে রেলওয়ের জায়গাও লিজ নিয়েছিলেন বাবর। সম্প্রতি ওই জায়গাটি উদ্ধারও করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, বাবরের বিরুদ্ধে রাউজানের আকবর-মুরাদ হত্যা মামলা, বিএনপিকর্মী আজাদ হত্যা মামলা, মির্জা লেনে ডাবল মার্ডার, সিটি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা আশিককে গোলপাহাড় মোড়ে হত্যা, তামাকুমু-ি লেনে রাসেল হত্যা, এমইএস কলেজ থেকে ফরিদ নামের একজনকে ডেকে নিয়ে ষোলশহর ২ নম্বর গেটে হত্যা এবং সর্বশেষ ২০১৩ সালে সিআরবিতে রেলের টেন্ডার নিয়ে সংঘটিত জোড়া খুনের মামলা ছাড়াও এক ডজনেরও বেশি মামলা রয়েছে। পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলে বাবর ছিলেন নগর পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার এড়াতে বাবর পাড়ি জমান থাইল্যান্ডে। সেখানে গড়ে তোলেন হোটেল ব্যবসা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছর পর আবারও দেশে ফেরেন বাবর। পরে তিনি থাইল্যান্ডের ব্যবসা ছেড়ে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করেন।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে সিআরবিতে জোড়া খুনের ঘটনায় করা মামলায় ঢাকা থেকে বাবরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ডাবল মার্ডার মামলার আসামি হওয়ার পর যুবলীগের সদস্য পদ  থেকেও বাবরকে বহিষ্কার করা হয়। কয়েক মাস পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে  কারাগার থেকে বের হন বাবর।  গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব পরিচালনা না করলেও তার স্ত্রী জেসমিন আক্তারের নামে রয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক হিসাব। প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা না থাকলেও বাবর এখন শত কোটি টাকার মালিক। নন্দনকানন বৌদ্ধ মন্দির রোডে রয়েছে তার পাঁচতলা বাড়ি। ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ডি ব্লকের ২ নম্বর  রোডের (বড় মসজিদের পাশে) ২৩/১ নম্বরের বাড়ির চারতলায় রয়েছে ফ্ল্যাট। ঢাকার বনানীতে দুটি সাততলা বাড়ি। নন্দনকানন ২ নম্বর গলিতে তার স্ত্রীর নামে তিন হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং  স্টেশন রোডে একটি মদের বারসহ নামে-বেনামে রয়েছে  বেশ কয়েকটি গাড়িও।

এ ব্যাপারে সিএমপি কমিশনার মো. মাহবুবর রহমান বলেন, অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির দিনশেষ। অপরাধী যে দলেরই হোক। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। বাবরের অপরাধ কর্মকা-ের বিষয়েও খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’