ঈদ সেলামি ও করোনাকালে অর্থনীতি

111

মো. মনিরুল হায়দার »

সময়টা ১৯৯১/৯২। ক্লাশ সিক্স/সেভেনে পড়ি। সরকারি চাকরিজীবী নানা ঈদ সেলামি হিসেবে দুই টাকার দশটা কাগজের নোট দিলেন। নতুন চকচকে কাগজের নোট। পলিথিনের প্যাকেটে মুড়ে আম্মার আলমিরাতে রেখে দিলাম। প্রতিদিন রুটিন করে একবার প্যাকেটটা বের করি আর নতুন টাকাগুলো দেখি। আহা! কী অসাধারণ সেই নতুন টাকার ঘ্রাণ!
তিন চার মাস এভাবে কাটিয়ে দিলাম। রেলস্টেশনের কাছেই বাড়ি। তিন চার মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যায়। স্টেশনে বাদাম বিক্রেতা গরম গরম বাদাম বিক্রি করে। তখন দুই দানার চীনা বাদামের পাশাপাশি তিন-চার দানার বাদাম বেরিয়েছে মাত্র। আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু নতুন বের হওয়া তিন-চার দানার বাদাম। সপ্তাহে একদিন যাওয়া শুরু করলাম বাদাম কিনতে। দুই টাকার বাদাম। এভাবে বাদাম খেয়ে নানার দেওয়া ঈদ সেলামির বিশ টাকা খরচ করতে লাগলো প্রায় ছয় মাস!
একবার আম্মা প্রায় এক বছর পরে একটা নতুন দশ টাকার নোটের প্যাকেট আলমিরা থেকে বের করলেন। জিজ্ঞেস করতেই বললো, “নতুন নোট! তাই রেখে দিয়েছিলাম।”
নতুন টাকার নোট ধরে রাখার প্রবণতা এটা আমার বা আম্মার নয়। এটা সবাই করে থাকে এবং শত শত বছর ধরে চলে আসছে। গ্রেশাম নামে একজন অর্থনীতিবিদের নামে এটা নিয়ে একটা তত্ত্ব আছে প্রায় দেড়শো বছর আগে থেকে যা গ্রেশাম’স ল নামে পরিচিত। একই সঙ্গে বাজারে ভালো মুদ্রা এবং খারাপ মুদ্রা থাকলে ভালো মুদ্রা লোকে ঘরে তুলে রাখে আর শুধু খারাপ মুদ্রা বাজারে চালু থাকে। এটাই এ তত্ত্বের মূল বিষয়বস্তু।
আমাদের সময়ে আমরা রান্নাঘরের বাঁশের খুঁটি বিশেষ কায়দায় কেটে পয়সা জমাতাম। অনেকে মাটির ব্যাংকে জমাতো। এটারও একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ছিলো অর্থনীতিতে। খুচরা পয়সা বা টাকার সংকটের কারণে চা- দোকান থেকে মুদি দোকানি সবাই চকলেট বা কাগজের একটা টোকেন ধরিয়ে দিতো বিনিময় হিসেবে।
প্রতিটি বস্তুরই একটি গতি থাকে। তেমনি অর্থনীতিতে টাকারও গতি আছে। নানার দেওয়া ঈদ সেলামি, আম্মার আলমিরা থেকে বের হওয়া দশ টাকার নোট, বাঁশের খুঁটি বা মাটির ব্যাংকের পয়সা এগুলোর গতি খুবই কম।
ক্রান্তিকালীন এ সময়ে পুরো বিশ্বের অর্থনীতির চাকা অনেকটাই গতি হারিয়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে অর্থনীতির চাকাকে গতিশীল করার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়ে। একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে টাকা সরবরাহ বাড়িয়ে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান কর্মচারীদের নৈতিক মনোবল বাড়াতে বেতন বাড়িয়েছে। মুম্বাইভিত্তিক মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি এশিয়ান পেইন্টস তার একটি উদাহরণ। দেশের ভেতরেও বেসরকারি একটি কোম্পানি তাদের প্রায় দশ হাজার কর্মীর মনোবল বাড়াতে দশটি বাড়তি বোনাস দিয়েছে এ বছর।
আপনার ক্রয়ক্ষমতা যখন বাড়ে অর্থাৎ যখন আপনার কাছে টাকার পরিমাণ বেশি থাকে তখন আপনি বেশি টাকা খরচ করেও পণ্য ক্রয় করতে দ্বিধাবোধ করেন না। এক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি (ইনফ্লেশন) ঘটে থাকে। জিম্বাবুয়ের মূল্যস্ফীতির কথা অনেকেই জানেন। আবার আপনার কাছে যখন টাকার পরিমাণ কম থাকে তখন ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে উৎপাদনকারী প্রকৃত মূল্য পায় না। এমনকি অনেক সময় উৎপাদন খরচও পায় না উৎপাদক। এক্ষেত্রে মূল্যসংকোচন (ডিফ্লেশন) ঘটে থাকে। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য সহায়ক। স্থবির এ সময়ে বাজারে যদি টাকার পরিমাণ কমে যায় তাহলে মূল্যসংকোচন হবে যা প্রবৃদ্ধির অন্তরায়।
অনেকেই ভাবছেন অর্থনীতিতে টাকা সরবরাহ মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। মোটেও তা নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে।
১৯৩০-এর মহামন্দার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। অনেক অর্থনীতিবিদ ঐ মন্দাকে ভয়াবহ রূপ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে মন্দার কারণে যে মূল্যসংকোচন (ডিফ্লেশন) তৈরি হয়েছিল তা মোকাবিলা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি পর্যাপ্ত অর্থ বাজারে সরবরাহ করেনি। ১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যসংকোচন হয় ১ শতাংশের কাছাকাছি । ১৯৩২ সালে মূল্যসংকোচন গিয়ে ঠেকে প্রায় ১১ শতাংশে। অর্থাৎ, যে পণ্যটি উৎপাদন করতে ১০০ টাকা খরচ হয়েছে সেটির বাজারমূল্য ৮৯ টাকা।
এই মন্দা থেকে বের হয়ে আসার জন্য ১৯৩৩ সালে একজন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ বাজারে ব্যাপকভাবে টাকা সরবরাহ করার পরামর্শ দেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ১৯৩৪-৩৫ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাজারে ব্যাপকভাবে টাকা সরবরাহ করার নীতি প্রয়োগ শুরু করে। ১৯৩৯ সালের দিকে মন্দার রেশ কমলেও এর প্রকোপ পুরোপুরি বন্ধ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া মহামন্দার পরিস্থিতিতে মন্দা আক্রান্ত প্রত্যেকটি দেশও ব্যাপকভাবে বাজারে টাকা সরবরাহ করে।
আপনি হয়তো ভাবছেন সরকার তো করছে। আমাদের আর কী করার আছে? হ্যাঁ, আপনার আমার সবার ভূমিকা রাখতে হবে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার জন্য। আপনার আমার ঈদ সেলামি, অলস টাকা, যাকাত এসবই পারে অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে। সরকার মানে কী? আপনাকে আমাকে নিয়েই তো সরকার, নয় কি?
করোনা’র এ দুঃসময়ে আমাদেরকে মূলত দুটি মৌলিক চাহিদার উপর বেশির ভাগ সময়ই নির্ভর করতে হচ্ছে। খাদ্য ও ওষুধ। সবারই একটা নিজস্ব পরিম-ল আছে। আপনি সেই পরিম-লের সরকার! আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে আপনার আশেপাশের বাড়িতে তিন বেলা চুলা জ্বলছে কি না। অসুস্থ মানুষগুলো ঠিকমতো ওষুধ কিনতে পারছে তো?
হ্যাঁ, আপনাকে আমাকে এই জায়গাতে নগদ অর্থ সরবরাহ করতে হবে। আবারও বলছি নগদ অর্থ সরবরাহ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি আপনার আমার উদ্যোগই পারে মৌলিক চাহিদার এ দুটি সেক্টরের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থাকে সচল রাখতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো গতবছর করোনা মহামারির একেবারে প্রথম দিকেই বলেছেন এক ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখা যাবে না।
এবার আসুন আমার আপনার এ পদক্ষেপ কীভাবে অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে পারে এবং মূল্যসংকোচন (ডিফ্লেশন) রোধ করতে পারে।
শুরুতে বাদামওয়ালার কথা বলেছিলাম। বাদামের উৎপাদন থেকে ভোক্তার চক্রটি একটু চিন্তা করুন। স্টেশনের হকার দোকানদার থেকে বাদাম কিনেছেন, দোকানদার পাইকার থেকে, পাইকার কৃষক থেকে, কৃষক পরিবহনে করে পাইকারি বাজারে নিয়ে এসেছেন, কৃষক উৎপাদনের জন্য বীজ কিনেছেন, সার কিনেছেন, ইত্যাদি, ইত্যাদি। দেখলেন তো কতগুলো পক্ষ জড়িত। একইভাবে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, মৎস্য ও প্রাণিজ আমিষের কথা চিন্তা করুন। আপনার আমার ঈদ সেলামির অর্থ বা কম গতিশীল অর্থই পারে এ অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে এবং মূল্যসংকোচনকে রোধ করতে। করোনার এই দুঃসময় ঈদ উৎসবেও মানুষের মনে শঙ্কা কাজ করছে। মানুষের সম্মিলিত প্রার্থনা, এই দুঃসময়ের শঙ্কার অবসান হোক। করোনা মহামারির অবসান হয়ে পৃথিবী স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসুক। ঘরবন্দি ঈদ যেন আর না আসে মানুষের জীবনে ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’- এই অনুভূতি সকল প্রাণ স্পর্শ করুক।
আসুন, ক্রান্তিকালীন সময়ের এই ঈদে সরকারের পাশাপাশি আপনি আমি আমাদের আশেপাশের মানুষটির পাশে দাঁড়াই যার রয়েছে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য ও জীবনরক্ষাকারী ঔষধের চাহিদা যা একই সাথে পারে আপনার ঈদ উৎসবকে পূর্ণতা দিতে, প্রকৃত চাহিদা সম্পন্ন মানুষটির চাহিদা মেটাতে এবং মৌলিক চাহিদার এ দুটি সেক্টরকে তথা অর্থনীতিকে সচল রাখতে।
যুগ্ম পরিচালক
বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম।