চতুরতার আশ্রয় নিচ্ছে মিয়ানমার জাতিসংঘের ভূমিকাও স্পষ্ট নয়

0
180

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। ওই সময় প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের মতে, এটি ছিল জাতিগত নির্মূল অভিযানের একটি আদর্শ উদাহরণ। সেই ঘটনায় এখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণহত্যা চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছে। তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বক্তব্য, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ওই নির্মূল অভিযান চালানো হয়েছিল। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি গ্রামের নাম কান কায়া। মূলত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ এই গ্রামের বাসিন্দা ছিল। তিন বছর আগে এই গ্রামটি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছিল দেশটির সেনাবাহিনী। ধ্বংসাবশেষও গুঁড়িয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত বছর এই গ্রামের নামও স্থানীয় মানচিত্র থেকে বাদ দিয়েছে মিয়ানমারের সরকার। জাতিসংঘ এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু কান কায়া নামের গ্রামটিই নয়। ২০১৭ সালে এমন আরও প্রায় ৪০০টি গ্রাম ধ্বংস করে দিয়েছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্যে তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে প্রায় এক ডজন গ্রামের নাম-পরিচয় মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। কান কায়া গ্রামটি আগে যেখানে ছিল, সেখানে এখন কয়েক ডজন সরকারি ও সামরিক ভবন দাঁড়িয়ে আছে। আছে পুলিশ ফাঁড়িও। গুগল আর্থ ও প্ল্যানেট ল্যাবস থেকে পাওয়া ছবিতে তাই দেখা গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে আরও বেশ কিছু রোহিঙ্গা গ্রামেরও একই পরিণতি হয়েছে। চলতি বছর জাতিসংঘের মানচিত্র তৈরির বিভাগ মিয়ানমারের যেসব মানচিত্র বানিয়েছে, তাতেও একই অবস্থা দেখা গেছে। জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমার সরকারের দেওয়া মানচিত্র থেকেই এগুলো তৈরি করা হয়েছে। সেসবে দেখা গেছে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রামগুলো এখন নামহীন এবং এগুলো মানচিত্রে চিহ্নিত করার কোনো উপায় নেই।

মানচিত্র থেকে গ্রামের নাম মুছে ফেলার বিষয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে মন্তব্য চাওয়া হয়েছিল। রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সরকারের পুনর্নির্মাণ কর্মসূচি দেখভাল করছে এই মন্ত্রণালয়। তবে গ্রামের নাম মুছে ফেলার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমার সরকারের একজন প্রতিনিধিও মন্তব্য দেওয়ার অনুরোধে সাড়া দেননি। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার দূত হিসেবে একসময় নিয়োজিত ছিলেন ইয়াংঘি লি। তিনি বলেন, সরকারিভাবে গ্রামের নাম মানচিত্র থেকে মুছে ফেলে রোহিঙ্গাদের ফিরে আসা বেশ কঠিন করে ফেলা হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে মানুষের মৌলিক পরিচয় মুছে ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনে লি আরও বলেন, জাতিসংঘও এই কাজে মিয়ানমার সরকারকে সঙ্গত দিয়েছে। এই কাজ যখন মিয়ানমারের সরকার করেছে, তখন জাতিসংঘ তাতে কোনো বাধা দেয়নি। লি বলেন, ‘কোনো নেতৃত্ব কখনো সরকারকে থামতে বলেনি। বলেনি যে, আমরা এটি করতে দেব না। খবরে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে জাতিসংঘের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গেও রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু কেন জাতিসংঘ আপত্তি তোলেনি সে বিষয়ে কেউ সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে চাননি।

গতকাল আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের (এআরএফ) ২৭তম বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, রাখাইনের আদি নিবাসে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করে না। তাই মিয়ানমারের সম্পর্কে রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট কমাতে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়ায় বেসামরিক লোকজনকে পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত করতে পারে। আসিয়ান, চীন, রাশিয়া, ভারত কিংবা পছন্দের যেকোনো বন্ধু দেশের নাগরিকদের মিয়ানমার যুক্ত করতে পারে।  বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ভার্চ্যুয়াল এ বৈঠকে অংশ নেন।

কথা হচ্ছে এভাবে আর কতদিন বাংলাদেশকে লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের বোঝা টানতে হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মিয়ানমার সিদ্ধান্তই নিয়ে নিয়েছে রোহিঙ্গাদের আর সে দেশে ফেরত না নেওয়ার। মিয়ানমারের চতুরতার কাছে বাংলাদেশের কূটনীতি বারবারই পরাস্থ হচ্ছে।