বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই সাশ্রয় করতে গিয়ে যখন কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবনকে আবারও অনলাইনমুখী করার পরিকল্পনা করা হয়, তখন তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পথ ধরে প্রাথমিক স্তরেও সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন এবং তিন দিন সশরীরে ক্লাস নেওয়ার একটি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলেও, শিক্ষার মান এবং শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা বাঞ্ছনীয়।
করোনা মহামারীর সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে বাধ্য হয়েই আমরা অনলাইন শিক্ষার ওপর নির্ভর করেছিলাম। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় ডিভাইসের সামনে বসে থাকায় শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনক হারে ‘স্ক্রিন অ্যাডিকশন’ বা ডিজিটাল আসক্তি তৈরি হয়েছে। অনেক শিশু পড়াশোনার চেয়ে গেম খেলা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে, যা থেকে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকরা আজও হিমশিম খাচ্ছেন। এই অবস্থায় নতুন করে অনলাইন ক্লাসের প্রবর্তন শিশুদের অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনলাইন ক্লাসের কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। মহানগরীগুলোতেও অনেক পরিবারের কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং প্রয়োজনীয় ডিভাইস নিশ্চিত করা বিলাসিতা। উপযুক্ত তদারকি ও ইন্টার্যাকশনের অভাব থাকায় অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই চিরাচরিত সংযোগ তৈরি হয় না। ফলে সশরীরে ক্লাসের তুলনায় অনলাইন ক্লাসের মাধ্যমে প্রকৃত শিখনফল অর্জিত হয় না বললেই চলে। বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরের শিশুদের জন্য হাতে-কলমে শিক্ষা এবং সহপাঠীদের সাথে সামাজিক মেলামেশা অত্যন্ত জরুরি, যা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অসম্ভব।
তদুপরি, করোনা ছিল একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, যেখানে ঘরে থাকা ছিল জীবন রক্ষার একমাত্র উপায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন সমস্যাটি অর্থনৈতিক ও ব্যবস্থাপনার। জ্বালানি সাশ্রয়ের বিকল্প অনেক পথ খোলা আছে। সরকারি কর্মকর্তাদের বিলাসিতা কমানো, অপচয় রোধ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে কঠোর শৃঙ্খলা বজায় রেখে বিপুল পরিমাণ সাশ্রয় সম্ভব। শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারকে কাটছাঁট করে এই সংকট মোকাবিলার চেষ্টা হিতে বিপরীত হতে পারে।
অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রস্তাবটি অত্যন্ত যৌক্তিক: যদি জ্বালানি সাশ্রয়ের স্বার্থে স্কুলের উপস্থিতি কমাতেই হয়, তবে অনলাইন ক্লাসের বোঝা না চাপিয়ে সশরীরে ক্লাসের সংখ্যা বা সময় কমিয়ে আনা যেতে পারে। সপ্তাহের পাঁচ দিনের পাঠ্যক্রম তিন বা চার দিনে সুসংগঠিতভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে যেমন যাতায়াত কমবে, তেমনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও হবে, আবার শিশুদের ডিভাইসের ক্ষতিকর প্রভাব থেকেও রক্ষা করা যাবে।
পরিশেষে, আমরা মনে করি, শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই এবং ডিজিটাল আসক্তির ঝুঁকি নিয়ে অনলাইন ক্লাস কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। সরকারের উচিত এই পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনা করা এবং মাঠপর্যায়ের শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। সংকটের সমাধান যেন নতুন কোনো সামাজিক ও মানসিক সংকটের জন্ম না দেয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
জ্বালানি সাশ্রয়ে অনলাইন ক্লাসের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা জরুরি
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।




















































