তানাকার বাংলাভ্রমণ

0
70

কায়সার মোহাম্মদ ইসলাম :

গ্রামের সরুপথটা পেরোলেই বাসস্টেন্ড। আর বাসস্টেন্ডের পাশেই বড় বড় চার-চারটি দোকান। সবগুলো দোকানই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসে ভরপুর, সাথে আছে লিভার-ব্রাদার্সসহ, বড় বড় মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানির ত্বক মসৃণ করার ক্রিম, বিদেশি মধু, আটা-ময়দা, চাউল থেকে শুরু করে টয়লেট-টিস্যু। তবে আশেপাশে কোনো বইয়ের দোকান চোখে পড়ে না। বাসস্টেন্ড ধরে দক্ষিণ দিকে একশত গজ হাঁটলেই বড়বাজারের মোড়, ঐতিহ্যবাহী স্কুল, পোস্ট অফিস, কয়েক ডজন বইয়ের দোকান। সবকটি দোকানই কেবল পাঠ্যপুস্তকে ঠাসা; স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসার বইগুলো ঝুলছে প্রায় প্রতিটা দোকানির মাথার ওপর। তবে বেশির ভাগ বই-ই ইসলাম বিষয়ক। মৃত্যুর পরে মানুষ কোথায় যাবে? স্রষ্টা মানষুকে কেন সৃষ্টি করলেন?, বেহেস্তের চাবি, এ-ধরনের অনুমান নির্ভর বই-ই ৭০% দোকানের সেলফ জুড়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। তানাকা, গুরু-গম্ভীর ভাষায় লোকমানকে প্রশ্ন করে, তোমাদের এই মফস্বল শহরে কী রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন নিষিদ্ধ হয়ে গেছে চিরকালের জন্যে, লোকমান-সান? লোকমান হেসে বলে, তানাকা এটা কোবে নয়, এটা চট্টগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ মফস্বল শহর, হাটহাজারী। সুতরাং নামের পেছনে সান লাগানোটা বেমানান। তানাকা হেসে বলে, না না না, হঠাৎ করে মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছে। লোকমান তানাকাকে একটি বেনসন ধরিয়ে দেয়। তারপর দুই বন্ধু হাঁটতে থাকে গ্রামের পথ ধরে লোকমানদের বাড়ির উদ্দেশে। বাড়ির সামনেই বড় শ্বেতপাথরে লেখা ‘এখানে একদা কবিগুরু পদধূলি দিয়েছিলেন’। তানাকা পুরো শিলালিপিটা  শুদ্ধ উচ্চারণে লোকমানকে আবৃত্তি করে শোনায়। সেই ১৯৩০ সন! যখন আমার ঠাকুরমশায়, সম্রাটের একজন বিশ্বস্ত অনুচর ছিলেন। তানাকা পেছনে ফিরতেই দেখে প্রায় ২০-৩০ জন মানুষ তাদের ঘিরে ফিসফিস করছে। সেই সাথে কয়েক ডজন কাকও জুটেছে পুরনো বাড়ির দেয়ালে। সেকান্দর এসে তানাকার সাথে করমর্দন করে আর বলে, আমি লোকমানের চাচাতো ভাই, আমি একবার ব্যান্ডদল নিয়ে টোকিওতে শো করতে গিয়েছিলাম। তানাকা ভ্রƒ কুঁচকে ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে বলে, ইজ ইট ট্রু? তারপর লোকমানকে জাপানি ভাষায় প্রশ্ন করে, ওরা কি সেখানে জাপানি গান পরিবেশন করেছে? লোকমান তাকে বুঝিয়ে বলে, না আসলে তারা একটি বাঙালি কমিউনিটির আমন্ত্রণে জাপান ভ্রমণ করেছে। সেকান্দরের হাতে চা দেখে, তানাকা ভীষণ আনন্দ অনুভব করে। বাড়ির উঠোনেই সকালের নাশতা, সাথে তার প্রিয় বেলা বিস্কুট। তার এই বেলা বিস্কুটপ্রীতি দেখে বাড়ির ছেলেপুলেরা তাকে ঠাট্টা করে বেলা আংকেল বলেও সম্মোধন করে মাঝে মাঝে। চাপর্ব শেষ হতেই এক সাদা দাড়ি-গোঁফওয়ালা মানুষের উদয় ঘটে। তিনি তানাকার দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, আমি লোকমানের চাচা, বজলু। লোকমান মাথা নেড়ে সায় দেয়। দাড়িওয়ালা মানুষটা এবার অদ্ভুতভাবে তার পেছন থেকে একটি পুরনো স্পেনিশ গিটার বের করে আনে, প্রায় শূন্য থেকে। তারপর শুরু হয় গানের পালা, লোকমান একটা ডেকচি উল্টিয়ে তবলা বাজাতে থাকে, ‘এই মণিহার আমার নাহি সাজে … গানটি তানাকা জাপানে বসেই অনেকবার চর্চা করেছে। গেয়েছে রবীন্দ্রনাথের স্মরণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। কিন্তু বজলু চাচার পরিবেশনা কেমন জানি অন্যরকম। সবচেয়ে বড় কথা, তার গলাটা যতোটাই কম বলিষ্ঠ মনে হোক না কেন, তার চাইতে বড় কথা একটা মুনশিয়ানা তাঁর কন্ঠ ও বাজনায় ফুটে ওঠে। গান শেষে তানাকা তালি দিতে দিতে বলতে থাকে, দারুণ, দারুণ, অসাধারণ! এবার লোকমানের পালা। সে গাইতে থাকে একটি ফোকধাঁচের গান, ‘ছাইরা গেলাম মাটির পৃথিবী …। গানটি তানাকা অনেকবার শুনেছে লোকমানের মুখে। যখন তারা কোবের এক পানশালায় প্রতি রোববারই আড্ডায় মত্ত থাকতো আর সেকাই আর বিয়ার চলতো মধ্যরাত অবধি। তখন লোকমানকে তানাকার বাংলাদেশের রাজপুত্রই মনে হতো। চোখ-নাক ফিটফাট জামাকাপড় আর প্রথম দেখাতেই লোকমানের সাথে প্রেম ঘটে যায় তানাকার ছোট্ট বোন ওশিনের। তারপর তারা বিয়ে করলো, বাচ্চা হলো, বিয়ে ভাঙলো। সেই চিত্রগুলো ভাসতেই তানাকা হাসতে থাকে। তারপর লোকমানের কাছ থেকে আরেকটি বেনসন নিয়ে ধরিয়ে ফেলে চটপট। এবার সে লোকমানকে অনুরোধ করে কিছু পানীয়ের ব্যবস্থা করতে। লোকমান তাকে বুঝিয়ে বলে, পানীয় খেতে গেলে তাদের চট্টগ্রাম শহরে যেতে হবে। তানাকা হেসে বলে, এটা কি নজরুলের বাংলাদেশ, নাকি নব্য আফগানিস্তান! কথাটা শুনে সদ্য বেড়াতে আসা অতিথি মুজাফ্ফর লোকমানকে বলে, বল এটা আফগানিস্তানও নয়, এটা সৌদি আরব। আমাদের দেশের আইন-কানুন মানলে থাকতে বল, না হলে দেশে ফিরে যেতে বল। মুজাফ্ফরের চোখরাঙানো থ্র্যাটিং খেয়ে তানাকা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়, কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়ে। আর নার্ভাসনেস কমানোর জন্য সে আবদারের সুরে বলে ওঠে, আমাকে আরেক কাপ চা দাও, লোকমান। এভাবে চায়ের পর্ব আরও দীর্ঘায়িত হতে থাকে। বজলু চাচার গানও চলতে থাকে, না বুঝে তানাকা আবার চেঁচিয়ে বলে অসাধারণ চাচা!

সন্ধ্যা নামে, আজানের সাথে সাথে শুক্রবারের কোলাহলও থেমে যায়। বিদ্যুৎ চলে গেলে পুরো বাড়িটাই অন্ধকারে ডুবে যায়। বজলু চাচা গিটার নিয়ে লোকমানের ড্রয়িং-রুমে ঢুকে পড়ে, তারপর শুরু হয় চাচা-ভাতিজার আঞ্চলিক কথোপকথন। তানাকার আর কিছু করার ছিল না, বসে বসে ধোঁয়াটানা ছাড়া। আস্তে আস্তে সেও ঢলে পড়ে বিছানায়।

 

২.

ভোর ছয়টায় তানাকার ঘুম ভাঙে। গতরাতের সিগারেটের ধোঁয়া তার পেটে ক্ষুধার আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। সে পুরনো ফ্রিজটা খুলে দেখে, একটা মাত্র জুস অবশিষ্ট আছে সেখানে আর এই প্যাকেটজাত জুসগুলো তানাকার বড়ই অপছন্দের। সে গিলতে থাকে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও গেলে, যেভাবে সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও থেকে গেছে বাংলাদেশের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সে ক্যালেন্ডার দেখে বলে, আরও একুশ দিন! দক্ষিণের দরজায় চোখ ঘুরালেই লোকমানকে চোখে পড়ে তার, সে কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে শিশুর মতো। ওর উঠতে উঠতে দুপুর বারোটা বেজে যাবে। সে ভাবে বাংলাদেশের মানুষের সাথে বিছানা-বালিশের একটা বিশাল সম্পর্ক আছে। কারণ বেশির ভাগ মানুষই আরামপ্রিয়, ৮-১০ ঘণ্টা বিছানায় কাটানো তাদের জন্য মামুলি ব্যাপার। তাছাড়া আর কী-বা করার আছে? চাকরি-বাকরির সুযোগ তো প্রায় শূন্যের কোটায়, সে ভাবে। সে একটা বিষয় আবিষ্কার করে, এখানে মানুষেরা বিকেলটাকে উদযাপন করে না। বুজিং (সুরাপান) করে না। নাচতে জানলেও নাচার পরিবেশ পায় না। আর সবচেয়ে বড় কথা, ধর্মীয় বিধিনিষেধ। ধর্মীয় বিধিনিষেধের জন্য এই উর্বর দেশে রবীন্দ্র, নজরুল, লালনের মতন মহাপুরুষ জন্মালেও তাদের চর্চা আমজনতার মাঝে ছড়িয়ে পড়েনি। অথচ জাপানে রবীন্দ্র ও লালনকে নিয়ে কতই না মাতামাতি! তানাকা ভাবে, হয়তো এটাই ইসলামিক দেশগুলোর একটা বাস্তবরূপ। নিজ দেশের ঐতিহ্যকে ভুলে গিয়ে আরবের মরুভূমির ঐতিহ্যের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া। ভাবতে ভাবতে সে ধ্যানে বসে। ধ্যানে বসে সে ভাবে, এই ধ্যানে বসাটাও কিন্তু আমরা জাপানিরা শিখেছি এই উপমহাদেশ থেকে। আর এই বাংলাদেশ হচ্ছে উপমহাদেশের ছিঁটেফোটা।

 

৩.

বিকেল গড়িয়ে যায় বৃষ্টির ঝংকারে। ড্রয়িরুম থেকে জানালায় উঁকি দিলে কেবল এঁদো পুকুরটায় চোখে পড়ে তানাকার। এভাবে সাত-সাতটি দিন চলে যায়। এদিকে লোকমানের ঘুম থেকে উঠতে উঠতে প্রায়ই বিকেল গড়িয়ে যায়। তখন তানাকার আর কিছুই করার থাকে না, কেবল সিগারেট টানা ছাড়া। লোকমান বিছানা থেকে ওঠে। ঢুলে ঢুলে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে যায়। লুঙ্গিতে অনভ্যস্ত তানাকা কোনোভাবে কোমরে লুঙ্গিটা জড়িয়ে সোফা থেকে ওঠে। মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে মিস্টার আকিহিতোকে ফোন করে, আমি কী আগামী স্পেশাল ফ্লাইটে একটি সিট পাচ্ছি? কী বললেন, ব্যাংকক থেকে? কিন্তু ব্যাংককের সবকটি ফ্লাইটই তো এখন পুরোপুরি বন্ধ, ধন্যবাদ। লোকমান যখন ঘুম থেকে ওঠে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে তখন তানাকা সোফায় বসে মোবাইলে একটি জাপানি গান শুনছিল। এমন সময় ড্রয়িংরুমের জানালা দিয়ে কেউ যেনো ঢিল মারতে শুরু করে। একটা ঢিল সোজা গিয়ে আঘাত করে তানাকার মাথার পেছনে, সে মাইগড বলে ড্রয়িংরুমে শুয়ে পড়ে। ওদিকে কয়েকজন লোক এসে লোকমানকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করে আর বলতে থাকে আমাদের বসের ১০ লাখ টাকা কবে ফেরত দিবি? পুরো বাড়িতেই মানুষের জটলা। তানাকার আর কিছুই মনে নেই। হাসপাতালে যখন সেন্স ফেরে তখন প্রায় রাত নয়টা। কিন্তু তখনই সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি পেয়ে বসে ঘুমঘুম চোখে। আলাপ চলছিল লোকমানের দুই চাচা স¤পর্কীয় ভদ্রলোকের মাঝে। একজন বলছে, জানিস মবিন, তানাকা হচ্ছে ভিকটিম। শমসের লোকমানের কাছ থেকে টাকাটা আদায় করতে না পেরে এমন একটি সময়ে সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছে। মনির আহমেদ বলেন, সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে, তারা এখন তানাকার জন্য ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করছে। ব্যাপারটা তানাকা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়ে। সেটা দেখে মনির চাচা আর মবিন চাচা তানাকার কাছে ছুটে যায়, হ্যালো, তানাকা হাউ আর ইউ? মনির চাচার প্রশ্নে তানাকা একটি হাসি উপহার দিয়ে বলে, ফাইন। তারপর সে ইশারা দিয়ে বুঝিয়ে দেয়, সে চা খাবে। নার্সের পরামর্শে তানাকা চা-খাওয়ার ছাড়পত্র পেয়ে যায় আর সেই সুযোগে উপস্থিত সবাই চা পানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

(পরবর্তী কিস্তি আগামী সংখ্যায়)