দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা

124

রূপন কান্তি সেনগুপ্ত »

১৮৯৬ সালের ১৫ই নভেম্বর অতি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রণদা প্রসাদ সাহা। এই মহামনীষির মায়ের নাম কুমুদিনী দেবী এবং পিতার নাম দেবেন্দ্র নাথ সাহা পোদ্দার। সাভারের অদূরে শিমুলিয়ায় মামার বাড়িতে জন্ম হলেও পৈতৃক নিবাস ছিল টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে। মাত্র সাত বছর বয়সে রণদার চোখের সামনে মৃত সন্তান জন্ম দিয়ে মারাত্মক টিটেনাস রোগে ধুঁকতে ধুঁকতে বিনা চিকিৎসায় আর অবহেলায় মারা যায় তাঁর মা। শিশুকালেই মাতাকে হারান অতঃপর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। উচ্ছল শৈশব থমকে যায় মায়ের মৃত্যুতে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতা চলে যান। অচেনা-অজানা পরিবেশে পেটের তাগিদে জীবন বাঁচাতে কুলিগিরি, রিকশা চালানো, ফেরি করা, খবরের কাগজ বিক্রিসহ বিচিত্র ধরনের কাজ করেছেন রণদা। ১৯১৪ সালের ২৮ শে জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভারতের অসংখ্য তরুণদের মতো রণদাও নাম লেখান সেনাবাহিনীতে। তিনি যোগ দেন বাঙালিদের প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বেঙ্গল এ্যাম্বুলেন্স কোর’ এ। বেঙ্গল এ্যাম্বুলেন্স কোরে সাধারণ সেবকের বেশে রোগীর জন্য তাঁর অসাধারণ কর্মনিষ্ঠা, সেবাপরায়ণতা ও অসম সাহসিক নানা ঘটনা ইংল্যান্ডের রাজার দরবার পর্যন্ত পৌঁছালে রাজা পঞ্চম জর্জ রণদাকে ‘সোর্ড অব অনার’ উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন। এই সম্মান তার জীবনের প্রথম জয়মাল্য।
যুদ্ধের অবসান হলে যুবক রণদা নতুনভাবে জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতেন। সেনাবাহিনী ত্যাগ করে রেলওয়ে বিভাগের টিকিট কালেক্টরের চাকরি নেন। ১৯৩২ সালে এই চাকরি থেকেও স্বে”ছায় অবসর নেন। নিজের সঞ্চয় ও অবসরের এককালীন অর্থ দিয়ে শুরু করেন লবণ ও কয়লার ব্যবসা। প্রথম পর্যায়ে বিভিন্ন পরিবারে লবণ ও কয়লা সরবরাহ, পরবর্তীতে বিভিন্ন জাহাজে সরবরাহ করতেন। এতে তার ভাগ্যলক্ষী সুপ্রসন্ন হয়। তিনি বেশ কিছু অর্থের মালিক হন। সাথে সাথে শুরু হয় তার মানবসেবামূলক কর্মকা-। ১৯৩৮ সালে তাঁর পিতামহীর স্মরণে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন শোভাসুন্দরী দাতব্য ডিসপেনসারি। একই বছরেই তার প্রপিতামহী ভারতেশ্বরী দেবীর নামে একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করেন যা ১৯৪৫ সালে ভারতেশ^রী হোমস্ নামে বর্তমান স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪৪ সালে একটি মেটারনিটি ওয়ার্ড খোলার মাধ্যমে কুমুদিনী হাসপাতালের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়।
১৯৩৯ সালে জমিদার নৃপেন্দ্রনাথ চৌধুরী, ডা. বিধান চন্দ্র রায় সহ বেশকিছু বন্ধু ব্যবসায়ীদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বেঙ্গল রিভার সার্ভিস’ নামে একটি নৌ-পরিবহন কোম্পানি। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে অন্যান্য শরিকদের কাছ থেকে সব অংশ কিনে নিয়ে তিনি কোম্পানির একক মালিকানা লাভ করেন। তারপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া। এরপর নারায়ণগঞ্জে গড়ে তোলেন একটি ডকইয়ার্ড। ১৯৪০ সালে তিনি নারায়নগঞ্জের জর্জ অ্যান্ডারসনের যাবতীয় পাট ব্যবসা কিনে নেন। এভাবে যে কিশোর তার মাকে হারিয়েছে চিকিৎসার অর্থাভাবে, বড় হয়েছে চরম দারিদ্রের মধ্য দিয়ে, তিনিই হয়ে উঠেন দেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ীদের একজন, একজন ধনকুবের। ১৯৪৭ সালে রণদা তার সব ব্যবসা, কল-কারখানা, সম্পত্তি এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ পরিচালনার জন্য ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৪৭ সালে যখন ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ শুরু হয় তখন অসংখ্য মানুষ এই অঞ্চল থেকে দেশান্তরী হয়ে পশ্চিম বাংলায় চলে যান। কিন্তু সেই সময় কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্যের পাঠ চুকিয়ে সেখানকার অঢেল সম্পদের মায়া ত্যাগ করে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রনদা নিজের মাতৃভূমিতে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে শুভাকাঙ্খীরা রণদা প্রসাদ সাহাকে দেশত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মাতৃভূমি ছেড়ে তিনি কোথাও যেতে রাজি হননি। ১৯৭১ সালের ৭ মে পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগীরা মির্জাপুর থেকে রণদা প্রসাদ সাহা ও তাঁর ২৬ বছর বয়সী ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে ধরে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে।
১৯৪৪ সালে বৃটিশ সরকার কর্তৃক দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধে বিশেষ অবদানস্বরূপ রণদা প্রসাদ সাহাকে “রায় বাহাদুর” খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার সমাজসেবার জন্য তাঁকে ‘হেলাল-এ-পাকিস্তান’ খেতাব প্রদান করে। ১৯৭৮ সালে রণদা প্রসাদ সাহা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘স্বাধীনতা পুরষ্কার’ (মরণোত্তর) পান। সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার লাভ করে। বাংলাদেশ সরকারের ডাক বিভাগ ১৯৯১ সালে রণদা প্রসাদ স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করে।
আজ বাংলাদেশ তথা সারা উপমহাদেশের গৌরব মানবহিতৈষী, দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। মানুষের জন্য এই কৃতী বাঙালির অসামান্য অবদান বাঙালি আজীবন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত নানা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো যুগ থেকে যুগান্তরে এই বিশিষ্ট সমাজসেবীর স্মৃতি বহন করে চলবে। মৃত্যুবার্ষিকীর এই দিনে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই সমাজসেবার রূপকার আর পি সাহাকে।
লেখক : কলামিস্ট, সমাজকর্মী