জেল হত্যার নেপথ্য নায়কদের চিহ্নিত করতে ট্রুথ কমিশন করুন

0
169

শঙ্কর প্রসাদ দে »

৩ নভেম্বর ১৯৭৫। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত রূপ নিয়েছিল। কী ঘটেছিল সেদিন? নতুন প্রজন্মের কাছে এখনো ঘটনাটি পরিষ্কার নয়। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। বঙ্গভবন আর ঢাকা সেনানিবাস ঘিরে ক্ষমতার যে নিয়ন্ত্রণ খেলা চলছিল তা বুঝতে আমারও সময় লেগেছে অন্তত দু’দশক। সেদিনের কুশীলব বিশেষত সেনা কর্মকর্তাদের বহু লেখালেখি ও বক্তব্য থেকে মোটামুটি ঘটনাপ্রবাহ উঠে আসছে। ৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কুশীলব লে. কর্নেল জাফর ইমাম, ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম, মেজর নাসির ও অন্যান্যদের সাক্ষ্য বলছে, সামরিক অভিধান ও রাজনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে ঐদিন ঘটনার শুরু বঙ্গভবন থেকে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মেজর ফারুক, মেজর রশীদ, মেজর ডালিম গং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গভবনের দখল নেয়। খন্দকার মোশতাক আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে বসিয়ে তারা রাষ্ট্র ও সেনা ব্যারাকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। আওয়ামী লীগের একদল নেতাকে নিয়ে খন্দকার মোশতাক যে মন্ত্রিসভা গঠন করে তার ওপরও ফারুক গংদের পুর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের সিভিল প্রশাসনের ওপর হত্যাকারীদের এই নিয়ন্ত্রণের উৎস ছিল মূলত ফারুকÑরশীদ গং এর বন্দুকের জোর। আর কিছু বিদেশি রাষ্ট্রের সমর্থন। তখন সেনাবাহিনীর সকল কর্মকা- মোশতাকের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করেছে ফারুক-রশীদ গং। ২৪ আগস্ট পর্যন্ত সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ মূলত পুতুলের ভূমিকা পালন করেছেন। ঐদিন শফিউল্লাহকে সরিয়ে সেনাপ্রধান করা হয় জেনারেল জিয়াকে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণে তিনিও মূলত ফারুকÑরশীদের সিদ্ধান্তই মোশতাকের মাধ্যমে পালন করছিলেন। জিয়া নিজেও অস্বস্তিতে ছিলেন। তিনি কালক্ষেপণ করছিলেন সময়ের অপেক্ষায়। কিন্তু খালেদ মোশাররফÑশাফায়াত জামিল পরিস্থিতি পরিবর্তনে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হন। জিয়াকে তারা রাজি করাতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবে অভ্যুত্থানের দিনক্ষণ স্থির হয় ২ নভেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ৩ নভেম্বর। বঙ্গভবনের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মেজার ইকবাল পরিকল্পনা মতো ৩ নভেম্বর সূর্য ওঠার আগেই তার ফোর্স নিয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করার সাথে শুরু হয় অভ্যুত্থান। মোশতাকÑফারুকÑরশীদÑডালিম গং বিপদ বুঝতে এক মুহূর্ত বিলম্ব করেনি। বঙ্গভবনে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে তারা বুঝতে পেরেছিল একটি শক্তিশালী প্রতিরোধের মুখে তারা অবরুদ্ধ।
৩ নভেম্বর সকালেই বিমান বাহিনীর অভিযান। বিমান বাহিনীর যুদ্ধ বিমান যখন বঙ্গভবনের ওপর চক্কর লাগালো তখন হত্যাকারীদের আত্মসমর্পণ করা ছাড়া বিকল্প থাকলো না। শুরু হল দরকষাকষি। এমন তথ্য উঠে এসেছে যে ঐ মুহূর্তে দেশি বিদেশি বহু শক্তি দেনদরবার শুরু করে যেন হত্যাকারীদের হত্যা না করে বিদেশ যাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এ দেশের স্বাধীনতার পেছনে যে সেনানায়ক যুগের পর যুগ বীরের ভূমিকায় পূজিত হবেন, তাঁর নাম ‘কে ফোর্স’ প্রধান খালেদ মোশাররফ। তিনি খুনিদের দেশত্যাগে রাজি হলেন। যদিও রক্ষীবাহিনী প্রধান কাজী নুরুজ্জামান রাজি হচ্ছিলেন না। তাঁর সোজা বক্তব্য ছিল হত্যাকারীদের নিয়ে বিমান উড়াল দিতেই তিনি ঐ বিমানকে ভূ-পাতিত করে হত্যাকারীদের শেষ করে দেবেন। খালেদ মোশাররফ রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন। বিমান উড়াল দিল থাইল্যান্ডের পথে। বিমান যাত্রীরা খুনি ফারুকÑরশীদÑডালিম গং। মেজর নাসিরের মতে, তাদের প্রথম ভুল ছিল জিয়াকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন না করে গৃহবন্দি করা। তাদের দ্বিতীয় ভুল ছিল খুনিদের দেশত্যাগের সুযোগ দেয়া। বঙ্গভবনের পতনের সাথে খুনিদের গ্রেফতার অথবা নিশ্চিহ্ন করা যেতো। খালেদের মতো সেনাপতি এমন ভুল করলেন যা তাঁর মৃত্যু অবধারিত করে তুলেছিলো। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে জীবিত রাখা বা বন্দি না করে পালিয়ে যাবার কোন নিয়ম আছে বলে কখনো শুনিনি। খালেদের তৃতীয় ভুল ছিল, তাৎক্ষণিকভাবে মোশতাককে নিশ্চিহ্ন অথবা বন্দি করা যা তিনি করেননি। খালেদের এই ৩টি ভুলের খেসারত তাৎক্ষণিকভাবে দিলেন ৩জন। খালেদ নিজে এবং অপর দু সেনানায়ক কর্নেল হুদা ও কর্নেল হায়দার।
ঢাকা গ্যারিসন থেকে একটি প্রতিরোধ আসছে এটা ফারুকÑরশীদ গং আঁচ করতে পেরেছিলেন। জেল হত্যা মামলার একজন জেল কর্মচারী সাক্ষ্যে বলেছেন, ঘটনার কয়েকদিন আগে সেনাবাহিনীর দু’তিন জন লোক কারাগারে প্রবেশ করে চার নেতার বন্দিকক্ষ ও আশপাশ রেকি করে গেছে। এ থেকে বোঝা যায় যদি পাল্টা অভ্যুত্থান হয় তবে মোশতাকÑফারুকÑরশীদ গংদের বদ্ধমূল ধারণা ছিল, তাদের হটিয়ে অভ্যুত্থানকারীরা তাজউদ্দীনসহ চার জাতীয় নেতাকে নিয়ে সরকার গঠন করবে। ভোররাতে তারা যখন দেখল তারা হেরে যাচ্ছে, তাৎক্ষণিকভাবে রিসালদার মোসলেউদ্দীনের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি গ্রুপকে পাঠিয়ে দেয়া হল কারাগারে। জেলার সশস্ত্র কাউকে ঢুকতে দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। কারা কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হাজির করা হল। খুনিরা বঙ্গভবনের সাথে কথা বলতে বলল। কারা প্রধান প্রেসিডেন্ট মোশতাককে ফোন করলেন।
মোশতাক মোসলেউদ্দীন গংদের ঢুকতে দিতে এবং তারা যা করতে চায় তা করতে দিতে নির্দেশ দিলেন। খুনিরা জেলে ঢুকলো। জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে নির্বিঘেœ চলে গেল। গোটা জাতি শরতের হিমেল আবেশে গভীর ঘুমে নিমজ্জিত। পৃথিবীর সমস্ত ন্যায়নীতি পরাস্ত হল প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কাছে। সেদিন এবং আজো অনেকে জেল হত্যাকারীরা কোন গ্রুপের ছিল, সে সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বুঝে উঠতে পারে না। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করে মোশতাক গং আত্মরক্ষা অথবা ক্ষমতায় টিকতে চেয়েছিল এবং এজন্যই চার নেতাকে হত্যা করেছে মর্মে মূল্যায়ন করেন অনেকে। এই মূল্যায়ন আংশিক, পরিপূর্ণ নয়।
চার নেতা হত্যার চক্রান্ত আগেই হয়েছিল। খুনি মোশতাকÑফারুকÑরশীদ গং পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল দেশকে পাকিস্তানি পথে ধাবিত করার যে পদক্ষেপ তারা নিয়েছে তা মুক্তিযুদ্ধ পন্থিরা মেনে নেবে না। পাকিস্তানি ধারা অক্ষুণœ রাখতে হলে চার নেতাকে হত্যার বিকল্প নেই। তাদেরকে যে মেরে ফেলা হবে তা তাজউদ্দীন বুঝতে পেরেছিলেন। জোহরা তাজউদ্দীন কারাগারে দেখা করতে গেলে তাজউদ্দীন সাহেব পরিষ্কারভাবে বলেছিলেন, তাদের মেরে ফেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ঐ সময় দ্বন্দ্ব উপস্থিত হয়েছিল পাকিস্তানি আদর্শ বনাম মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। জাতীয় নেতাদের হত্যা করার পেছনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিল এমন ধারণা অমূলক নয়। দুর্ভাগ্য জেলহত্যা মামলায় হত্যাকারীদের বিচার হলেও ঘটনার পেছনের কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচিত হয়নি। অবশ্য পৃথিবীর ইতিহাসে বেশিরভাগ প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের নেপথ্য কারণ বা নেপথ্য খেলোয়াড়দের মুখোশ উন্মোচিত হয় না। বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য নায়কদের মতোই জেল হত্যার নেপথ্য নায়কদের মুখোশও অন্ধকারেই রয়ে গেল। ট্রুথ কমিশন করে অন্ধকার থেকে এই সত্য বের করে আনতেই হবে।
৩ নভেম্বর মোশতাককে তাৎক্ষণিকভাবে উৎখাত না করে দু’দিন প্রেসিডেন্ট পদে রাখার কৌশলÑইতিহাস বলছেÑ ঠিক হয়নি। পদোন্নতি নিয়ে খালেদের সেনাপ্রধান হওয়ার দরকষাকষির কোন প্রয়োজন ছিল না। খালেদÑশাফায়াত অস্ত্রের জোরে বঙ্গভবন দখল করেছিল। অস্ত্রের জোরেই প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাপ্রধান হয়ে ক্ষমতা না নেয়ার হেতু আজো পরিষ্কার নয়। সামরিক অভ্যুত্থান রাষ্ট্রের সমস্ত শাখা প্রশাখার ওপর সামরিক কর্তৃত্ব জারি করে। অথচ খালেদÑশাফায়াত বিচারপতি সায়েমকে এনে রাষ্ট্রপতি বানালেন। এই ভালো মানুষি অভ্যুত্থানের ব্যাকরণের সাথে যায় না। এমন ভুলের খেসারত দিতে হলো গোটা জাতিকে। খালেদ টিকে গেলে জিয়াÑএরশাদের রাজনৈতিক আবির্ভাব হতো না। দেশ দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের জন্য পাকিস্তানি ধারায় নিক্ষিপ্ত হতো না। খালেদ টিকে গেলে বাংলাদেশ পরিণত হতো না নব্য পাকিস্তানে।
লেখক : আইনজীবী, কলামিস্ট