কবিতা

আসো সবুজ রাখি মায়ের আঁচল

মান্নান নূর

আমরা ইচ্ছে করলেই সূর্যটাকে নেভাতে পারি না,
পারি না ফসলি জমিগুলো বিনষ্ট করে খামার বানাতে।
পাখিরাও প্রতিবাদী- যুৎসই মন্তব্য আছে তাদের;
তারা মুখভাষায় কথা বলার উপচে-পড়া ইঙ্গিত।
অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ তবুও বোঝে না- চলো, পাখি হই,
দাঁড়কিনা, মলা, পুঁটি, কৈ হই।
আসো, বাঙালি-না-বাঙালি- মানুষ হই,
আসো, সাজাই প্রকৃতি ও দেশ।
আসো, ভালোবাসাবাসি করি পাখি ও প্রজাতি,
পোকামাকড় ও মানুষে; আসো, মাটি হই-
কাদামাটি, পানিতে মিশে স্বচ্ছ জল হই,
পুকুরের, শান্ত পুকুর।

 

মাস্তুলের রোগ

জাকির সেতু

সকাল-সন্ধ্যার হিসাব কতজন মনে রাখে?
খরস্রোত নদীর মতো
পলি-মাটির ঘ্রাণ শুঁকে নেয়
দশরথ হাওয়ার প্লাবন।
রোদের ভিতর ছায়া নেমে আসে
হাতের তালুতে নাচে ময়ূরাক্ষী গাঙ।
প্রিয়জনের অপেক্ষায় হেলেঞ্চা
সোডিয়ামের আসক্ত মনে
নির্ভাবনার বৃষ্টি ঝরে না-
ঝরে পড়ে কষ্ট গ্লানি, আক্ষেপ আর দ্বন্দ্ব।

 

আদি ও আসল

আরফান হাবিব

বিষমমাত্রিক অভিপ্রায়ে
নির্বন্ধ ভাব
অন্ত্যানুপ্রাসহীন
দ্বিবচনলোপে বিভক্তিময়
তাই
মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় কোন শাখা নেই
আর
স্বাধীনতার ফটোকপিও হয় না।

 

রক্তখচিত গর্বিত ইতিহাস

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম

বক্ষ বিদীর্ণ করে কলিজাও দিতে জানি
যখন,
ডানা কেটে রক্ত দেয়া আর তেমন কী কঠিন!
সেদিন পাখির চোখে দেখা অগ্নিশপথ
মুক্তির পথে বুক বাড়িয়ে ধরে হাঁটায়
যদি জীবনের বিনিময়ে নিজেদের একটা আকাশ হয়
মুক্ত অবাধ…
সেই আকাশের সীমানা ছুঁয়ে তবে
ভাঙা পঙক্তিতে একটা কবিতা লেখায় পিছুটান কীসে?
যে কবিতার নেপথ্যে আঁকা একটা পতাকা…
অনাগত প্রজন্মের প্রদীপ্ত শেকড়,
সে কবিতার সারসংক্ষেপ তর্জমা যেন
একটা রক্তখচিত গর্বিত ইতিহাস জানা।

 

 

অপরাজেয় মার্চ মাস

এবি ছিদ্দিক

সেদিনই আমরা আমাদের গন্তব্য পাকাপোক্ত করি।
মার্চের উত্তাল বাতাসে মাটিস্পর্শ শপথে উষ্ণ হই
স্বাধীনতার বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে প্রতিটি মস্তিষ্কে
চোখে ভেসে ওঠে ভাঁটফুল ঘাসফুল শোভিত স্বদেশ

বিগত কালের ক্ষোভ হলো প্রিয় স্বাধীনতার মন্ত্র
বিজয়ের নেশায় মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো হলো গ্রেনেড
জয়ের কোরাস গাইলো নদীমাতৃক বাংলাদেশ
বিদ্যুৎ বেগে সারাদেশই হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দান

অঝোর ধারায় রক্ত ঝরলো একাত্তরের নয় মাস
অতঃপর রক্তস্নাত মাটিতে হামাগুড়ি দেয়
প্রিয় স্বাধীনতা

 

 

জননী অঙ্কিত পতাকা

সুশান্ত হালদার

বজ্রে বাজেনি বাঁশি
কেন যে বলেছিলাম, রুদ্রের স্বভাবে ভীরুতা ছিল রক্তিম
অথচ তুমি বললে
ভীরু কাপুরুষের দেশে কেন যে ফুটেছে জবা আরক্তিম?

জননীর মতো পূজ্য দেশ
কী করে বলি
লাঞ্ছিতার অশ্রুতে ভাসে নাই একদা
পদ্মা মেঘনা যমুনা আত্রাই ব্রহ্মপুত্র করতোয়া?
বলেছিল ক্যামেলিয়া
ভাই হারা দেশে জননী আমার গন্ধ বকুল শেফালিকা

ওগো স্বাধীনতা
এই কি তোমার পিতা ধিকৃত দেশে জননী অঙ্কিত পতাকা?

 

 

অদৃশ্য নায়ক

পান্থজন জাহাঙ্গীর

আবুল ছিল শহরের এক সাধারণ রিকশাচালক। মো: আবুল হোসেন। কেউ সুন্দর নাম ধরে কোনদিন ডাকেনি।
সবাই ডাকতো ‘ আবুইল্যা’। এ নিয়ে তার কোন দুঃখ নেই। তবে সে চাইতো- তার একটা দেশ হোক এবং সেই দেশের একটা সুন্দর নাম হোক। দিনভর যাত্রী টেনে ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কিন্তু রাত হলেই সে অন্য মানুষ হয়ে যেত। রাতের অন্ধকারে সে রিকশার নিচে লুকিয়ে অস্ত্র নিয়ে যেত শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। মাঝে মাঝে তার বুক ধড়ফড় করত—ধরা পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত। সারাদিন রিকশার হুড ফেলে ঘুমাতো কিন্তু রাতে অতন্দ্র প্রহরী।

একদিন এক মুক্তিযোদ্ধা তাকে বলল— “ভাই, আপনার নামটা কী, লিখে রাখি?” আবুল হেসে বলল—
“দেশ স্বাধীন হলে, তখন নাম লাগবে না। স্বাধীনতাই আমার পরিচয়।” যুদ্ধ শেষে কেউ তাকে খুঁজে পায়নি। কিন্তু শহরের প্রতিটি রাস্তায় যেন তার চাকার শব্দ এখনও শোনা যায়।