তানাকার বাংলাভ্রমণ

127

কায়সার মোহাম্মদ ইসলাম :

(শেষাংশ)

লোকমানের বাড়িতে আজ বেশ বড় আয়োজন চলছে। তার এক বিখ্যাত আত্মীয়ের মেজবান। দলে দলে মানুষ আসছে আর যাচ্ছে। সাবাড় করছে একেকটা টেবিলভর্তি গরুর মাংস আর ভাত। শীতের রাত। তাই গরুর মাংসের চর্বি লেগে যেতে সময় লাগে না। তবুও তানাকা লোকমান আর তার বন্ধুদের সাথে খুব তৃপ্তির সাথে গরুর মাংস গিলছে। লোকমান বলে, তানাকা,  তোমার মনে আছে আমরা যে একবার কোবেতে গরুর মাংস দিয়ে এক বোতল রাম সাবাড় করেছিলাম? তানাকা হাসে। খুব বেশি হাসে। লোকমান বুঝতে পারে না, এই অট্টহাসির পেছনের গল্পটা কি? ড্রয়িংরুমে ফিরে তানাকা জাপান অ্যাম্বেসির কাছে একটা মেইল পাঠায়। রাত দুইটা নাগাদ জাপান অ্যাম্বেসিও ফিরতি উত্তর পাঠায়। তাতে লেখা : আমরা আমাদের নাগরিকদের জীবনরক্ষার জন্য যে কোনো পথ বেছে নিতে পারি। মেইলের শেষ দিকে লেখা আছে, আপনি যতো তাড়াতাড়ি পারেন, বাংলাদেশের পাঠ চুকিয়ে মাতৃভূমিতে ফিরে আসুন। আমরা হলি আর্টিজানের মতো আর কোনো জাপানি নাগরিককে হারাতে চাই না। এদিকে ছাদের বেলকনিতে লোকমান আর লোকমানের বন্ধুরা মদ্যপানে ব্যস্ত। তানাকাকে দেখে লোকমান ওঠে পড়ে আর বলে, এক পেগ চলবে? তানাকা সায় দেয়। আড্ডাটা থামে আজান দেওয়ার সাথে সাথে। বন্ধুরা সব ভোরের কাকের মতো বেরিয়ে পড়ে যে যার গন্তব্যে। তানাকা তাদের বিদায় জানায়।

 

৫.

যে বছর হলি আর্টিজানের ঘটনাটি ঘটেছিল, সে বছরই তানাকা বাংলাদেশ ভ্রমণের একটা ইনিশিয়েটিভ নিয়েছিল। কিন্তু সে বছর বাধ সেধেছিল তানাকার ভারতীয় প্রেমিকা কঙ্গনা। কঙ্গনা ছিল অতীব সুন্দরী এক গায়িকা। যে রবীন্দ্রভারতী থেকে ফোক আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর ডিগ্রি নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে সে তানাকার সাথে জাপান পাড়ি দিলেও তাদের সম্পর্কটা আর বিয়েতে গড়ায়নি। কিন্তু এখনও তাদের মাঝে চিঠি দেয়া-নেয়া ঘটে, ভিডিওতে আলাপ চলে। বিষয়গুলো লোকমানের জানা আছে। তানাকাকে দেখলে লোকমানের মনে প্রায়শই প্রশ্ন জাগে, মানুষ কিভাবে এতোটা ধীরলয়ের হতে পারে? লোকমানের এখনও মনে আছে, কঙ্গনার সাথে তানাকার যখন খুব বেশি মাখামাখি, তখনও অশিনের সাথে তার সম্পর্কটা গড়ে ওঠেনি। লোকমানের প্রথম সন্তান যখন অশিনের গর্ভে, তখন তো কঙ্গনা প্রায়ই অশিনের চুলগুলি আঁচড়ে দিতো, স্যুপ বানিয়ে দিতো। আজ লোকমানের সন্তানদেরও সন্তান হয়েছে আর তাদের মামা তানাকা এখনও প্রেম চালিয়ে যাচ্ছে কঙ্গনার সাথে। অন্যদিকে তানাকা ভাবে, মানুষ কিভাবে এত দ্রুত পাল্টাতে পারে? লোকমানকে দেখলে তার মনে হয়, মানুষটার জীবনে যা যা ঘটেছে, তা আমার জীবনে ঘটতে গেলে অন্তত এক হাজার বছর লেগে যাবে। লোকমান চা নিয়ে আসে, আর চোখ টিপে বলে ওঠে, কঙ্গনাকে বলবো কলকাতা থেকে সোজা এখানে চলে আসতে? এই এক ঘণ্টার পথমাত্র। তানাকা বাংলায় উত্তর দেয়, না না, সেটার জন্য তোমাকে মরিয়া হতে হবে না। আমি এমনিতেই ভালো আছি। ‘এমনিতেই ভালো আছি’Ñ কথাটা লোকমানের বেশ মনপুত হলো। আসলেই তানাকার দিকে তাকাতেই তার ফুজিয়ামা পবর্তমালার কথা মনে পড়ে যায়। মানুষটার উইজডম, বিজ্ঞতা সবকিছুই যেন লোকমানের ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা যেন ঠিক উল্টো দুটো মানুষ। একজন ধীর বরফশীতল নদী, আর একজন পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া জলধারা।

 

৬.

ভোর ৪টায় তানাকার ফোন আসে। এই পর্বে তার মা-বোন সবাই তাকে বাংলাদেশ ছেড়ে যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব জাপানে ফিরে আসতে বলে। এবং সবারই একই মত যে, এসব কিছুর জন্য দায়ী একমাত্র ঐ কুলাঙ্গারটাই অর্থাৎ লোকমান। ওশিন তো শুধু পারছিল না মোবাইল ফোনে লোকমানের গুষ্টি উদ্ধার করতে। কিন্তু তানাকা ঐসব গায়ে মাখে না। সে জানে লোকমান তার জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ এক মানুষ, বন্ধু। আর সে এটাও বোঝে, বন্ধুত্বে সব সময় একটা মিষ্টি দায়িত্ব থেকেই যায়। বন্ধুত্ব মানে তো দূরে সরে যাওয়া নয়। সে মনে মনে ভাবে, সে যদি লোকমানকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে মুজাফ্ফরের মতন এক হায়েনার কাছ থেকে মুক্ত করতে পারে তবে সেটাই হবে বন্ধু হিসেবে তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আর সাথে যদি আরও কিছু টাকা দিয়ে তাকে একটি ব্যবসায় সম্পৃক্ত করা যায় তবে সেটা হবে সোনায় সোহাগা। লোকমান তানাকাকে ছাদের বেলকনিতে ডেকে নিয়ে যায় আর বলে, বুঝলে, আজকে লিজা আর আমার ছোট ছেলেটা শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরবে আর সেই উপলক্ষে আমরা দূরে কোথাও বেড়াতে যাব। তানাকা মাথা নেড়ে সায় দেয়।

 

৭.

আজ সকাল সকাল নাশতার আয়োজন করা হয়েছে। লিজা ভাবির হাতের তৈরি আলুভাজি আর পরোটা খেয়ে তানাকার এতোটাই ভালো লাগলো যে, তার মনে হলো অনেকদিন পর গলার ভিতর সুস্বাদু কিছু ঢুকলো। ভাবির চলনে-বলনে তার ছোটবোন ওশিনের কিছু বৈশিষ্ট্য তার চোখে ধরা পড়ছিল বারবার। তাই সে বারবার ভুল করে তাকে ওশিন বলে সম্মোধন করতে শুরু করে। ব্যাপারটাকে লিজা ভাবি মিষ্টি হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিলেও, ভিতরে ভিতরে কিন্তু বেশ কষ্ট পেতে থাকে। তাই এক পর্যায়ে রাখঢাক না রেখে বলে ওঠে, লোকমানকে বলেন না, আবার ওশিনকে বউ হিসেবে ঘরে তুলে আনতে। সতীনের সাথে সংসার করতে আমার বেশ লাগবে! লোকমান ব্যাপারটা তানাকাকে ফিসফিস করে জাপানি ভাষায় বুঝিয়ে বলে। তানাকা হাতজোড় করে লিজাকে বলে, ভাবি আমি খুব দুঃখিত। লিজা হাসতে থাকে। তানাকা হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায়। তার সামনে কঙ্গনার বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলো ভেসে ওঠে সিনেমার মতো। তার খুব ইচ্ছে জাগে, কঙ্গনাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু মুহূর্তেই আবার নিজেকে সংযত করে ফেলে এই ভেবে যে, প্রেম মানে তো শুধু কাছে পাওয়া নয়, বরঞ্চ দূরে থাকার মাঝেও লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর অনুভূতি। সে মনে মনে ভাবে, এই আমি যে কঙ্গনাকে না পেয়ে দুঃখ অনুভব করছি, এটাও তো একটি দারুণ অনুভূতির ব্যাপার। লোকমান তানাকার হাতে চায়ের কাপ তুলে দিয়ে বলে, কি ভাবছো বন্ধু আজ? ‘বন্ধ’ু শব্দটা শুনে তানাকার হঠাৎ দারুণ লাগলো। সে হেসে বললো, কিচ্ছু না বন্ধু। এবার ‘বন্ধ’ু শব্দটা শুনতেই লোকমান তানাকাকে জড়িয়ে ধরলো। তারপর শুরু হলো তাদের জাপান জীবনের বন্ধুত্বের আলাপ। লিজা বলে উঠলো, আর কত শুনবো জাপানের কথা? কই আমাকে তো কেউ জাপান নিয়ে গেলো না? চা হাতে তানাকা বলে উঠলো, ভাবি আমি নিয়ে যাবো। তবে তার আগে আমি আমার বন্ধুকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবো। সে লোকমানের পিঠে হাত রেখে বলে, বন্ধু আমি তোমার জন্য দশ লাখ টাকা ম্যানেজ করেছি। তুমি মুজাফ্ফরের টাকাটা আমি চলে যাওয়ার আগেই পরিশোধ করে ফেলবে। তানাকার এই কথা শুনে লোকমান কাঁদতে শুরু করে আর বলে ওঠে, বন্ধু আজ বুঝলাম, বন্ধু মানে কী? তানাকার দৃষ্টি তখন দক্ষিণের বৃক্ষরাজির দিকে। সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে মিশে যাওয়ার সাথে সাথে তার চোখও অশ্রুতে ছলছল করে ওঠে। তানাকা চেয়ারেই ঘুমিয়ে পড়ে।

 

আজ শুভর দশম জন্মদিন। লিজা সকাল থেকে রান্নায় ব্যস্ত। ওদিকে সেকান্দর তার দলবল নিয়ে ড্রয়িংরুম সাজানোয় ব্যস্ত। কিন্তু লোকমান যে সেই সকাল ৮টায় বাজারে গেল, বিকেল ৪টায়ও সে বাজার নিয়ে ফিরলো না। অবশেষে লিজাকে এক রকম বাধ্য হয়েই জন্মদিনের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হলো। পুরো বাড়ি জুড়ে একটা গুমোট অবস্থা। তানাকা বসে বসে কেবল ঘড়ির টিকটিক শব্দই শুনছিল। এদিকে পুরো এলাকাজুড়ে একটা খবর নীরবেই ছড়িয়ে পড়েছে, লোকমানকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। লিজা ডাইনিং টেবিলে বসে লোকমানের ছবিটার ওপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার চোখের জল শুকিয়ে মুখে শুকনো নদীর সৃষ্টি করেছে। তানাকা বলে, ভাবি থানায় খবর দিয়েছেন? বলতে বলতেই তানাকার ফোনে একটি অচেনা নাম্বার ভেসে ওঠে, ফোন ধরতেই অন্য প্রান্ত থেকে লোকমান বলে ওঠে, বন্ধু, তুমি যেভাবেই পারো, আজ রাতের মধ্যেই ঢাকায় চলে যাও। জাপান অ্যাম্বেসিতে ঠাঁই নাও। ওরা আগামীকাল আমার বাড়িতে হানা দেবে। তানাকা ‘তুমি কোথায়’ বলার আগেই ফোন কেটে যায়।

সন্ধ্যা নাগাদ সেকান্দর, বজলু মিয়া আর অন্যান্যরা মিলে একটা ফন্দি আঁটে। বজুল চাচা বলে, যেহেতু তানাকার মাথায় লম্বা চুল, যা সে বেণী বানিয়ে প্রায়শই টুপির ভিতর লুকিয়ে রাখে। সুতরাং সুদর্শন তানাকাকে একজন সুন্দর রমণীতে রূপান্তর করতে বেশ সহজ হবে। তবে বেশ সাবধানতার সাথে পরিস্থিতি বুঝে তানাকাকে ঢাকা পাড়ি দিতে হবে। তোরা কে যাবি? লিজা বলে, আমি শুভকে সাথে নিয়ে যাবো। যেমন পরিকল্পনা, তেমন কাজ। লিজা, শুভ, তানাকা আর সেকান্দর ওঠে পড়ে রাতের ট্রেনে। লিজা ভাবির মুখে শত কান্নার মাঝেও হাসি লেগে আছে।  কারণ তানাকাকে তার এক অপরূপ সুন্দরী নারীর মতই মনে হচ্ছিল। আর ওদিকে তানাকা সারা পথে কেবল ঘেমেই চলছিল। মধ্যরাতে সে স্বপ্ন দেখছিল কঙ্গনাকে। কঙ্গনাকে সে যতো জড়িয়ে ধরতে যায়, ততই ঘুমন্ত কঙ্গনা যেন মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছিল …। স্বপ্ন ভেঙে সে স্বস্তির হাসি হাসে আর লিজাকে বলে ওঠে, ভাবি আমরা মনে হয় এই যাত্রায় পার পেয়ে গেলাম। যাক, লালনের আখড়ায় যেতে না পারলেও অন্তত বইমেলায় তো ঢুঁ মারা যাবে! তারপর ইচ্ছেমত বই কিনে জাপানে ফিরে যাবো।

সকাল ৬টায় ট্রেন যখন কমলাপুরে থামে, কুয়াশার আবছা আলোয় মিস্টার ওয়াতানাবাকে দেখতে পেয়ে তানাকা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। সে তার নারীর ছদ্মবেশ ধারণের ব্যাপারটাও ভুলে যায়। মিস্টার ওয়াতানাবা ফিসফিস করে কিছু একটা বলতেই দূর থেকে এক অপশরীর আবছায়া ভেসে ওঠে হিমশীতল হাওয়ার তীব্রতায়। দুহাতে তার কয়েক ডজন বইয়ের স্তূপ। তানাকা বলে ওঠে, কঙ্গনা, তুমি কি আমার সাথে জাপান যাবে? কঙ্গনা তানাকার হাতে হাত রেখে বলে, সেই বিশ বছর আগে আমি তোমার মাঝে দেখেছিলাম কেবল সৌন্দর্য, প্রেমিক এক যুবকের প্রতিচ্ছবি মাত্র। আর এখন দেখছি, একজন পরিপূর্ণ মানুষের পূর্ণ অবয়ব। চলো, আমরা এবার ঘর বাঁধি।