চট্টগ্রামের শিল্প ও গৃহস্থালি জীবনে বর্তমানে এক বিভীষিকার নাম গ্যাস সংকট। বন্দরনগরীর অলিগলি থেকে শুরু করে কালুরঘাট বা নাসিরাবাদ শিল্পাঞ্চল—সর্বত্রই হাহাকার। বিস্ময়কর ও দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, গ্রাহক নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি টাকা দিতে রাজি থাকলেও মিলছে না প্রয়োজনীয় গ্যাস। এই পরিস্থিতি কেবল জনভোগান্তিকে চরম পর্যায়ে নেয়নি, বরং দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীর অর্থনীতিকেও পঙ্গু করে দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামে গ্যাসের চাপ কম থাকার অভিযোগ ছিল। কিন্তু বর্তমানে তা স্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। গৃহিণীরা গভীর রাতে জেগে থাকছেন শুধু রান্নার আশায়, কারণ দিনের বেলা চুলা জ্বলে না। অনেক এলাকায় মাস শেষে বিল পরিশোধ করেও মানুষ হোটেলে খেয়ে বা মাটির চুলায় রান্না করে দিন পার করছে। অন্যদিকে, শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মালিকপক্ষ দিশেহারা। সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন এখন নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য। বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় মিলছে না এলপিজি সিলিন্ডার বা সিএনজি, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চট্টগ্রামের এই সংকটের মূলে রয়েছে এলএনজি (LNG) সরবরাহে বিঘ্ন এবং সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটিতে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে পুরো চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। প্রশ্ন ওঠে, একটি বিকল্প ও শক্তিশালী ব্যাকআপ পরিকল্পনা কেন আগে থেকে রাখা হয়নি? চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কেন কেবল এলএনজির ওপর এমন একক নির্ভরশীলতা তৈরি করা হলো?
এছাড়া অবৈধ সংযোগের অভিযোগ তো রয়েছেই। একশ্রেণির অসাধু চক্র ও অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে মূল লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ দেওয়ার ফলে বৈধ গ্রাহকরা যেমন গ্যাস পাচ্ছেন না, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। বাড়তি টাকা খরচ করেও যখন সেবা মেলে না, তখন বুঝতে হবে ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘুণ ধরেছে।
এই সংকট উত্তরণে কেবল ‘আশ্বাস’ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এলএনজির ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় গ্রিড থেকে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। টার্মিনাল বা পাইপলাইনের সংস্কার কাজে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে কঠোর অভিযানের মাধ্যমে সকল অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
সে সঙ্গে কেন বাড়তি টাকা দিয়েও সেবা মিলছে না, তার ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে।
চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড। এই শহর স্থবির হয়ে পড়ার অর্থ হলো জাতীয় অর্থনীতিতে ধস নামা। গ্যাস সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে কলকারখানা পর্যন্ত যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তা আর দীর্ঘ হতে দেওয়া যায় না। জনস্বার্থে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চট্টগ্রামের গ্যাস সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে।
মতামত সম্পাদকীয়





















































