করোনাকালে নগর দারিদ্র্য বেড়েছে

58

সুভাষ দে »

করোনাকালে রাজধানীসহ নগর এলাকায় দারিদ্র্য বেড়েছে। গত ১ বছর যাবত করোনার অভিঘাতে গ্রামের তুলনায় নগরের মানুষের বিশেষ করে দরিদ্র, নি¤œআয়ের শ্রমজীবী, বস্তিবাসী, নি¤œমধ্যবিত্ত সকলের জীবন দুর্বিষহ হয়েছে। এই পরিস্থিতি বরং করোনার বিপর্যয়ের মধ্যে ক্রমঅবনতিশীল হচ্ছে। মধ্যবিত্তের এক বড়ো অংশ নি¤œবিত্তে পরিণত হয়েছে, নি¤œআয়ের মানুষ দরিদ্র হয়েছে, গরিব মানুষ আরো গরিব হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের জরিপের তথ্য নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, দেশে দরিদ্রের হার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ, সে অনুসারে দেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছে, অন্যদিকে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) তাদের জরিপ নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দেখা যায় করোনাভাইরাসের প্রভাবে নতুন করে দেশের আড়াই কোটি মানুষের জীবনমান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এর ফলে প্রায় ৬ কোটি লোক বর্তমানে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এর অধিকাংশ দেশের নগর এলাকার।
বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নগরে বাস করে, ৬০ শতাংশ গ্রামে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই চিত্রের ব্যাপক রদবদল ঘটবে। যেভাবে উপজেলায় নগরায়ণ হচ্ছে, গ্রামেও নগরায়ণের ছোঁয়া লেগেছে, দেশের ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি সম্পন্ন হলেও গ্রাম ও শহরতলীর এক বিশাল এলাকা নগরায়ণের আওতায় এসে যাবে। তদুপরি নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলীয়, চর অঞ্চল, হাওরÑবাঁওড় ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রায়শই নগরের দিকে ছুটছে।
করোনার কষাঘাতে নগরের নি¤œবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সদস্যদের জীবনে করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নগরের শ্রমজীবী মানুষ দিনমজুর নির্মাণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিক, হকার, রিকশাÑ ঠেলাগাড়িÑভ্যান গাড়ি চালক, হোটেল রেস্তোরাঁর কর্মচারী, পরিবহন শ্রমিক, লন্ড্রি, সেলুন, মুদি দোকানের কর্মচারী, গৃহকর্মী, সরকারিÑ বেসরকারি ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী, নানা পেশায় নিয়োজিত স্বল্প বেতনের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কষ্টের মধ্যে পড়েছে। গ্রামের কৃষি মজুর, বিভিন্ন পেশার প্রান্তিক মানুষ, ক্ষুদ্র কৃষক, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তারাও এই ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। লকডাউনের প্রভাবে তাদের আয় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। পোশাক শিল্পের শ্রমিক যাদের বিপুল অংশ নারী, তাদের অনেকের বেতন হ্রাস পেয়েছে, বকেয়া পড়েছে বেতন ভাতা, অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন বিপুল শ্রমজীবী মানুষ, তাদের আয় একেবারেই কমে গেছে। দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভর করা পরিবারগুলো দিনের খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনার প্রথম ধাক্কায় গরিব ও নি¤œবিত্ত অনেক পরিবার গ্রামের বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এদের অনেকে আবার পেশাও পরিবর্তন করেছেন। এসব পরিবারে সঞ্চয় বলতে প্রায় কিছুই নেই, কিছু পরিবারে থাকলেও এই ১ বছর সঞ্চয় ভেঙেছে তারা, ঋণও করেছে। এসব করতে গিয়ে তাদের খাদ্য ব্যয় কুলাতে কষ্ট হয়েছে, পুষ্টির কথা, ছেলেমেয়েদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ কোথায়। নি¤œমানের খাবার গ্রহণ, কম খাবার গ্রহণ এবং পরিশেষে ক্ষুধা নগরের শ্রমজীবী ও দরিদ্র মানুষদের অসহায় করে তুলছে। নগরে এদের সংখ্যা লাখ লাখ।
গ্রামের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও অল্প কয়েকটি ক্ষেত্র ছাড়া এসব সামাজিক কর্মসূচি নগরে নেই। তদুপরি নগরে বাস করলেও নগরের ভোটার তালিকায় এদের অন্তর্ভুক্তি নেই, অনেক ভাসমান মানুষও আছেন, ফলে এরা সাহায্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। স্বাভাবিক সময়ে নগরে অর্থনীতির চাকা এরাই টেনে নেয়, নগর জীবন এদের শ্রম ও কাজে গতি পায়।
কিন্তু করোনা মহামারির এক বছরের বেশি সময় এদের জীবনÑসংসার তছনছ হয়ে গেছে, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের পরিবার ও সন্তানদের গ্রাস করছে। সরকার থেকে এদের সাহায্য যৎকিঞ্চিৎ, বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কিছু ত্রাণ সহায়তা তারা পেয়েছেন, সরকারের ওএমএস কর্মসূচি কিংবা টিসিবির পণ্য ক্রয় কিছুটা সহায়ক হয়েছে। ভারতের মতো এসব দরিদ্র নগরবাসীদের ‘আধার কার্ড’ এর ব্যবস্থা করতে পারলে তারা এই দুঃসময়ে কিছুটা দিশা পাবে। করোনার সময় কেরালার বামপন্থি রাজ্য সরকার শহরের বিপুল জনগোষ্ঠীকে ১ মাসেরও বেশি সময় রান্না করা খাবার ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে যা এবার কেরালার বামপন্থি জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে সহায়ক হয়েছে।
বিগত পাঁচ দশকেরও কম সময়ে দেশে দারিদ্র্যের মাত্রা ৭০ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে হ্রাস বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক খাতে বড়ো অর্জন হিসেবে দেখছেন দেশিÑবিদেশি অর্থনীতিবিদগণ। বিশ্বের অনেক সংস্থার প্রশংসা পেয়েছে বাংলাদেশ। কৃষিতে ব্যাপক সাফল্য, সবজি ফলমূল চাষ, মৎস্য, ডেইরি শিল্পে অগ্রগতি, গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্র ঋণÑএসবের ফলে গ্রামের মানুষ দরিদ্র অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে গ্রামীণ মানুষের উন্নয়নে সরকারের নানা কর্মসূচিও চলমান রয়েছে। বিদ্যুতায়নের ফলে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বিকাশ সহজতর হয়েছে তদুপরি করোনার অভিঘাত গ্রামজীবনকে তেমন কাবু করতে পারেনি। গ্রামীণ উৎপাদন ব্যবস্থা সচল থাকায় দেশের অর্থনীতি করোনার প্রবল ধাক্কায়ও টিকে গেছে। অনুরূপভাবে নগর ব্যবসাÑবাণিজ্য, শিল্পকারখানায় উৎপাদন, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মচাঞ্চল্য (কিছুটা কম হলেও) নগরীর অর্থনীতি, জীবনপ্রবাহ সচল রাখছে। নগরের দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ কিন্তু নিজেদের জীবনেই তাদের দুঃসহ অন্ধকার প্রতিনিয়ত। এখন সময় এসেছে নগরের দরিদ্র ও নি¤œবিত্তদের দিকে ফিরে তাকানোর, নতুবা সামাজিক বৈষম্য, অপ্রাপ্তি থেকে ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম নেবে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ নগরে বাস করছে, এই সংখ্যা নানা কারণে দিন দিন বাড়ছে। অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত বিপুল শ্রমজীবী মানুষকে আমাদের নগর প্রশাসনও জরিপের আওতায় এনে তাদের জীবনÑজীবিকার তথা নির্দিষ্টকরণের কাজটি জরুরি। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত অদক্ষ শ্রমিকদের কারিগরি জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করতে তুলতে হবে। গ্রামের মানুষদের নানা সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা ঋণ দিচ্ছে। নগরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেবার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। নগর দারিদ্র্য দূরীকরণে কর্মসংস্থান, বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের আয়বৃদ্ধির বিষয়গুলি গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। নগর ও নগরের উপকণ্ঠে শিল্প কলকারখানায় যোগ্যতা অনুসারি দরিদ্র ও নি¤œবিত্তের সন্তানদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে।
নগরে অবকাঠামো উন্নয়ন তাদের কাজের জন্য সুবিধা হবে। নগরের দরিদ্র ও নি¤œআয়ের মানুষের আবাসন সংকট ভয়াবহ। এদের অধিকাংশ বস্তি, রেললাইনের দুপাশে, পাহাড়ের পাদদেশে, পতিত জায়গায় ঘর তুলে কোনরকমে কায়ক্লেশে দিন কাটায়। নগরের অন্যান্য অধিবাসীদের মতো, তাদের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা পাওয়ার অধিকার আছে। তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনগুলির প্রতি নগর প্রশাসন ও সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। এজন্য নগরে বসবাসকারী প্রতিটি দরিদ্র নি¤œবিত্তসহ সকল নাগরিকের তথ্যপঞ্জি তথা ডাটাবেইস সংরক্ষণ করতে হবে।
চট্টগ্রামের মতো বড়ো নগরের অধিবাসীদের জীবনÑজীবিকা, মৌলিক চাহিদাগুলির প্রাপ্যতা নিয়ে গবেষণা নেই, তথ্যÑউপাত্ত নেই নগর প্রশাসনে, এনজিও সংস্থাগুলি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারে। করোনার এই সময়ে দরিদ্রদের ফেয়ার প্রাইস কার্ড বা রেশন কার্ড চালু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করা প্রয়োজন যাতে তারা জীবনের মৌলিক প্রয়োজনগুলি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে পেতে পারে। সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার পাওয়া ও ভোগ করার কথা, কিন্তু আমাদের দেশে সামাজিকÑঅর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট এবং তা অমানবীয়।
এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে নগর দারিদ্র্য ঘুচাতে হবে। দরিদ্র নি¤œবিত্ত কৃষক, শ্রমিক, শ্রমজীবী, প্রান্তিক মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্রকে যা দেয় তার বিনিময়ে তারা পায় সামান্যই। এতে জীবন চলে না, অন্তত মানুষের মতো বাঁচার অধিকার ও সুযোগ তাদের করে দিতে হবে। এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

লেখক : সাংবাদিক