করোনাকালীন পরিস্থিতি ও শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা

0
189

রতন কুমার তুরী »

পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এবং শিশু-কিশোরেরা ঘরের বাইরে যেতে না পারায় বেশিরভাগ শিশু-কিশোরের মনে একধরনের মানিসক বিষণœতার সৃষ্টি হয়েছে। তারা ঘরে বসে বসে নিজেদের অসহায় মনে করছে।
তাদের মনে এই ধারণা জন্ম নিয়েছে যে, তারা পৃথিবীর সবকিছু থেকেই যেনো বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এই সময়টিতে মাঠে কিংবা সহপাঠীদের সাথে কোথাও খেলতে যেতে না পারায় এমনকি স্কুলের বন্ধুদের সাথে ছুটোছুটি করতে না পারায় কষ্টে তাদের মন ছেয়ে গেছে।
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের প্রথম দিকে তারা তাদের পিতা-মাতাদের কথামতো ঘরেই থাকতে চাইলেও বর্তমানে ধৈর্যহারা হয়ে উঠেছে। অস্থির হয়ে ঘরের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের সাথে বাকবিত-ায় লিপ্ত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে শিশু-কিশোররা স্কুলের বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকায় তারা মানসিক প্রশান্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এতে করে তারা ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে থাকতে মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। এই সময় শিশু-কিশোরদের আনন্দ দেয়ার জন্য সব বাবা-মা’র উচিত কিছু বিশেষ পন্থা অনুসরণ করা। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে যেহেতু এসব শিশুÑকিশোররা দীর্ঘদিন ধরে ঘরে আবদ্ধ রয়েছে সেহেতু তাদের মানসিক সুস্থতার জন্য পরিবারের সবাইকে খুব বেশি সজাগ থাকতে হবে। অকারণ তাদেরকে বকাঝকা করা থেকে বিরত থাকুন। চেষ্টা করুন ঘরের মধ্যে তাদের কোনো সৃজনশীল কাজে লাগাতে, হতে পারে সেটা কোনো ছবি আঁকা, বই পড়া কিংবা টিভিতে কোনো শিক্ষামূলক শিশুতোষ অনুষ্ঠান দেখা। শিশুরা এই সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে লেখা-পড়া করতে চাইবে না তাই তাকে একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুযায়ী পড়ানোর চেষ্টা করুন যা সে করোনার আগে করেছে এই সময় খুববেশি পড়ার জন্য চাপ দেবেন না কারণ এতে সে বিরক্তবোধ করতে পারে। তবে লেখা-পড়ার চর্চা যাতে অব্যাহত থাকে সে বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। একটি কথা আছে অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস পায়, শিশুÑকিশোরদের ক্ষেত্রে সেটি অস্বাভাবিক নয়।
প্রকৃতপক্ষে শিশু-কিশোরদের মনোজাগতিক চাপ বৃদ্ধি না করে তাদেরকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে এসময়টি অতিবাহিত করা জরুরি। শহরে হলে ছাদে আর গ্রামে হলে নিজ উঠোনে আপনার সন্তানদের নিয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। ইদানিং শহরের দালানগুলোতে অনেককেই ছাদ বাগানে বিভিন্ন ফুল এবং ফলজ গাছ রোপণ করে তা পরিচর্যা করতে দেখা যায়, এই সময় চাইলে আপনিও ছাদ বাগান নিয়ে মেতে থাকতে পারেন। আপনার সাথে সাথে আপনার শিশু-কিশোরটিকেও এই ছাদ বাগান পরিচর্যায় নিয়ে যেতে পারেন, এতে তার মন ভালো থাকবে।
এই সময়টিতে শহরের চাইতে গ্রামের শিশু-কিশোররা অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থানে আছে। বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে করোনা ভাইরাস তেমন ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারেনি ফলে গ্রামের শিশু- কিশোররা একটু সাবধানতা অবলম্বন করে তাদের বাড়ির আঙ্গিনায় সময় কাটাতে পারে, তবে এই ক্ষেত্রে তাদেরকে অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। শিশু-কিশোররা যাতে স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া যত্রতত্র ঘুরে বেড়াতে না পারে তা অবশ্যই খেয়াল রাখা উচিত । যে কোনো বয়সের শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা নির্ভর করে পরিবার এবং তার আশেপাশের পরিবেশের ওপর।
কিশোরদের নিয়ে সমস্যা একটু অন্যরকম। এই বয়সটি কৈশোর ও তারুণ্যের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণের পর্যায় বলে তারা মাÑবাবার নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থাকতে চায় না কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এ সময় বন্ধুÑবান্ধব, পাড়ার বড় ভাইদের সঙ্গ তাদের কাছে প্রিয়। আমরা দেখছি দেশের কিশোর সমাজের এক অংশ কুসঙ্গে পড়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। করোনার সময় শিশুÑকিশোরদের কাছে অনেকটা দুর্বিষহ। স্কুলÑকলেজের সহপাঠীদের সাথে মেলামেশা নেই, খেলাধুলা নেই, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নেই, এই বিশেষ সময় কিভাবে সে কাটাবে! পরিবারের বড়দের এখানে দায়িত্ব নিতে হবে। পাড়া কিংবা সমাজের বড়োরা যদি সুদৃষ্টান্ত রাখে তবে তা তাদের জন্য অনুকরণীয় হবে। তাদের মানসিক প্রশান্তির জন্য নানা উপাদান বের করে নিতে হবে যেমন পড়াশোনা, ঘরেÑবাইরে নির্মল বিনোদন, ভাল অনুষ্ঠান দেখা, আত্মীয়স্বজনদের সাথে মেলামেশা বাড়িয়ে দেয়া, পরিবারের জন্য ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করাÑএসব শিশুÑকিশোরদের মনোজগতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, করোনার এই সময় শুধু আমাদের দেশের মানুষই পার করছে না, সমগ্র পৃথিবীর মানুষই এই বৈরি সময়টি পার করছে ফলে প্রতিটি দেশেই শিশু-কিশোরদের নিয়ে এমন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। প্রতিটি দেশের মানুষই তাদের শিশু-কিশোরদের একটি অপেক্ষাকৃত আনন্দময় সময় পার করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে।
আসুন, আমরাও এই করোনাকালিন আমাদের শিশু-কিশোরদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করি এবং তাদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখি।

লেখক : কলেজ শিক্ষক, প্রাবন্ধিক