বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জনজীবনে পরিবহন সংকট এখন এক দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এ সমস্যা পুরনো হলেও সম্প্রতি জ্বালানি সংকটকে উপলক্ষ্য করে সংকট আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর পাহাড়-সমুদ্রের মিতালি এই শহরকে অনন্য রূপ দিলেও, এখানকার সাধারণ মানুষের যাতায়াতের বিড়ম্বনা সেই রূপকে ম্লান করে দিচ্ছে। প্রতিদিন সকালে কর্মস্থলে যাওয়া কিংবা বিকেলে ঘরে ফেরা যেন এক অলিখিত যুদ্ধের নাম। ৫ লক্ষাধিক মানুষের যাতায়াতের জন্য যে পরিকল্পিত গণপরিবহন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল, তা আজও অলিক কল্পনা হয়েই রয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের পরিবহন সংকটের মূলে রয়েছে পরিকল্পনার অভাব এবং অব্যবস্থাপনা। একদিকে রাস্তায় লক্কড়-ঝক্কড় বাসের আধিপত্য, অন্যদিকে প্রয়োজনের তুলনায় গণপরিবহনের চরম স্বল্পতা। বিশেষ করে অফিস শুরুর সময় এবং ছুটির পরে জিইসি মোড়, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ বা অলংকার মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে হাজার হাজার মানুষকে বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বাস সংকটের সুযোগ নিয়ে সিএনজি অটোরিকশা চালকদের দৌরাত্ম্য চরমে পৌঁছেছে। মিটারে না গিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা এখন এক সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। এছাড়া রাইড শেয়ারিং সেবার অ্যাপভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের অভাব যাত্রীদের পকেট কাটছে সমানতালে। সব মিলিয়ে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।
নগরীর যানজট নিরসনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার নির্মিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য সুলভ গণপরিবহন বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বড় বড় প্রকল্পের নিচে সাধারণ রাস্তাগুলো সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে, ফলে বাস বা টেম্পোর চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। আবার যত্রতত্র পার্কিং এবং ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করার ফলে রাস্তার কার্যকারিতা কমে গেছে। মেট্রো রেলের স্বপ্ন দেখানো হলেও তার বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। অথচ বর্তমানে চালু থাকা বাস সার্ভিসগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্কের আওতায় আনলে ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো।
পরিবহন সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী এবং শিক্ষার্থীরা। পর্যাপ্ত বাস না থাকায় তাঁদের অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই লোকাল বাস বা টেম্পোতে উঠতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। বাসের সংখ্যা বাড়লে এবং ‘সিটিং সার্ভিস’ বা নারীবান্ধব বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এই দুর্ভোগ লাঘব হতে পারত।
চট্টগ্রামকে একটি স্মার্ট সিটি হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিআরটিসি বাসের সংখ্যা বাড়ানো, নির্দিষ্ট রুটে পর্যাপ্ত সংখ্যক বড় বাস চালু করা এবং অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এছাড়া ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রাস্তার মোড়গুলোতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।
চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়, এটি দেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড। এই হৃদপিণ্ডকে সচল রাখতে হলে এর ধমনী অর্থাৎ রাস্তাগুলোকে সচল রাখতে হবে। নগর কর্তৃপক্ষের উচিত ব্যক্তিগত গাড়ির চেয়ে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে একটি টেকসই নীতিমালা প্রণয়ন করা। তা না হলে উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, মানুষের জীবনের মান উন্নত হবে না। নগরবাসীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি তাঁদের মৌলিক নাগরিক অধিকার।
মতামত সম্পাদকীয়





















































