চট্টগ্রাম শহর একসময় পাহাড়, নদী আর অসংখ্য দিঘি-পুকুরের এক অনন্য প্রাকৃতিক মিতালি ছিল। কিন্তু গত চার দশকের পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে। গবেষণায় দেখা গেছে, আশির দশকের তুলনায় বন্দরনগরীতে অন্তত ৩ হাজার জলাধার চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। উন্নয়নের আগ্রাসি থাবা আর দখলদারিত্বের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এই জলাশয়গুলো কেবল পানির উৎস ছিল না, ছিল বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণের প্রধান আধার।
চট্টগ্রামের পরিবেশ বিপর্যয়ের এই করুণ দশার পেছনে রয়েছে পাহাড় কাটা ও জলাশয় ভরাটের এক অসম প্রতিযোগিতা। চার দশক আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় জলাধারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ হাজারের কাছাকাছি, যা বর্তমানে কমে মাত্র কয়েক হাজারে ঠেকেছে।
জলাধারগুলো ভরাট করে ফেলার ফলে বৃষ্টির পানি নামার জায়গা পাচ্ছে না। সামান্য বৃষ্টিতেই চকবাজার, আগ্রাবাদ বা বাকলিয়ার মতো এলাকাগুলো এখন ডুবন্ত শহরে পরিণত হয়। জলাশয় বা ‘ব্লু স্পেস’ কমে যাওয়ায় শহরের গড় তাপমাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। জলাশয়ের শীতলীকরণ ক্ষমতা না থাকায় শহরটি এখন একটি ‘হিট আইল্যান্ড’-এ পরিণত হয়েছে।
বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসকে এখন কয়েক মাইল দূর থেকে পানি টেনে আনতে হয়। পাড়ায় পাড়ায় পুকুর থাকলে এই জীবনঘাতী ঝুঁকি অনেকটাই কমত।
জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই পুকুর বা জলাশয় ভরাট করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ প্রশাসনের নাকের ডগাতেই হাউজিং সোসাইটি ও ব্যক্তি উদ্যোগে রাতের আঁধারে পুকুর ভরাট চলছে। অনেক ক্ষেত্রে সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের উদাসীনতা ও সমন্বয়হীনতাকে এই ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ী করা হয়। উন্নয়নের নামে প্রকৃতিকে বলি দেওয়ার এই সংস্কৃতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের সংকট তৈরি করছে।
চট্টগ্রামকে বাঁচাতে হলে কেবল মাস্টারপ্ল্যান করলে হবে না, প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। অবিলম্বে অবশিষ্ট জলাশয়গুলোর একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে সেগুলোকে সংরক্ষিত ঘোষণা করতে হবে।যেসব জলাধার অবৈধভাবে ভরাট করা হয়েছে, সেগুলো পুনঃখনন করে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নগরায়নের নকশায় ‘ওয়াটার রিটেনশন পন্ড’ বা পানি ধারণ এলাকা রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চট্টগ্রাম কেবল একটি বাণিজ্যিক রাজধানী নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য। ৩ হাজার জলাধার হারিয়ে আমরা যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছি, তার মাসুল দিচ্ছে পরবর্তী প্রজন্ম। প্রকৃতির সঙ্গে বৈরিতা করে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক সমাজ এখনই ঐক্যবদ্ধ না হলে, অদূর ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বসবাসের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
মতামত সম্পাদকীয়



















































