চট্টগ্রাম বন্দর : জাহাজ কেন গুদাম তার কারণ জানা দরকার

রোজাকে সামনে রেখে প্রতিবছরই দেশে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ে। পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, চলতি বছর সেই আমদানি অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে কারখানা ও গুদামে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে নদীপথে পণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত লাইটার জাহাজের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা গেছে, চলতি বছর সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে গম। বর্তমানে বন্দরে থাকা জাহাজগুলোর মধ্যে ২৫টি জাহাজে সাড়ে ১৩ লাখ টন গম এসেছে। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮০ হাজার টন ইতিমধ্যে খালাস করা হয়েছে।
এ ছাড়া ছোলা, মসুর ও মটর ডালবাহী ৭টি জাহাজে আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার টন পণ্য, যার মধ্যে এক লাখ টন খালাস হয়েছে। অপরদিকে ৯টি জাহাজে এসেছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার টন তৈলবীজ, যার মধ্যে আড়াই লাখ টন ইতিমধ্যে খালাস করা হয়েছে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন বড় জাহাজ থেকে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টন ভোগ্যপণ্য লাইটার জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে। পরে এসব লাইটার জাহাজ নদীপথে ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও দেশের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য পৌঁছে দিচ্ছে।
বন্দরসংশ্লিষ্টরা জানান, এবার ভোগ্যপণ্য আমদানিতে অনেক নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়েছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশের নিজস্ব গুদাম ও সংরক্ষণ সুবিধা পর্যাপ্ত নয়। ফলে বড় জাহাজ থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য ওঠানোর পর ঘাটে দ্রুত খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে লাইটার জাহাজগুলো দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে। একই সঙ্গে আমদানির পরিমাণ বাড়ায় লাইটার জাহাজের চাহিদাও বেড়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের গত মঙ্গলবারের তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙরে অবস্থানরত ১০৪টি পণ্যবাহী জাহাজের মধ্যে ৪৬টিতেই ভোগ্যপণ্য ছিল।

একটি কার্যকর সমাধান ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। প্রথমত, লাইটার জাহাজ বরাদ্দ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে যে প্রশাসনিক জটিলতা রয়েছে, তা নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। কোনো সিন্ডিকেট বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী যেন কৃত্রিম জাহাজ সংকট তৈরি করতে না পারে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।
​দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতের লাইটার জাহাজগুলো যেন পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে, সেজন্য অবকাঠামো ও জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। জাহাজ শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দাবিগুলো আলোচনার টেবিলে বসে দ্রুত সমাধান করা প্রয়োজন, যাতে পণ্য খালাসে কোনো কর্মবিরতির পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন অভিযান পরিচালনাকালে সাংবাদিকদের জানান, সাগরে বড় জাহাজ থেকে বোঝাই করার পর তিন দিনের বেশি অবস্থানের সুযোগ নেই। এখানে এক মাসের বেশি সময় ধরে তারা অবস্থান করছে। এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো আমদানিকারক যেন দিনের পর দিন লাইটার জাহাজে পণ্য রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারেন, সে জন্য এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
​সামনে উৎসব ও রমজান মাসের আগে বাজারে ভোগ্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাগরে ২৩ লাখ টন পণ্য আটকে থাকা মানেই হলো দেশের বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতার সুযোগ করে দেওয়া। আমরা মনে করি, এই সংকট কেবল বন্দর বা জাহাজ মালিকদের সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় ইস্যু। জনস্বার্থ রক্ষায় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে এই জট খুলতে হবে। সময় নষ্ট করার সুযোগ আর নেই; কারণ সাগরে অলস বসে থাকা প্রতিটি জাহাজ জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর ।