চট্টগ্রামেও হতে পারে জোনভিত্তিক লকডাউন

657
জোনভিত্তিক লকডাউন নিয়ে বুধবার সিদ্ধান্ত আসতে পারে : সিভিল সার্জন

ভূঁইয়া নজরুল :

বাড়ছে করোনা রোগী, বাড়ছে শঙ্কা। ঢাকায় জোনভিত্তিক লকডাউনের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শনাক্ত এলাকা চট্টগ্রামের জন্য এখনো কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। ঢাকার পরেই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রাম। ইতিমধ্যে জোনভিত্তিক লকডাউনের বিষয়ে ঢাকায় সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং রাজধানীর পূর্ব রাজারবাগ এলাকায় আক্রান্তের হার বেশি বলে সেখানে ৯ জুন মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে জোন ভিত্তিক লকডাউনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছে। আর এই চট্টগ্রাম মহানগরীর মধ্যে কোতোয়ালীতে সবচেয়ে বেশি এবং উপজেলার মধ্যে পটিয়ায় বেশি। চট্টগ্রামের অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের কোনো সিদ্ধান্ত রয়েছে কিনা জানতে চাইলে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বী বলেন,‘ঢাকায় মাত্র সিদ্ধান্ত হয়েছে। চট্টগ্রামেও বুধবারের দিকে এ ধরনের অঞ্চলভিত্তিক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। আর তখন আমরা পরিকল্পনা গ্রহণ করবো।’

জেলা সিভিল সার্জন দপ্তর থেকে জানা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে তিন রংয়ের ম্যাপ তৈরি করা হবে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে লাল, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে হলুদ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাকে সবুজ রং দেয়া থাকবে। জোনিংয়ের এই প্রক্রিয়ার আওতায় কঠোর বিধিনিষিধের মাধ্যমে লাল কালারের এলাকাকে কিভাবে হলুদে এবং হলুদ কালারের এলাকাকে কিভাবে সবুজে নেয়া যায় তা নির্ধারণ করা হবে। আর এভাবে জোন ভাগ করা হলে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহজও হবে।

এদিকে চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। চট্টগ্রামে গত ৩ এপ্রিল একজন করোনা আক্রান্ত হওয়ার পর গত দুই মাসে তা চার হাজারে অতিক্রম করলো। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীতেই রয়েছে ১৮৭০ জন। করোনা আক্রান্ত রোগীদের তথ্য সংরক্ষণ কওে সিভিল সার্জন দপ্তর। সেই দপ্তরের স্বাস্থ্য তত্ত্বাবধায়ক সুজন বড়-য়া থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি করোনা আক্রান্ত রয়েছে কোতোয়ালী থানায়। গত ৬ জুন পর্যন্ত এই থানায় করোনা আক্রানেত্মর সংখ্যা ৩৭৯ জন ও চকবাজারে ১৩৫ জন। চকবাজার এলাকা আগে কোতোয়ালী থানার আওতাধীন থাকায় চকবাজার থানা ম্যাপে পৃথকভাবে মার্কিং করা না থাকায় তা কোতোয়ালীর সাথে অনর্ত্মভুক্ত করা হয়েছে। এতে কোতোয়ালী থানায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৫১৫ জন হয়েছে। এছাড়া বাকলিয়ায় ১৩৫ জন। ম্যাপে সদরঘাট এলাকা মার্ক করা না থাকায় এর পুরনো এলাকা ডবলমুরিংয়ের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, সেই হিসেবে সদরঘাটের ১১২ ও ডবলমুড়িংয়ের ১৮০ দুটি যোগ করে মোট আক্রান্ত হয়েছে ২৯২ জন। চান্দগাঁও থানায় ১৩৫ জন, পাঁচলাইশ থানায় ২৬০ জন, খুলশি থানায় ২৩৯ জন, বায়েজীদ বোসত্মামী থানায় ১৩৫ জন, হালিশহর থানায় ২০০ জন, পাহাড়তলী থানায় ১৪৫ ও আকবরশাহ থানায় ১৪০ একত্রিত হিসেবে ২৮৫ জন গণনা করা হয়েছে, ইপিজেড ১৪৯ কে বন্দর থানার ১৪৭ এর সাথে যুক্ত করে গননা করে ২৯৬ হয়েছে এবং পতেঙ্গা থানায় ১৭০ জন আক্রান্ত রয়েছে। অপরদিকে উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা পটিয়ায় ১৭৫ জন, হাটহাজারিতে ১৬৩ জন, সীতাকুণ্ডে ১৩০ জন আক্রান্ত রয়েছে। এছাড়া অন্যান্য এলাকাগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

এদিকে আক্রান্ত বেড়ে গেলেও চিকিৎসা সুবিধা বাড়েনি চট্টগ্রামে। আর এতেই বাড়ছে ঝুঁকি। প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার চট্টগ্রামে সরকারি দুই হাসপাতালে আইসিইউ রয়েছে মাত্র ২৬টি। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হৃদরোগীদের ১২টি এবং করোনারোগীদের জন্য চারটি আইসিইউ বেড রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে রয়েছে ১০টি আইসিইউ। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে ৯০ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১১০টি আইসিইউ বেড রয়েছে এবং সাধারন বেড রয়েছে ৪ হাজার ১৫৭টি। এই ৯০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে ১২টির শয্যা রয়েছে মাত্র ১০০টির বেশি।

তবে হাতে গোনা কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ছাড়া কেউ করোনা রোগীদের চিকিৎসা করাচ্ছে না। আর এতেই চট্টগ্রামে ঝুঁকি বাড়ছে। কোভিড হাসপাতাল হিসেবে জাকির হোসেন রোডের বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল এবং ইম্পেরিয়াল হাসপাতাল চালুর কথা থাকলেও এগুলো এখনো সচল হয়নি। অপরদিকে হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালকে কোভিড চিকিৎসার জন্য জেনারেল হাসপাতালের দ্বিতীয় ইউনিট হিসেবে চালু করা হলেও রোগীরা সেখানে যাচ্ছে না। ৫০ কর্মকর্তা-কর্মচারীর এই হাসপাতালটিতে মাত্র ১৩ জন রোগী রয়েছেন বলে জানা যায়।

সরকারের পক্ষ থেকে গত ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত লকডাউনের আওতায় ছিল দেশ। পরবর্তীতে ৩১ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত সীমিত পরিসরে অফিস চালু রাখার ঘোষণা দেয় সরকার। আর এরপর থেকেই বাড়তে থাকে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। চট্টগ্রামে গতকাল রোববার ৭ জুন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৭১ জন এবং এদের মধ্যে মারা গিয়েছে ৯৫ জন। তবে উপসর্গ নিয়ে এর চেয়ে অনেক বেশি রোগী মারা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ জন মারা যাচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবির। এছাড়া প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতেও মারা যাচ্ছে। অপরদিকে করোনা পরীক্ষায় দুর্ভোগের কারণে অনেকে পরীক্ষাও করাচ্ছে না।